জানালার বাইরে থেকে ছোট্ট মেহগনিগাছটার নতুন কলাপাতাসবুজ রঙের পাতায় পিছলে আসা রোদ সারাঘরে একটা হালকা সবুজ আভা তৈরি করে। কেবল আভা নয়, বরং সে আলো অনেকটা রোদের আদল পায়, তবে আলোটা রোদের মতো করে জানালাপথে এসে মেঝের দিকে না গিয়ে ছাদে জানালার লম্বালম্বি ছয়টি আর আড়াআড়ি দুইটি শিকের অস্পষ্ট ছায়া ফেলে। যে জানালা দিয়ে এই মিহিন সবুজ আলো আসে সেই জানালার দিকে মাথা দিয়ে শুয়ে শিপন ভাবে, মেহগনির একটামাত্র নতুন কোমল পাতায় পিছলে আসা অস্পষ্ট আলোর আভা জানালার শিকের এত স্পষ্ট ছায়া ফেলতে পারে কিভাবে। আর এরকম সময় যখন ছাদের গায়ে ফুটে ওঠা জানালার শিকের অস্বাভাবিক মোটামোটা আবছায়াগুলো দুলে ওঠে, ভেঙে যায়, তখন শিপন বুঝতে পারে আলোটা মেহগনির পাতা থেকে পিছলে আসা নয়, এ আলো তারও পেছনে ঝিলের জলে খাঁ খাঁ করা দুপুর রোদের প্রতিফলন। শিপন আস্তে আস্তে উঠে বসে, আর অবাক হয়ে দেখে তার মাথা শূন্য, কোনো বোধভাবনা তার ভেতরে কাজ করে না। অনেক চিন্তা করতে চায় সে, কিন্তু তার যেন ছাদের গায়ে ফুটে থাকা জানালার শিকের ভেঙে যাওয়া প্রতিচিত্রটি দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নাই, অন্তত তার আর কিছু মনে আসে না।
মাথাটা একটু তুলে পাশে উপুর হয়ে শুয়ে থাকা রুহির দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় শিপন, হালকা নিশ্বাসের সাথে সাথে ওর পিঠ ওঠানামা করে। বালিশের উপর রুহির এলোমেলো চুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, দেয়ালের দিকে ফিরে শুয়ে থাকায় ওর মুখ দেখা যায় না, সেখানে এখন কী অভিব্যক্তি তা জানার কৌতুহল হলেও শিপন মুখ এগিয়ে নিয়ে রুহির মুখটা দেখার সাহস করে উঠতে পারে না। আসলে সাহস নয়, শিপন ভাবে, তার দেখার কোনো ইচ্ছা তৈরি হয় না। আসলে ইচ্ছাও নয়, তবে কী? তাও কি ঠিকভাবে নিজেই বুঝে উঠতে পারে শিপন? রুহির চোখ খোলা, না বন্ধ? শিপন যেমন ছাদে সবুজ আলোর খেলা দেখে, রুহি কি তা লক্ষ করে? রুহি হয়ত অন্যকথা ভাবে, অন্য কোনোকথা। রুহি হয়ত শিপনের ওপর খুব বিরক্ত, রুহি তবে ছাদের গায়ে ভেঙে যাওয়া ছবি, ভেঙে যাওয়া জল, ভেঙে যাওয়া গল্প, ভেঙে যাওয়া জলের ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যাওয়া গল্প দেখেনাই, দেখতে পারেনাই। এরকম করে ভেঙে যায় শিপন, সবকিছু ভেঙে যায়।
রুহি বরঞ্চ খুব গোছানো, সবকিছু গুছিয়ে করে, গুছিয়ে কথা বলে, শুনলে মনে হবে সে আগেই ভেবে রেখেছে এই এই শব্দগুলো বেছে বেছে বলবে। রুহি অনেকবার চিন্তা করে করে তারপর একসময় সিদ্ধান্ত নেয়, কোনোকিছু ভুল হলে, সামান্য অন্যরকম হলে খুব আহত হয়। রুহি খুব একমুখী। তা একমুখী কথাটার হয়ত অন্যকোনো অর্থ থেকে থাকতে পারে, তবে রুহির একমুখিতা হল, সে এখন ছাদের গায়ে ভেঙে যাওয়া কলাপাতাসবুজ আলোচিত্র দেখবে না, এখন রুহি বরঞ্চ ভাববে, আজ তার জন্মদিনে তারা হয়ত সদরঘাট থেকে মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত একটা লঞ্চটু্যর দিয়ে আসতে পারত, অথবা ট্রেনে করে চলে যেতে পারত ময়মনসিংহ, অনেককথা বলতে বলতে, অনেক বাদাম খেতে খেতে, আজ রুহির জন্মদিনটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে মুখর, সবচেয়ে স্মরণীয় করে রাখতে পারত তারা, অথচ তারা কেন সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু শুধু মধুবাগের ঝিলের পাশে শোয়েবের খালি বাসায় এসে এখন মন খারাপ করে শুয়ে আছে। শোয়েবকে ঘণ্টাদুয়েকের জন্য বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে তবে তাদের কী লাভ হল?
অথচ এতকিছুর পরও ছাদের গায়ে কলাপাতাসবুজ জলছবি দেখে নিজের অজান্তেই ভুল করে ভুল সময়ে খুশি হয়ে যায় শিপন, আর খুশি হয়ে যায় বুঝতে পেরে তার মন খারাপ লাগে। রুহি কিন্তু এই জলছবি, এই ভেঙে যাওয়া জলের গল্প দেখে না, এসব যে রুহি কখনও দেখে না তাও নয়, তবে অন্য কোনোদিন, অন্য কোনোসময় হলে এইরকম তুচ্ছ কোনো ছবি, বা ছবির গল্প হয়ত রুহিই দেখাত শিপনকে, বাচ্চাদের মতো খুশি হয়ে শিপনকেই হয়ত হঠাৎ অনেকখানি ভালোবেসে ফেলত রুহি। তবু রুহি খুব খুঁতখুঁতে, রুহির খুব জেদ, রুহি খুব যখনকার তা তখনকার হিসাবের, একের সময় অন্যের দিকে তাকানোর মতো মেয়ে রুহি নয়।
এইতো, আজকের মিছিলটাও খুব জরুরি ছিল, বিল ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মিছিল, শুনে রুহি রাগ করে। তার কথা হল, একদিন রুহি কিংবা শিপন মিছিলে না গেলে সাম্রাজ্যবাদের কিছুই হয় না, কিংবা তারা মিছিলে গেলেও ক্লিনটনের সফর রদ হয় না। কিংবা মিছিল হয়ত বাদই দেয়া গেল, এখানে আসার সময়ইতো, মগবাজার বাসস্ট্যান্ডে সোহেলের সাথে দেখা শিপনের, সেই কবে কলেজ ছেড়েছে, তারপর আর দেখা হয়নাই, পাপ্পু বা বিজয়রা এখন কে কোথায় আছে, কী করছে, এসব বিস্তারিত জানার খুব বেশি আগ্রহ যে শিপনের আছে তাও নয়, তবু অতদিন পরে সোহেলের সাথে দেখা হয়ে গেলে কিছু জিজ্ঞেস করতেতো হয়, তাতেও রুহি রাগ করে কেন? রুহির কেন মনে হয় যে সময় নষ্ট করছে শিপন, তা সে কি আর ইচ্ছা করে সময় নষ্ট করতে চায়? তাতো চায় না, সামান্য সৌজন্য না দেখালে সোহেল কী ভাববে? তবু রুহি এরকমই।
অবশ্য রুহির রাগ যে খুব অন্যায্য তাও নয়, রুহির মতো শিপনও জানে শোয়েব দুইটার মধ্যে এসে পড়বে, আর শোয়েব আসার আগ পর্যন্তই কেবল বাসাটা শুধু তাদের দুইজনের। তাছাড়া আসাদগেট বাসস্ট্যান্ডে আসতেওতো শিপনই দেরি করেছে, রুহিতো আর দেরি করেনাই। তা সবমিলিয়ে একটার আগেতো আর তারা মগবাজার আসতে পারেনাই, তাও আসার পথে যদি সোহেলের সাথে কথা বলেই সে সময় কাটায়, আবার সোহেলকে অনর্থক চা খাওয়ানোর জন্য পিড়াপিড়ি করে, তবেতো রাগ রুহি করতেই পারে।
রুহি কি এখন কিছু ভাবছে? নাকি তারও ভাবার সব ফুরিয়ে গেছে। এরকম ফুরিয়ে যায় কিন্তু। একেকসময় মনে হয় চিন্তা করার ব্যাপারটা উইন্ডোজের মতো হলে ভালো হত_ এখন এই বিষয়টা ভাবতে ভালো লাগছে না, তো বন্ধ করে রাখলাম, এখন চিন্তা করা দরকার, তো চালু করে দিলাম। খুব খারাপ কিন্তু হয় না। শিপন তাহলে সেই কবে না কবেকার স্কুলে যাবার সময়কার কথা আজ ভুলে থাকতে পারত, ভুলে থাকা কী, সেকথা আজ মনেই বা আসতে যায় কেন? সেই সেদিন বাসের মধ্যে যা ঘটেছিল, সেই দগদগে ঘা আজ কেন শুধু শুধু সবকিছু কেড়ে নেয় শিপনের কাছ থেকে, এত সাধ করে করা সব আয়োজন কেন সেটা ভেঙে দিয়ে যেতে পারে, আজ কেন শিপনের সেইসব কথা মনে আসতে হবে। সেইদিনইতো মা কত জোরাজুরি করল, তবু সেতো বলেনাই। মা কেন, কাউকেইতো বলেনাই। তবে? আজ কেন?
রুহির সাথে কতদিন কথার অভাবে বসে বসে শুধু তার হাতধরে কতসময় কাটিয়ে দিয়েছে শিপন, মনে হয়েছে, তবে কি সবকথা শেষ? কতকথা বানিয়ে বলতে গিয়ে সে থমকে গেছে, মনেমনে লজ্জাও পেয়েছে, তবে কি কথা সব শেষ? তাহলে সারাজীবন আর তারা কথা বলবে না? খুব হাঁপ ধরে আসে সেসবকথা মনে করতে গেলে। তবু সেসবদিনে কই, এই কথাটাতো কোনোদিন মনে পড়েনাই? হাতধরে বসে থেকে তারা একে অপরকে বুঝেছে, সপর্শ নিয়েছে, তারপরে আবার কোথা থেকে কথা জুটেছে, বিদায় নেবার সময়তো কথা আর শেষই হতে চায় না।
কী সব আবোলতাবোল ভাবে সে। ভাবুক শিপন, আবোলতাবোলই ভাবুক, আর করবে কী তবে সে? আসলে এখন কোনোকিছু আর তার নিয়ন্ত্রণে নাই, যে কোনোরকম একটা শেষের জন্য এখন কেবল অপেক্ষা করা। হয়ত সেই শেষ আজ দুপুর দুইটা পর্যন্ত, তবু অপেক্ষা আর কতক্ষণ করা যায়, রুহি কিছু বলুক অন্তত।
মিন্টুই একদিন প্রথম বলে, 'চল আজ ডিআইটি রোড থেকে বাসে করে স্কুলে যাবো'। বাসে নাকি চারআনা করে নেয়। তাহলে দুইজনে আটআনা, রিক্সায় গেলে একেকজনের লাগত বারোআনা করে, তাহলে বাকি একটাকায় সিরাজ ভাই'র দোকান থেকে একছটাক করে নকূলদানা, কিংবা সক্রেটিস বা প্লাতিনির দুইটা ভিউকার্ড কেনা যায় অনায়াসে। মিন্টুর অনেক সাহস, তা সাহসতো হবেই, মিন্টু একদিন হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরলেও মিন্টুর আব্বা বা আম্মা কিছু বলে না, মরিয়মের মাকে ফাঁকি দিলেও কিছু বলে না। মরিয়মের মা বলে মিন্টু নাকি গোল্লায় যাবে, কিন্তু আমার কাছে মিন্টুর আব্বা আর আম্মাকে অনেক ভালো লাগে, ওর আব্বা আর ও রাতজেগে হৈচৈ করে খেলা দেখে, নীতারা থাকতে মাঝেমধ্যে নীতার আব্বা আর ওদের মিলনমামাও মিন্টুদের বাসায় যেত খেলা দেখতে, খালাম্মা চানাচুর মাখানো মুড়ি খেতে দিত সবাইকে। আর আমাদের বাসায়! রাত নয়টার পর টিভি দেখা বন্ধ, খেলাতো আর নয়টায় হয় না, হয় সেই রাত বারোটায়, একটায়, আড়াইটায়, তা মিন্টুরাতো ঠিকই দেখে। বরঞ্চ ওর আব্বার সাথেই বসে বসে টিভি দেখে। আমার খুব মিন্টুদের বাসার কোনো একজন হতে মন যায়, হয়ত মিন্টুর ভাই হতে ইচ্ছা করে। দুইভাই একসাথে স্কুলে যেতাম, ভাগাভাগি করে ভিউকার্ড কিনতাম, আর সেসব ভিউকার্ড তখন লুকিয়েও রাখতে হত না। মিন্টু কত মজা করে সবাইকে ভিউকার্ড দেখায়, কই ওর আব্বাতো এর জন্য কখনও তার কান মলে দেয় না। ওর আব্বা বরঞ্চ সবাইকে আরও গল্প করে, ওই পুচকে মিলনের কাছে পর্যন্ত মিন্টুর জন্য পেলে'র ভিউকার্ড চায় খালুজান। আর শিপনকে কিনা ভিউকার্ড তোষকের নিচে লুকিয়ে রাখতে হয়, রোদে দেয়ার জন্য সেই তোষক উল্টে ভিউকার্ড পেয়ে মা তার কান মুচড়ে ছিঁড়ে দিতে চায়।
অথচ এসব ভাবতাম বলে, এইরকম আবোলতাবোল ভাবতাম বলে মাঝেমাঝে খুব লজ্জাও লাগত, তা আবোলতাবোলইতো, একবাসার মানুষ কি আর অন্যবাসার কারও ভাই হতে পারে? আমিতো এই বাসার, পচামার্কা একটা বাসার একজন হয়েই গেছি। একবার একবাসার কেউ হয়ে গেলে কি তা আর বদলানো যায়?
উকিলপাড়া থেকে জামতলা, তা পায়ে হেঁটে গেলে পোনে একঘণ্টাতো লাগবেই, কোনো কোনো সময় তার থেকে দশমিনিট বেশিও লাগে। আমরা রিক্সায়ই যেতাম, আমাদের বাসার মরিয়মের মা'র দায়িত্বে আমি, মিন্টু ছাড়াও নীতা, আর নীতার ভাই চিকুর একটা রিক্সায় গাদাগাদি করে যেতাম। নীতারা ময়মনসিংহ চলে যাবার পর আমি আর মিন্টু সেইযে একদিন প্রথমবার বাসে চড়ার এডভেঞ্চার করেছিলাম তা কিন্তু মিন্টুরাও চলে যাবার পর বজায় রেখেছিলাম। বাসায় কখনও বলিনাই, বাসে গিয়ে রিক্সাভাড়া বাঁচিয়ে কতকিছু করা যায়! তা কেন বলতে যাব শুধু শুধু? তাহলেতো মা ঠিক পরদিন থেকে সাথে মরিয়মের মাকে পাঠাত।
সেদিন একা একা উকিলপাড়া থেকে বের হয়ে ডিআইটি রোডের যাত্রীছাউনিটার নিচে এসে দাঁড়ায় শিপন। মরিয়মের মাকে সাথে দিয়ে দেয়ার চেষ্টা অনেক কষ্টে কাটিয়ে দিয়ে এমনকি মরিয়মের মাকে রিক্সা ডেকে দেয়ার দায়িত্ব থেকে পর্যন্ত রেহাই দিয়ে একা একা বের হয় শিপন। একটা করে বাস আসে যায়, কোনোটাতে চড়ার সাহস হয় না, কিজানি লোকে যদি জিজ্ঞেস করে বসে কেন রিক্সায় যাচ্ছে না সে, তার কী জবাব দেবে?
তা, জবাব দেয়া আর কী এমন শক্ত_ বলবে, সেতো বাসেই যায়। রিক্সায় যাবার সামর্থ্য যে তাদের নাই, তারাতো গরিব। তবে মিন্টু থাকতে কিন্তু এতকথা ভাবতে হয়নাই। মনেও আসেনাই। মিন্টুতো হড়বড় করে কথা বলতে বলতে বাসে ওঠে। এমনকি মাঝেমাঝে কন্ট্রাকটারের সাথে ঝগড়াও করে ভাড়া বেশি চাইলে।
কিন্তু কোনো পরিচিত লোকের সাথে যদি দেখা হয়ে যায়? আর শিপনের মনে হয় বাসস্ট্যান্ডের সবলোক শুধু তার দিকেই তাকিয়ে আছে, তারা কেউ যদি আব্বার চেনা হয়, এখন তাকে কিছু না বলে যদি শুধু গোপনে আব্বার কাছে গিয়ে বলে দিয়ে আসে। কত চিন্তা করতে হয় শিপনকে, ঠিক-বেঠিক, প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়, চিন্তা করতে করতেইতো শিপন অবাক হয়ে দেখে, সে কখন তাদের স্কুলের কাছে চলে এসেছে, আর এতক্ষণ এই প্রায় একঘণ্টা ধরে হেঁটে হেঁটে আসার কারণে প্রথম পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে। বাসায় ঠিক নালিশ চলে যাবে। তা আজ যদি বাসে উঠতে সে ভরসা নাই পায় তাহলে রিক্সায় আসল না কেন সে? অন্যদিন, অন্য কোনোদিন সে বাসে আসতে পারত, শিপনের খুব কান্না পায়, সে এরকম কেন? আর সবারতো এত চিন্তা করতে হয় না। আকাশপাতাল চিন্তা করে করে সে সব ভুল করে ফেলে কেন?
তা বাসে ওঠার অভ্যাস সে ঠিকই একদিন তৈরি করে ফেলে, বাসায় ফেরার সময় শুধু রিক্সায় যায়, বাসার গেটের সামনে নেমে ভাড়া দেয়, কেউ কিছু বুঝতে পারে না। কিন্তু এত লুকাছাপা, সামান্য বাসে চড়তে পারার আধঘণ্টার স্বাধীনতা, সেটাও সেদিন মিছমার হয়ে যায়। সেই বাসে চড়তে গিয়েই, হতচ্ছাড়া বাস! কুত্তা বাস! সেই শিউলি পরিবহন!
বাসা থেকে বের হতে শিপনকে একটু তাড়াহুড়া করতে হয় আজকাল, মা সন্দেহ করে, স্কুলে যাবার এত তাড়া কেন, আগেতো কোনোদিন এরকম দেখিনাই, তবু মা হয়ত খুশিই হয়, কারণ শিপন বলে, একটু তাড়াতাড়ি না গেলে প্রায়ই রেলগেটের সিগন্যালে আটকে পড়ে, সেখান থেকে বের হতে অনেক সময় লাগে, আর প্রথম পিরিয়ডে বেশিরভাগ দিনই দেরি হয়ে যায়, আর প্রথম পিরিয়ডের জয়নাল স্যারকেতো চেন না? মেরে হাড্ডি ভেঙে দেয়_ এসব কথা শুনে মা হয়ত খুশিই হয়।
তা আজ সহজেই বাসে চড়তে পারে শিপন, যদিও যাত্রীছাউনিতে এসে দাঁড়ানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই শিউলি পরিবহন নামের যে বাসটা আসে সেটাতে অনেক ভিড় দেখে দমে যায় শিপন, অথচ আজ একটু তাড়াতাড়ি যেতেই হবে, কালও জয়নাল স্যার ধমকে সাবধান করেছে তাকে, বলেছে, 'প্রতিদিন তোরই দেরি করতে হয়? কই, আরতো কারও দেরি হয় না? বাসায় বাজার করে দিয়ে তারপরে আসিস তুই, তাই না? বিয়ে করেছিস'? এইসব খারাপ করে করে কথা বলে জয়নাল স্যার। তা সেজন্য তাড়াহুড়া তাকে আজ করতেই হয়।
- কী যাবা না?
পিঠে কার হাত পড়তে ভীষণ চমকে ওঠে শিপন, এই বুঝি ধরা পড়ে গেল, ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখে, একজন লোক, তার আব্বার চেয়েও বয়সে বড় হবে, তাকেই বলছে, সে যাবে কিনা। তা যাবেতো শিপন, কিন্তু এই ভিড় ঠেলে কি আর সে উঠতে পারে। আশ্চর্য ব্যাপার লোকটা তাকে উঠতে সাহায্য করে, আর সব লোকদের ঠেলে তাকে শিউলি পরিবহনে উঠিয়ে দেয়, নিজেও ওঠে। বাসে উঠেও লোকটা শিপনকে ধরে রাখে, শিপনের পেছনে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একহাতে শিপনকে পেঁচিয়ে ধরে রাখে, শিপনের হাসি পায়, সেকি আর পড়ে যাবে নাকি? লোকটা এত বোকা কেন?
কিছুক্ষণের মধ্যেই শিপন বুঝে ফেলে লোকটা কিন্তু বোকা নয়_ উকিলপাড়া থেকে জামতলা দুইটা মোটে স্টপেজ, জামতলা পর্যন্ত যেতে পনেরমিনিট মতো লাগে, এই পনেরমিনিটের মধ্যেই শিপনের কাছে প্রমাণিত হয়, লোকটাকে যতখানি বোকা আর যতখানি ভালো ভাবা গিয়েছিল, লোকটা তার কিছুই নয়, লোকটা তবে কী, কিজানি, শিপন বলতে পারে না।
বাসের মধ্যে লোকটার জড়িয়ে ধরে থাকা যখন একসময় শিপনের কাছেই অসহ্য হয়ে উঠতে শুরু করে, লোকটার হাত যখন শুধু শিপনকে পেঁচিয়ে ধরে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, হাতটা যখন আরও সক্রিয় হয়ে উঠে আস্তে আস্তে নিচের দিকে নেমে শিপনের প্যান্টের ভেতরে ঢুকে যায়, তখন শিপন ঐ প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যেও তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চেষ্টা করতে থাকে। আর তার নড়াচড়া করা দেখে_ লোকটা কি বদমাশ! আবার নরমস্বরে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, 'নড়ো না খোকা, পড়ে যাবেতো!'
- তুই ছাড়! আমাকে ছাড়! কুত্তা! ছাড়!
মনেমনে গাল দেয় শিপন। আর অবাক হয়ে দেখে লোকটা তার প্যান্টের বোতাম খুলে ফেলে। সে কি চিৎকার করে বাসের লোকদের বলে দেবে? কিন্তু প্যান্টের বোতাম খুলে ফেলা যে বড় লজ্জার, তা সে বাসের লোকদের বলে কেমন করে, লোকটা তার নুনু ধরে নাড়াচাড়া করতে থাকে। আর অন্যদিকে শিপনের বামহাত নিয়ে লোকটা তার নিজের পায়জামার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়, তার হাতে ধরিয়ে দেয় তার শক্ত হয়ে ওঠা পৌরুষ। শিপনের ঘেন্না করে খুব, প্রাণপণে সে মোচড় দিয়ে দিয়ে সরে আসার চেষ্টা করে, আর লোকটা সাথেসাথে শিপনের নুনু ধরে মোচড় দেয়, ব্যথায় শিপনের চোখ দিয়ে দরদর করে জল গড়ায়, অথচ সেই জল লুকানোর জন্য সে নিজেই আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে লোকটা একবার কেমন শিউরে ওঠে, কেমন কেঁপে গিয়ে শিপনের বামহাতে গলগল করে তীব্র গরম আঁষটেগন্ধের বিষাক্ত পৌরুষ ঢেলে দেয়।
ঠিক তখনই জামতলা এসে দাঁড়ায় বাসটা। বাস থেকে নেমে একদৌড়ে স্কুলের গেট দিয়ে ঢোকে শিপন, চোখে কিছু দেখতে পায় না সে, কেবল অন্ধের মতো দৌড়ে স্কুলের মাঠ পার হয়ে পুকুরঘাটের দিকে যেতে চায় সে। মাঠ কি আর শেষ হতে চায়, মাঠতো কিছুতেই শেষ হয় না। একসময় পুকুরঘাটে আসতে পারে শিপন, হাত ধোয়, লালশানের ঘাটে ঘষেঘষে হাতের চামড়া তুলে ফেলে, তবুতো সেই গন্ধ, সেই বিষের মতো উষ্ণতা তার হাত থেকে চলে যায় না।
ঠিক সেদিনই জয়নাল স্যারের তাকে মারা চাই, 'দেরি করে আসলি কেন?' বলে যখন হাত পাততে বলে স্যার; তখন সেই কলঙ্কিত হাত সে কিভাবে স্যারের সামনে ধরে? সে শুধু ঘাড় গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকে, আর স্যারের সে কি রাগ! 'হাত পাতবি না? এতবড় সাহস! দাঁড়া বেতিয়ে তোর পাছার চামড়া আজ তুলে ফেলব। বেয়াদব কাঁহিকা!' মারুক, জয়নাল স্যার মারুক, আজ শিপন মরে যাক, এই পৃথিবীর কারওতো আর শিপনকে দরকার নাই, শিপন তাদের কে?
জানালা দিয়ে শিপন কেবল বাইরে তাকিয়ে থাকে, একসময় জয়নাল স্যারের মার শেষ হয়, একসময় স্কুল শেষ হয়, হেঁটে হেঁটে, নাকি রিক্সায়, নাকি বাসে, নাকি উড়ে উড়ে একসময় বাসায়ও চলে আসে সে। গোসল করে ভাত খেয়ে পড়তে বসলে জ্যামিতি বইয়ের সকল সর্বসাম্য উপপাদ্য মিথ্যা প্রমাণিত করে শিপনের চারপাশ থেকে উঠে আসে উদ্যত সব শিশ্ন। শিপন জ্যামিতি বইয়ের উপর তার হাত মেলে ধরে, হাত দুইটা ঘষেঘষে চামড়া তুলে ফেলেছে সে, লাললাল চাকাচাকা হয়ে আছে শিপনের কোমল হাতের তালু।
- কী হইছে হাতে?
পেছনে মার গলা শুনে মুহূর্তে বুঝতে পারে না শিপন হাত লুকিয়ে ফেলবে কিনা, তবে তার আগেই মা তার হাত ধরে ফেলে।
- একিরে, তোর হাতে কী হইছে?
- পড়ে গেছিলাম।
- পড়লি কেমনে?
- খেলতে গিয়ে ... -
ও তাহলে ছুটির পর বাসায় না ফিরে স্কুলেই খুব খেলা হচ্ছে, না? তাইতো বলি স্কুল থেকে আসতে সাহেবের এত দেরি হয় ক্যানো?
কানটা মুচড়ে দিয়ে আরও সব কী কী বলতে থাকে মা, তা আর শোনা হয় না শিপনের। শিপন বধির হয়ে যায়।
দুপুরে খেয়ে মা ঘুমালে চুপিচুপি বারান্দায় এসে রেলিঙে থুতনি রেখে শিপন নিচতলায় নীতাদের ছেড়ে যাওয়া বাসায় নতুন আসা বাচ্চাদের খেলা দেখে। ওরা কত হৈচৈ করে খেলে, ওদের কারওতো আর শিপনের মতো দুঃখ নাই। ওদের কারও হাততো আর কলঙ্কিত হয়ে যায়নাই। ওদের কারওতো আর এই শিপনের মতো মরে যেতে ইচ্ছা করছে না। ওদেরতো কেউ না কেউ ভালোবাসেই_ কম হোক আর বেশি। শিপন আজকে কী দোষ করেছে, সবাই যে ওকেই ধরে ধরে মারছে, জয়নাল স্যার কিছু না বুঝেই মারল, দেরিতো আজ সে আর ইচ্ছা করে করেনাই, তবে বুঝি হাত না ধুয়েই সে ক্লাসে আসবে? আর মাওতো খুব, এখনতো খুব ঘুমানো হচ্ছে, এই ঘুমানোর আগে ছেলেকে না মারলে তোমার বুঝি ঘুমই আসত না! শিপনের এত দুঃখ কেন_ শিপন কেন জন্মাতে গেল তবে_ না জন্মালে কী এমন ক্ষতি ছিল_ শিপনের গলায় এত ব্যথা কেন? শিপনের সামনে পৃথিবী ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে।
ফাঁকা হয়ে থাকা আকাশে অলসভাবে উড়তে থাকে চিল, চিলের ডানায় রোদ লেগে ঝকমক করে, পুরা আকাশটাই হয়ত ঝকমক করে। অতবড় আকাশের গায়ে আরও বিশাল এক দুপুর ফুটে থাকে বলে তাকে আরও মস্ত দেখায়। এই মস্ত দুপুরবেলা সবাইকে ফাঁকি দিয়ে শিপন তবে মরে যাক, অথবা চুপ করে কোথাও হারিয়ে যাক। সবার তখন খুব আনন্দ হবে তাহলে।
তা এসবকথা আজ রুহির জন্মদিনে শিপনকে কে মনে করতে বলে? হঠাৎ আজ এতবছর পরে কেন এসব ছাইপাশ মনে করা?
আজ শোয়েবের বাসায় পাওয়া বহুকাঙ্ক্ষিত দুইঘণ্টায় শিপন যখন জীবনে প্রথমবার রুহির কাছে তার সমস্ত শৈশব বিসর্জন দিয়ে পুরুষ হয়ে উঠতে যায়, তখনই সেই বাসের ভেতরকার এক অজানা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষাক্ত পৌরুষের স্মৃতি শিপনের সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। শিপনও তবে সেই লোকটির মতো পুরুষ? আর তখন সেদিনকার ছোট্ট শিপনের কথা মনে করে তার এই প্রথম জানা উত্থিত পৌরুষ, তার উদ্যত শিশ্ন সিঁটকে আসে। তাকে নিবৃত্ত হতে হয়।
একটা পরাজিত গলায় সে আস্তে করে রুহিকে ডাকে, রুহি উত্তর দেয় না। রুহি কি রাগ করেছে? নাকি শিপনের ডাক এত ক্ষীণ ছিল যে তা শুনতেই পায়নাই সে। তবে কি শিপন রুহিকে ডাকেনাই? নিঃশব্দ নিশ্বাসের সাথে সাথে রুহির পিঠ আরও নিঃশব্দে ওঠানামা করতে থাকে। রুহির পিঠের মাঝখানে একটা লালচে দাগ, দাগটাতে খুব আদর করে একটা চুমু দিতে ইচ্ছা করে শিপনের, কিন্তু স্থানুর মতো বসে থাকা তার সংবেদহীন শরীর সে ইচ্ছা কার্যকর করে না, অথচ সমস্ত পরাজয় আর অসহায়তা কাটানোর জন্য তার কোনো কথা বলা দরকার কিংবা একটা কিছু করা দরকার, অথচ শিপন কথাবলার মতো কোনো প্রসঙ্গ খুঁজে পায় না।
এইসব ভাবতে ভাবতেই একসময় ঘড়ির দিকে চোখ পড়ে শিপনের, এরই মধ্যে প্রায় দুইটা বেজে গেছে দেখে সে খুব ব্যথিত হলেও আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শোয়েবের মধুবাগের বাসা ছেড়ে দেবার অনিবার্যতা শিপনকে মনেমনে স্বীকার করতেই হয়, আর রুহিকে একথা জানাতে তার খুব দ্বিধা হয়, দ্বিধা হয় তার শৈশবের সবকথা খুলে বলতে।
আর সবার কত রঙিন না হোক, কত উজ্জ্বল শৈশব থাকে, সারাজীবন তারা সে শৈশবকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে মনে করে, সেইসব স্মৃতিময় শৈশব নিয়েই নাকি শেষবয়সে মানুষ বেঁচে থাকে। আর শিপনের বেলা?
ঝিলের জল থেকে পিছলে আসা রোদ আর জানালার শিকের দ্বন্দ্বে তৈরি হওয়া সবুজ আভার জলছবি ছাদ থেকে কখন অদৃশ্য হয়ে গেছে। ভাঙাগলায় আবারও রুহিকে ডাকে শিপন।
- রুহি! ওঠো, যেতে হবে।
রুহি হয়ত শিপনের ডাক এবার শুনতে পায়। রুহি ওঠে। আস্তে আস্তে কাপড় পরতে থাকে সে। রুহির মুখ দেখে কিছু বোঝা যায় না, রুহি শিপনের দিকে তাকায় না, লজ্জায় নাকি রাগ করে, তা বলার সাধ্য কি আর শিপনের আছে? শিপন শুধু শূন্যদৃষ্টিতে রুহির দিকে তাকিয়ে থাকে।
রুহি, তুমিতো সবকিছু জান না, আমার সবকথা তোমাকে একদিন ঠিক বলব, এতদিন বলিনাই, বলব কিনা বুঝতে পারিনাই, আর একি বলার মতো কোনো কথা যে খুব গল্প করতে হবে এসব নিয়ে? যেদিন বলব সেদিন তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে, কেন আমার আজ এরকম হল, তোমার শরীরের এত কাছাকাছি এসে, আমার পুনর্জন্ম হতে হতে কেন আমি মুহূর্তে সব হারিয়ে ফেললাম? এক পরিত্যক্ত শৈশবের কাছে আমার হার স্বীকার করতে হল, আমার মনে হল, তাহলে আমিও ঐ লোকটার মতো খারাপ, এটা কী তবে খারাপ নয়? এটা কী তবে স্বাভাবিক, আমিতো খারাপ নই, মন্দলোকতো আমি নই, মন্দ কি? বল না, তুমিই বল না, তুমিতো আমাকে কতদিন চেন_ এই তোমার চেয়ে আজ আর কে আমাকে ভালো চেনে, সেই ছোটবেলাকার বাসে চড়ে সেদিন এই শিপনের মরে যেতে ইচ্ছা করেছিল, অথচ আজ বাসের সেই বদমাশ লোকটার মতো করে আমারও ..., কিন্তু তবু কোথায় একটা পার্থক্য তার সাথে আমার নিশ্চয়ই আছে, আমি বুঝতে পারি, তুমিও নিশ্চয়ই পারবে।
রুহি অবাক হয়ে দেখে শিপনের চোখ দিয়ে জল গড়ায়, কাপড় পরতে শুরু করার সময় থেকেই রুহি না তাকিয়েও বুঝতে পারে তখন থেকেই শিপন তার দিকে একদৃষ্টে তাকানো। মানুষ এত তীব্র দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতে পারে? রুহি কয়েকবার চোখ সরিয়ে নিয়েছে শিপনের চোখ থেকে, রুহি রাগ করেনাই, মন খারাপ করেছে শুধু। মন খারাপতো করতে পারে রুহি। আজতো তার জন্মদিন, জন্মদিনেতো সে আরেকটু বেশি আশা করতে পারে, পারে না? রুহির মনে হয় পারে। তাছাড়া একি রাগ করার কিছু? আজ হয়নাই, আচ্ছা আরেকদিন হবে, শিপনের অমন তীব্র তাকিয়ে থাকা দেখে এইরকম কথা রুহির মনে হয়। রুহি দেখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শিপনের চোখ দিয়ে জল গড়ায়, শিপন কি কাঁদে? অনেক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে থাকলে যেকারো চোখে জল আসবে, তবু রুহির মনে হয় কাঁদে শিপন। রুহির খুব অনুশোচনা হয়, সে কেন এতক্ষণ মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে থাকল, সে যদি একটু হেসে কথা বলত, গল্প করত, যদি একটু সহযোগিতা করত তাহলে নিশ্চয়ই শিপন তার দিকে মনোযোগ দিতে পারত।
শিপনের তাকিয়ে থাকা আর সহ্য করতে পারে না রুহি, তার খুব কষ্ট হয়, ধীরপায়ে এগিয়ে এসে শিপনকে ধরে সে, আর মুহূর্তে শিপন কী ছেলেমানুষ হয়ে যায়, খাটের ওপর বসে থাকা নগ্ন শিপন আঁকড়ে ধরে রুহিকে, রুহির বুকের ওমের ভেতরে মুখ গুঁজে দিয়ে বিপুল কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিপনের পিঠে, চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে রুহি।
আর একসময় সমস্ত ভুলে গিয়ে, রুহির কাছে তার সকল শৈশব বিসর্জন দিতে দিতে শিপন বড় হয়ে যায়, পুরুষ হয়ে যায়। দুইটার সময় শোয়েব এসে দরজা বন্ধ দেখে, ডাকাডাকি করে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আবার ফিরে গেছে কিনা, তা শিপন কিংবা রুহির আর জানা হয় না_ মেহগনিগাছটার পাতায় পিছলে বা তারও পেছনের ঝিল থেকে প্রতিফলিত হয়ে যে আলো ঘরের ছাদে কলাপাতাসবুজ রঙের এক জলছবি তৈরি করেছিল, সেই আলো তার শেষ অবশেষটুকু পৃথিবীর গায়ে শেষবারের মতো বুলিয়ে দিয়ে নেমে গেছে কিনা তাও তাই তাদের আর জানা হয় না। আর সবদিনের মতো করেই আবার একটা অতি সাধারণ সন্ধ্যা নিঃশব্দে নেমে আসে।
Saturday, February 9, 2008
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment