Monday, September 1, 2008

খুনে

টিনের গেটটা এখনও মজবুত। তবে খুব অবহেলায় বেড়ে ওঠা একটা জীবনের মতো কাঠের ফ্রেম থেকে টিন অনেকটা আলগা হয়ে গেছে বলে বাইরে থেকে কেউ গেট ধাক্কালেই ভীষণ শব্দ হয়। মেনে নিতে নিতে একসময় আর না পেরে কোনো কোনো সন্ধ্যায় বেদেপাড়ায় বেধে যাওয়া তুমুল ঝগড়ার মতো হঠাৎ পাড়া সচকিত করা শব্দ তোলে গেটটা। আর সে তীব্র খানখান শব্দে বাড়ির লোকেরা যতটা না চমকায় তারচেয়ে গেট ধাক্কা দেয়া নতুন কোনো লোক বড় বেশি চমকে যায়। লজ্জিত হয়ে পড়ে। আর এত সাতসকালে গেট ভেঙে ফেলার মতো করে ধাক্কানোর শব্দে প্রথমেই কেউ মরে টরে গেছে জাতীয় সংবাদ পাবার আশঙ্কা নিয়ে কাঁচাঘুম ভেঙে থমধরা বুকে অনেকক্ষণ বসে থেকে শেষ পর্যন্ত উঠে এসে তখনও বিপুল উৎসাহে শব্দ করতে থাকা গেটটা খুলেই দেখি হারাধন চণ্ডমূর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে। সাতসকালেই তার হাতেমুখে কালি, মবিল। হাতে একটা প্লায়ার্স। এতক্ষণ ধরে কেউ গেট ধাক্কায়? 'সকালবেলা একখান টুকা দিলি বাড়ির লোকতো বাড়ির লোক, সারা হাতিগারার তাবৎ লোক তা শুনবের পারে'। তা এতকথা অবশ্য হারাধন কওয়ার সুযোগ দেয় না। কিছু বলতে যাবার আগেই, এতজোরে গেট ধাক্কানোর অপরাধে বিরক্ত হবার সামান্য সুযোগটুকু নেবার আগেই হারাধন বরঞ্চ হাতের প্লায়ার্স নাড়িয়ে আমাকেই দুইকথা শুনিয়ে দিয়ে বেগে চলে যায়।

হারাধন কোনোকথা আস্তে বলতে পারে না। আস্তে গেট ধাক্কাতে পারে না। সবকিছু তাকে অনেক জোরে করতে হয়, বলতে হয়। হারাধন অবশ্য কানেখাটো নয়। কানেখাটো লোক নাকি জোরে জোরে কথা বলে, ভাবে জোরে না বললে কেউ শুনতে পাবে না। বরং হারাধন একটু বেশিই শোনে। কেউ কোনো একটা কথা বলছে, সেখানে হারাধন নামটা যদি প্রসঙ্গক্রমে এসে পড়ল_ তা সে যত আস্তেই বলুক, বিশত্রিশ গজের মধ্যে থাকলে হারাধন তা শুনতে পাবেই। আর অমনি, "কী? হারাদন কী করিচে? অঁ্যা, বলি করিচেডা কী হারাদন?" বলতে বলতে ছুটে আসবে।

হারাধনের এই একরকম। ইয়ার্কি বুঝবে না, ঠাট্টা বুঝবে না, কেউ কিছু বললেই মনে করবে সে হিন্দু বলে, তার মতো দুয়েকজন হতভাগা ছাড়া এলাকার হিন্দুরা সবাই ওপার চলে গেছে বলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষমতার অপব্যবহার করে, বিশেষকরে তাকে লক্ষ্য করেই কথাটা বলা হয়েছে। তখনকার মতো সে কিছুই বলবে না। চুপ মেরে থাকবে। কিন্তু ঐদিনই এলাকার মুরবি্বদের কাছে নালিশ ফালিশ করে, ইনিয়ে বিনিয়ে, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে, দিব্যি দিয়ে, কিরা দিয়ে বিচার আদায় করে তবে ছাড়বে।

সাতসকালে তাই এবাড়িতে ছুটে আসা হারাধনের। ব্যাপার গুরুতর কিছু নয়। সামপ্রদায়িক কিছু নয়। বরঞ্চ সংখ্যালঘিষ্ট আর একলা পড়ে যাওয়া হারাধনও সংখ্যাগরিষ্ঠ এই আমাদের ধমকে যায়, শুধু এইবাড়ির লোকদের। আমরা কাউকে জোরে কথা বলি না। আমরা কাউকে ধমক দেই না। কেউ কিছু বললে আমরা শুনি, মেনে নেই। মুন্নার জন্য মেনে নেই।

হারাধন বলতে আসে, আমরা কেন মুন্নাকে দেখে রাখি না_ আমরা কেন মুন্নাকে রাস্তায় বের হতে দেই? আমাদের না হয় মুন্নার জন্য অনেক আল্লাদ আছে, তাই বলে মানুষকে যে সেই আল্লাদের দাম দিতে হয়, আমাদের মতো ভদ্দরলোকের কি সেই খবর একটু রাখতে নাই? নিজের ছেলে কি ভাই হলে মুন্নাকে তারা বেঁধে রাখত, এইসব কথা খুব করে শুনিয়ে দিয়ে হারাধন হাতের প্লায়ার্স দোলাতে দোলাতে হনহন করে চলে যায়।

মুন্নাকে নিয়ে আল্লাদ করার খুব একটা ইচ্ছা, ইচ্ছা কী, সেরকম আল্লাদ করার, এমনকি তা ভাবার সুযোগও আমাদের নাই। তা না থাকলেও কাক অথবা মোরগ ডাকার আগেই গেটটা সন্তর্পণে খুলে বাইরে চলে যাওয়া চাই মুন্নার। যদিও উত্তরে ইছামতির চৌধুরীঘাট বা তারও উত্তরে হুরাসাগর নদীর কোলঘাট বা বড়পায়না'র বটতলা, দক্ষিণে উপজেলা সদর, পূবে ডাকবাংলার মোড় আর পশ্চিমে হাসপাতাল পার হয়ে সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ড অথবা তার কিছুটা উত্তরপাশে স্লুইজগেট, পাম্পহাউজ_ মুন্নার যাতায়াতের সীমা বড়জোর এইকয়টা জায়গার মধ্যে হলেও সাইকেল মেকানিক হারাধনের দোকান এই সীমার বাইরে নয় বলেই সে মুন্নার পাগলামির নালিশ করতে আসে, বিশেষকরে ওর খুনেদৃষ্টির জেরে তার ক্ষতি হয়ে যাবার নালিশ।

তা মুন্নাকে আমরা বেঁধে রাখি না। মুন্নার বলার বোঝার ধরন সাধারণের চেয়ে একটু আলাদা হলেও, আসলে একটু নয় বেশ খানিকটাই আলাদা, একথা আমরা বুঝলেও, মেনে নিলেও, মুন্না পাগল, মুন্নার চোখের দৃষ্টি 'খুনে', 'অলক্ষুণে', যা কিছুর দিকে সে তাকাবে একেবারে মিছমার করে ছাড়বে, হাজার হাজার নজির আছে তার_ এসবকথা আমাদের মানতে কষ্ট হয়। এ হয়ত আমাদের পক্ষপাত, খুব কোলেতোলা আদর, কিন্তু মুন্না যে আর দশজনের মতো করে ভাত খায়, কথা বলে, রাগ করে, অভিমান করে, পড়া মুখস্থ করতে পারে, বিদু্যতবিলের লাস্টডেট মনে রাখতে পারে; সেকথা হারাধনেরা জানবে কোথা থেকে? কিসের পক্ষপাত? মেধাতো তার কম নাই। তবু কী করেছে মুন্না হারাধনের, আসুক মুন্না, বুবুকে না বলুক, বিথীকে না বলুক, দুলাভাই আসলে তাকেও না বলুক, আমাকে নিশ্চয়ই বলবে।

রাত্রে পাশের বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি ঠিক তার সবকথা শুনছি বিশ্বাস করে কতকথা বলে যেতে থাকে সে একঘেয়ে স্বরে, হয়ত কোনো কোনোদিন আমি শুনি, কিন্তু বেশিরভাগ দিনই ওর একঘেয়ে স্বর শুনতে শুনতে আমি কখন ঘুমিয়ে যাই। আর সেজন্য, সেজন্যই বোধহয়, আজ এখন হারাধন একগাদা কথা শুনিয়ে রাগ দেখিয়ে চলে যাবার পর আমার খারাপ লাগতে থাকে, একটা অপরাধবোধ হতে থাকে। আজ আমি ঠিক শুনব, সবকথা শুনব, বলতে বলতে যদি ঘুমিয়ে পড়িস তুই, তোর মায়াভরা মুখের দিকে তাকিয়ে সকাল পর্যন্ত বসে থাকব আমি, তোর ঘুম ভাঙলে তারপর আবার সবকথা শুনব। আমাকে আজ শুনতেই হবে। তারপর আমিও হারাধনকে দুইকথা খুব করে শুনিয়ে দিয়ে আসব।

মুন্না কিন্তু জানে যে বিটুমামা দৈনিকই তার কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যায়, অথচ সকালে উঠে আর স্বীকার করতে চায় না, মুন্নার বরং মায়া লাগে, তাকে বুঝ দেওয়ার জন্য বিটুমামার পাগলামি চেষ্টা দেখে বরং বিটুমামার জন্য তার মায়া লাগে। 'থাইক, তুমি ঘুমপাইরো মামা, তাতে আমার কুনুই অসুবিদা নাই'। মুন্নার বরঞ্চ তাতে অনেক সুবিধা, মনের সুখে অনেক কথা বলে ফেলা যায়, কে বিশ্বাস করল, কে করল না, তা নিয়ে অনেক ভাবার যন্ত্রণা নাই। 'হইছে এখন চুপ কর'_ বলে কারও ধমকে থামিয়ে দেওয়ার ভয় নাই। সবাই এরকম করে কেন? না, সবাই না, ছবি কিন্তু সব বিশ্বাস করে। এ বরং এক ফ্যাকড়া, ছবি সব বিশ্বাস করতে যায় কেন?

ছবিদের বাসায় গেট দিয়ে ঢুকেই বামদিকে আমগাছ আর টিনের বেড়ার চিবির মধ্যে একটা মাটির কলস যুগ যুগ ধরে উপুড় করা আছে, কলসটা ভাঙা, নাকি ভালো, কেন কী কারণে সেটা ওখানে উপুড় করে রাখা হয়েছিল, আর এখনও কেন উপুড় করে রাখা_ ছবিদের বাসার কেউ এখন আর বলতে পারে না, মুন্না অবশ্য কখনও জিজ্ঞেস করেনাই, তবে সে অনুমান করতে পারে ওরা কেউ বলতে পারবে না। বলতেই যদি পারবে, তো প্রথম যেদিন মুন্না ছবিকে বলল, 'আরে! তোমাগরে বাসায় এত্তোবড় উঁইঢিবি হল কবে'? সেদিন ছবি কেন বলতে গেল যে, সেতো অনেকদিন!

- কেন মুন্নাভাই, তুমি এতদিন আস আমাগরে বাসায়, ইডা দেহনাই কুনুদিন? তুমার না সব মনে থাকে!

মুন্না আশ্চর্য হয়ে যায়। ছবির মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করে, ছবি কোনো দুষ্টামির চেষ্টা করছে কিনা, তা ছবির মুখ দেখে সে কিছু বুঝতে পারে না। ছবি টলটলে চোখে সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছবির অনেক আশা করে তাকিয়ে থাকা দেখে বরঞ্চ মুন্নার মায়া হয়, সে ছবির কথায় সায় দেয়। আহা! বেচারি এত সখ করে যখন বলেছে, তখন মুন্না বানিয়ে বানিয়ে বলে যে তাদের বাসায় এরচেয়ে বড় উঁইঢিপি আছে।

- জানি, তোমাগরে কুয়াতলার কাছে, তাইনা?

মুন্নার আরও অবাক লাগে, মেয়েটা নিশ্চয়ই পাগল। আহারে! সাইফুলেরইতো বোন, আহা! সাইফুল থাকলে নিশ্চয়ই অনেক আদর করত ছবিকে, এটাওটা এনে দিত। বিথীরতো খুব সিনেমা দেখার সখ, ছবিরও নিশ্চয়ই আগ্রহ থাকবে। সাইফুল থাকলে নিশ্চয়ই ওদের সিনেমায় নিয়েটিয়ে যেত, তা এখন কে নিয়ে যাবে? মুন্না প্রসঙ্গ পাল্টায়।

- বিকালে রেডি থাইকো ছবি, ইছামতিত্ সোহাগী আইছে, টিকেট লিয়ে আসবোনে দুইটা, না দাঁড়াও, বিলুআপা কই?

- খুলনা।

- কালইতো দেখলাম মনে অ'লো।

- কাল আছিল, আজই চলে গেছে।

- তালিতো দুইটা টিকেটেই হবি।

মুন্নার খারাপ লাগে। ছবি কেন তার সাথে মিথ্যা বলে? শুধু তার কথা ঠিক রাখার জন্য? মুন্নার সবকথায় সায় দেবে কেন ছবি? বিলুআপা গতমাসে একবার এসেছিল, তারপর আর আসেনাই। তবে ছবি কেন বলল যে কালতো ছিল, আজই গেছে?
ছবি কেবল সায় দিয়ে যায়, বিটুমামাও বলে সে তার সবকথা শুনেছে, অখচ মুন্না জানে সবকথা কি, শুরুর দিকে কিছুকথা হয়ত শুনেছে মামা, তারপরতো তার নাকডাকার শব্দে হেসে ফেলে মুন্না। সবদিন না, মাঝেমাঝে বিটুমামা বেশ নাক ডাকে। সব ফ্যাকড়া, আর সবার মতো করে তারা বললেইতো পারে, চুপ কর এখন, তা নয়, কেবল কায়দা করে সায় দিয়ে যাওয়া, কে চায় এত আল্লাদ?

হারাধনের দোকানের সামনে এসে থামে মুন্না, দেখে মন দিয়ে কাজ করছে হারাধন। একটা সাইকেল মাটিতে পেড়ে ফেলে পেছনের টায়ার থেকে টিউব খুলে এনে লিক বের করার জন্য ছোট একটা চারির মধ্যে রাখা পানিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে বুদবুদ ওঠে কিনা তাই দেখছে। মুন্না জানে এই লিক খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন, অনেক ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়, এগুলোকে হারাধন বলে চোরা লিক। মুন্নার বেশ আগ্রহ হয়, পায়েপায়ে এগিয়ে এসে হারাধনের পেছনে দাঁড়ায় দেখবে বলে। মুন্না আসামাত্রই লিক খুঁজে পায় হারাধন। মুন্না বেশ অবাক হয়, এরকমতো হবার কথা না? সে কাছাকাছি থাকলে হয় হারাধনের টায়ার ফাটবে, নাহয় বিয়ারিংয়ের ডজন দুইতিন রূপালী বল তার হাত থেকে ফসকে মাটিতে ছড়িয়ে পড়বে। একটা একটা করে সবকটি বল খুঁটে তুলেও আরও অন্তত গোটা পাঁচছয় বল হারিয়ে গেছে মনে করে তারপর আট কি দশদিন মন খারাপ করে থাকবে সে। চেনা, আধচেনা কি অচেনা যেই হোক তার কাছেই সবিস্তারে মুন্নার কুকীর্তি ব্যাখ্যা করবে। মুন্নার যন্ত্রণায় যে কী অশান্তিতে তার দিন কাটছে তার ফিরিস্তি শোনাবে। হারাধন কি আর এমনি এমনি তার উপর খ্যাপা? অথচ সে আসামাত্রই হারাধন কিনা লিক খুঁজে পায়?

লিক জায়গাটা চক দিয়ে একটা দাগ দিয়ে তারপর একটা ঝামা দিয়ে জায়গাটা ঘষতে থাকে হারাধন, ঘষতে ঘষতেই হাতের সামনে মাটিতে কারো ছায়া পড়তে দেখে ঘুরে পেছনে তাকায় সে। মুন্নাকে দেখেই মুখ তেতো হয়ে যায় তার। সামনে রাখা প্লায়ার্সটাই তুলে নিয়ে তেড়ে আসে, গালাগালের তুবড়ি ছোটে মুখে।

- শালা পাগলের গুষ্টি, পাগলের গুষ্টি মারি আমি, সর! সর কলাম এহেন থে!

হারাধনের তাড়া খেয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে হঠাৎ একদৌড়ে রাস্তা পার হয়ে যায় মুন্না। দ্রুত আসতে থাকা একটা রিক্সা মুন্নাকে বাঁচাতে ব্রেক চেপেও থামাতে পারছে না দেখে আচমকাই বামদিকে ঘুরিয়ে দেয়, ফলে ডানদিকে কাত হয়ে রাস্তার উপর পড়ে যায় রিক্সাটা। রিক্সাওয়ালাও খেপে যায়। কোনোমতে ধূলা ঝাড়তে ঝাড়তে আর ব্যথা পাওয়া জায়গাটায় হাত বুলাতে বুলাতে উঠে দাঁড়ায় সে। মুন্নার দিকে তাকিয়ে সেও একচোট ঝাড়ে।

- শালার কানাচুদা লোক না কি? দেহাশুনা নাই, চোকবুজে দিলো দৌড়!

রিক্সাওয়ালার আঁচানো কথায় হারাধনের রাগে ঘি পড়ে, আরও ক্ষিপ্ত হয়ে সে বলতে থাকে, 'অলুক্ষুণে কে আর সাদে কই, শালার কুফা, যেহেনে যাবি, সব মিছমার করবি'। আরও সব কী কী বলতে থাকে হারাধন, অতসব কানেও যায় না মুন্নার, তার বরঞ্চ মনে হয়, রিক্সা থেকে যে পড়ে গেল লোকটা, খুব ব্যথা পায়নাইতো, তারইতো দোষ। করুণচোখে সে পড়ে যাওয়া লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে।

তা রিক্সাওয়ালা যখন হারাধনের কথা থেকে বুঝতে পারে যে মুন্না পাগল, তখন কিন্তু তার সুর পাল্টে যায়, সে বরঞ্চ আরেকবার মুন্নার দিকে তাকিয়ে রিক্সাটা তুলতে তুলতে হারাধনকে বলে, 'থাকই বাই, পাগল ছাগল মানুষ, দোষতো আর করে নাই!' হারাধন খেপে যায়_ 'কিসির পাগল, সব ওর জাইর্যামি, আমার পাছে সারাসুমায় ওর লাইগে থাহাই লাগবি, আমার যে কত ক্ষতিই ও করিছে!'

হারাধন হয়ত বলেই যেত, তার ক্ষতির ফিরিস্তি দিয়েই যেত, কিন্তু রিক্সাটা যখন তার দোকানের দিকেই ঠেলে নিয়ে এসে রিক্সাওয়ালা বলে_ 'বেরেকের রবারডা লাগা দেনতো বাই, শালা এত জোরে বেরেক দিছি, রবার ছুটা ফালাইছি!' তখন কিন্তু হারাধনের মন সামান্য ভালো হয়। সে ব্রেকটা নেড়েচেড়ে দেখে বলে_ 'ইডা আর লাগান যাবিনোনে, নতুন আরাকটা লাগা দেই?' রিক্সাওয়ালা হারাধনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার ব্রেকের দিকে তাকায়। সে নিজেই ব্রেকটা নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, নতুন ব্রেক লাগাবে কিনা। আবার প্যাসেঞ্জারের দিকে তাকিয়ে বলে_ 'বাই, আপনে চলে যান, ব্যতা পাননাইতো বাই?'

মুন্না হাঁটা দেয়। হারাধন তাকে যতই গাল পাড়ুক, মুন্না বোঝে, সে অলক্ষুণে একথা হারাধন বিশ্বাস করুক বা নাই করুক, এখন মুন্নার কারণে রিক্সার ব্রেক সারার কিংবা স্টিলকেসসহ পুরা ব্রেকসু বদলাবার কাজ পেয়ে হারাধন নিশ্চয়ই খুশি। মুন্না একটু হাসে, তবে আরও অনেক হাসি পায় তার, এইযে হারাধন খুশি, তা কি সে কারও কাছে বলতে পারবে এখন? তা পারবে না, আসলে তার পারা উচিত হবে না, সবসময় তাকে মুন্নার উপর বিরক্ত হবার ভাণ করতে হবে। সবাই ভাণ করে, ছবিকে তার অনেক ভালো লাগে, কিন্তু ছবিও যখন বাছবিচার না করেই তার কথায় সায় দেয়_ তখন মুন্নার হাসি পায়, পাগল আসলে সে নয়, বরঞ্চ পাগল যদি কেউ থাকেতো সে ওই হারাধন, ছবি, বিটুমামা।

কোনো কোনো সময় তার খুব রাগ হয়, অভিমান হয়। সবাই তাকে করুণা করে দেখে তার অভিমান হয়। সে কি আর বোঝে না? বোঝে যদি তবে আর বুঝ দেয়া কেন শুধু তারবেলা? এইতো সেদিন বিথী একটা গ্লাস ভাঙল আর কিলিয়ে বিথীর পিঠ ভাঙল মা। গ্লাস ভাঙলে কি তাকেও অমন করে মারবে মা? খুব কৌতুহল হল তার, পানি খাবার নাম করে রান্নাঘরে গিয়ে গ্লাসটা তুলে নিয়ে ছেড়ে দেয় সে, অনেক সময় নিয়ে গ্লাসটা দ্রুত মেঝের দিকে নেমে যায় আর শেষে ভেঙে যাওয়া আলোর মতো করে কাচ আর কাচের মতো পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে_ কী যে ভালো লাগে দেখতে! রোজ যদি একটা গ্লাস ভাঙতে পারত সে? ভাঙাকাচের টুকরা আর কেবল মোছা ঘরে একগাদা পানি ফেলে তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে সে, মা, বিথী সবাই ছুটে আসে গ্লাসভাঙার শব্দে। সবাই আসার পর যতক্ষণ সবাই নিরব থাকে ততক্ষণ মুন্না একে একে সবার দিকে তাকায়। হঠাৎ মা খুব খেপে গিয়ে আবারও সেই বিথীর উপরই চড়াও হয়।

- ভাইক এক গিলাস পানি ডালে খাওয়ানো গেল না, না? কী? সারাদিন এত কিসির ব্যস্ত? অঁ্যা? কিসির ব্যস্ত?
আবার দুমদুম কিল পড়ে বিথীর নরম পিঠে।

গনগনে রোদের দুপুরে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কান্না পায় মুন্নার। আর কী যেন মনে আসতে চায়, কেবলই মনে হয় কিসের থেকে সে যেন পালিয়ে বেড়ায়। কী করেছে মুন্না? মুন্নার কেবলই মনে হতে থাকে, সে বড়রকমের কোনো অপরাধ করে এসেছে। মা পছন্দ করবে না_ এরকম কিছু, কিন্তু মাতো তাকে কখনও কিছু বলে না। সে গ্লাস ভাঙলেও মা বিথীকে মারে। তবে বোধহয় ছবি পছন্দ করবে না_ এরকম কিছু। কিন্তু ছবিতো কেবলই তার সবকথায় সায় দিয়ে যায়, ছবির অপছন্দের কিছু করলেও ছবি তাকে আবার কী বলবে? বরঞ্চ কোনো অন্যায় যদি সে করেও বসে, আর ছবি যদি তাতে কোনো কষ্ট পেয়েও থাকে, তবু তাকে কিছু বলবে না সে। কেবল সায় দেবে। হয়ত মনখারাপ করে কোথাও বসে থাকবে। তবে হারাধন পছন্দ করবে না_ এমন কিছু? ধুর! হারাধনের থোড়াই পরোয়া করে সে।

তাহলে কী? তাহলে কিসের থেকে সে পালিয়ে বেড়ায়? আসলে সেতো সবসময়ই দোষ করার তালেই আছে, সেতো কোনোকিছুর দিকে তাকালেই সেটা ভেঙেচুরে যায়, এ নিয়েতো আর কম কথা শুনতে হয় না মাকে, বিটুমামাকে, বিথীকে। বিথীর স্কুলে স্যাররা আর মেয়েরা সারাক্ষণ নাকি বিথীকে প্রশ্ন করে, মুন্না কী কী পাগলামি করে, সে কি ন্যাংটা হয়ে থাকে? সে কি কামড়ায়? বিথী একেকদিন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি আসে। সবাই বিথীকে এত কষ্ট দিতে পছন্দ করে কেন? মুন্না তাহলে একদিন তাদের সত্যি কামড়াবে, তাদের সামনে গিয়ে কাপড় খুলে ফেলবে। মুন্নারওতো দায়িত্ব আছে বিথীর প্রতি। মুন্নার ছোট বোন না?

আসলে এসব হয়ত নয়, হয়ত সে তবে কোনো অন্যায় করে আসেনাই, তবু কী যেন মনে হতে চায় মুন্নার, খুব মনদিয়ে সে ভাবে, তবে কিছুতেই মনে করতে পারে না।

হাসপাতাল পার হয়ে এসে ছোট ব্রিজটার উপর উঠে তার মনে হয়, কালতো জয়নগরের সাথে খেলা, আরে! এতক্ষণ ভুলে ছিল কী করে সে একথাটা? সাইফুলদের বাসায় যেতে হয় এক্ষুণি।

অনেক্ষণ ধাক্কানোর পর ঠাণ্ডা আর ভেজা সি্নগ্ধ ছবি এসে দরজা খুলে দেয়। খুব অাঁচানো রোদের ভেতর থেকে এসে ছবির ভেজা ভেজা গা, ভেজামাথায় ভেজাগামছা পেঁচানো ঠাণ্ডা ছবিকে দেখে তার খুব ভালো লাগে। সব ক্লান্তি আর তৃষ্ণা তার নিমেষে কোথায় চলে যায়।

- ভিতরে আসো মুন্নাভাই।

- না, এহন আসপো না। জরুরি কাজ আছে, সাইফুলেক্ ডাকো।

- ভাইয়াতো আসেনাই এখনও, আসো না, ভিতরে আসো।

মুন্না কিন্তু ভেতরে ঢোকে না। কাজ আছে বলে ঘুরে আবার আঁচানো রোদের মধ্যে চলে আসে সে। তার আবার তৃষ্ণা পেতে থাকে। পেছনে না তাকিয়েও মুন্না বুঝতে পারে ভেজা ভেজা ঠাণ্ডা ছবি তখনও গেটে দাঁড়ানো। ছবি তাকে দেখছে, তার দিকেই তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে মুন্নার তৃষ্ণা আবার চলে যায়। তার খুব ভালোলাগতে থাকে। ছবিকে তবে কি সে ভালোবাসে? বিথী সেদিন বলছিল, 'তুই ছবিক্ খুব পছন্দ করিস, না ভাইয়া?' তা মুন্না স্পষ্ট করে কোনোকিছু বলেনাই বিথীকে, কেবল হেসেছে। এই একটাজিনিস সে খুব ভালো জানে, কাউকে কিছু লুকাতে হবে, কাউকে কিছু ভোলাতে হবে, তো সুন্দর করে তার দিকে তাকিয়ে হাসা। তবে এই কাউকের দলে আছে কেবল মা, বিথী, বিটুমামা, আব্বা আর, আর ছবিও বোধহয়। ছবিকে দেখলে তার এত শান্তি হয় কেন?

হাসপাতালের সামনের ছোট ব্রিজটার উপর আবার এসে দাঁড়ায় মুন্না। কিসের খেলা কাল জয়নগরের সাথে? সেতো বছরপাঁচেক আগেকার কথা। জয়নগরের সাথে সেই খেলা নিয়েইতো মারামারি। ব্রিজ থেকে উঁকি দিয়ে নিচে তাকায় সে। ক্যানেলে পানি নাই এখন। তলাটা কেবল সামান্য ভেজা ভেজা, কোথাও কোথাও সামান্য গোড়ালি পর্যন্ত জমে থাকা জলে দুইএকটা চিংড়ির অতি উৎসাহী লাফ দেখা যায়। আর আছে ব্যাঙ। সবুজ শেওলার ভেতর থেকেই বাইরে সামান্য উঁকি দিয়ে রোদবাতাস নেয়।

- ও সাইফুল! সাইফুল রে! এই যে আমি! ও সাইফুল!

নিচে তাকিয়ে ডাকে মুন্না। পশ্চিমদিক থেকে আসা গরম বাতাসে ব্রিজের নিচে জমে থাকা সামান্য জলে একটু ঢেউয়ের মতো হয়। তাই দেখে মুন্নার মনে হয় সাইফুল বুঝি সাড়া দেবে, অপেক্ষা করে সে, অনেক্ষণ পর সাইফুল যখন আর সাড়াশব্দ করে না, তখন তার মনেহয় ছবি কেন তার সাথে মিথ্যা কথা বলে? বললেইতো পারে সাইফুল আর নাই, তোমাদের সাথে খেলতে গিয়েইতো আর এল না। মুন্নার কাছে ছবি যদি একটু অনুযোগ করে কাঁদত! তা কেন? মুন্নাতো পাগল! তাই
সান্ত্বনা করে বলা, 'ভাইয়াতো এখনও ফেরেনাই!' মুন্নার কষ্ট হয়, প্রবল অপরাধবোধে তার বুকগলা ভার হয়ে আসতে থাকে।
হাঁটতে হাঁটতেই খেয়াল করে মুন্না, পাম্পহাউজের রাস্তা ধরেছে সে। তবে পাম্পহাউজেই যাওয়া যাক। হুমহুম গুমগুম করে টনকে টন পানির অবিশ্রান্ত পতন দেখতে তার খারাপ লাগে না। এমন গর্জন করে পানি, মাইলখানেক দূর থেকে পর্যন্ত শোনা যায়, তখন একরকম, আবার কাছে চলে এলে একেবারে আলাদা। জলের শব্দ তখন আর সেই দূর থেকে শোনা বাজনার মতো লাগে না, বরঞ্চ কানের সবটুকু দখল করে নেয়, আর কোনোকিছু তখন শোনার অবকাশ থাকে না, উপায়ও থাকে না। দূর থেকে যেরকম জলের শব্দ কেবলই কাছেযাই কছেযাই করে ডাকে, কাছে এলেও সেরকমই, তবে এই কাছেযাইয়ের মানে তখন বড় ভয়ঙ্কর_ কাছে এলে মনে হয় ঝাঁপিয়ে পড়ি, সব শেষ করে দেই, কোনো কারণ ছাড়াই, মনখারাপ থাকুক আর মনে অনেক আনন্দ থাকুক, খুব কাছে এসে অনেক্ষণ পানির অন্তহীন পতনের দিকে তাকিয়ে থাকলে একসময় মনে হবেই, দেই ঝাঁপ। মরে যেতে ইচ্ছা করবে। বলে বোঝানো যাবে না, সে অন্যরকম, সে বড় কষ্টের। আর যখন ইরির মৌসুমে পাম্পহাউজ থেকে টনকে টন আটকে রাখা জল ছেড়ে দেয়া হয় ক্যানেলের মধ্যে, তখন মুক্তির এক প্রলয়ঙ্করী আনন্দে ধেয়ে যায় সেই পানি, ক্যানেলের ধার কেটে কেটে বড় করে দিতে দিতে হুমড়ে মুচড়ে চলে যায় সেই জল। মুন্না একদিন সেই জলের সাথে সাথে চলে যাবে অনেকদূর। মুন্নার তাই মনে হয়। কেন? কোথায় চলে যাবে মুন্না? তাকি আর মুন্না জানে?

পানির ছোঁয়া লেগে আসা বাতাস ভারি ঠাণ্ডা। বিথীকে আর ছবিকে একদিন নিয়ে আসতে হবে এখানে, ছবিতো বিথীর সাথেই পড়ে। আজ কী বার? শনি? বিথীদের আজ মর্নিংস্কুল, ছুটির সময় হয়ে গেল। তা ছবিতো আজ স্কুলে যায়নাই দেখলাম। নাকি স্কুল শেষ করে চলে এসেছে? দুপুর তবে গড়িয়ে গেছে অনেক আগে, এজন্যই হয়ত ক্ষুধা লাগে মুন্নার।

- তুই মুন্নাক্ খুঁজে আন। কনে যায়া কার আতে মার খাচ্চে তার ঠিক কী? ... কনে আর যাবি? দেখ্গা যায়া কার কাচে মার খায়া ওই সুইজগেটের অহনে বসে রইচে। দরকার অ'লি বাসায় আনে বাঁইদে থো, তাও আমার চোহের সামনেই থাকুক। মরে যদি তাও আমার চোহের সামনেই মরুক।

রওশনবু কাঁদতে থাকে। আমি বুবুকে কী বলে সান্ত্বনা দেই? আজ খুব ভোরে উঠেছিল সে, অন্ধকার থাকতে দুলাভাই নারায়ণগঞ্জ চলে যাবে বলে সবার আগে ওঠে সে। বাপের সাথে তখন থেকেই এটাওটা নিয়ে দুয়েকটা কথাও বলছিল।

- আলো ফুটপি ফুটপি, তহন আব্বা গোসল করবের গেলি ও যায়া রান্নাঘরে বসে বসে বায়না করিছিল, মা, ওমা, খিদে লাগিছে।

বিথী বলে এসব। তখন নাকি রওশনবু সেমাই বানানোর জন্য লাউ কাটছিল কুচিকুচি করে। দুলাভাই লাউসেমাই পছন্দ করে খুব, তাই নারায়ণগঞ্জ যাবার সময় সাথে দিয়ে দিবে বুবু। একেতো খুব তাড়া, তাছাড়া বুবুর অভ্যাসতো আছেই, একেবারে ঘচঘচ করে কাটা, মরিয়মকে ভাতের চুলায় আরেকটা খড়ি দিতে আর কুয়াতলায় জড়ো করে রাখা থালাবাসন কয়টা ধুয়ে আনতে বলতে বলতে ঘচঘচ করে কেটে যেতে থাকে, বটির দিকে কি লাউয়ের দিকে কিংবা হাতের দিকে তাকাতে হয় না রওশনবুর, একবারও না।

সেইযে মা মারা গেল, রওশনবু তখন কেবল ফাইভে পড়ে, আর আমি মাঝেমধ্যে রওশনবুর সাথে তাদের বিপিন বিহারী বালিকা বিদ্যালয়ে যাই, মাষ্টাররা যখন তখন খেপায়।

- এই ছেমড়া, সারাজীবন মেয়েস্কুলে পড়বি নাকি?

তা একদিন বুবুদের ক্লাসের গীতাদি জামগাছে উঠতে বলল, আমিও উঠলাম, আর ওদের নারায়ণ স্যার এসে এমন ধমক দিল, তাড়াহুড়ায় নামতে গিয়ে অর্ধেক এসেই হাতফসকে গেল, কোনো এক হতচ্ছাড়া ডালের কোণায় বেধে পড়ে গেলাম, হাফপ্যান্টটা রয়ে গেল গাছেই। রওশনবুদের স্কুলে তারপর আর কখনও যাওয়া হয়নাই, লজ্জায়, ব্যথায়। রওশনবু তখনও মাঝেমধ্যে আমায় কোলে নিত, মা মরে যাবার কারণেই বোধহয় অতবড় হয়েও বুবুর কোলে চড়তে লজ্জা পাইনাই কোনোদিন। সেইথেকেই রওশনবুর ট্রেনিং, ক্লাস এইটের পর আর পড়া হয়নাই বুবুর, কিন্তু সেইথেকেই ঘচঘচ করে, খুব কুচিকুচি করে লাউকাটার অভ্যাস রওশনবুর।

সংসার করায় ট্রেনিং পাওয়া রওশনবু, পোড়খাওয়া রওশনবু, যেকিনা মরিয়মের সাথে কথা বলে আর মুন্নার আব্বা ভোর ছয়টার ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ চলে যাবে বলে অবলীলায় অন্যান্য দিনের চেয়েও দ্রুত লাউ কাটতে থাকে, তা মুন্না অতো দ্রুত কাটা দেখেই হয়ত, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তার হাতের দিকে।

পটপট করে ওদিকে চুলার উপর ভাত ধরে যাবার শব্দ শুনে মরিয়মকে ডাক দিতে গিয়ে খুব রেগে গেল মা, বলল, যেদিনই কাজের চাপ সেদিনই সব নষ্ট হবার যোগাড়, মরিয়মকে ডেকে না পেয়ে নিজেই উঠে গেল ভাতের জ্বাল কমাতে, খড়ি তুলতে গিয়ে কাপড়ে আঙড়া লেগে খানিকটা পুড়েও গেল আঁচলের কাছে, ঘরে ঢুকতে গিয়ে দরজার কাছে মাথায় বাড়ি খেয়েই মা ঘুরে তাকিয়ে দেখে মরিয়ম আধঘণ্টা পর দুইটা মোটে থালা ধুয়ে এনে তার সাথেই ঘরে ঢুকছে, তার জন্যইতো বাড়ি লাগে মা'র মাথায়। আর মা রেগে গিয়ে মরিয়মের হাত থেকে সেই থালা কেড়ে নিয়ে আছাড় দিয়ে ফেলে উঠানে।

- কাম দেহাবের আসিস আমাক? এত সুমায় লাগে দুইথাল ধুতি, না? সর এহেনথে, সর! ওত্তোরে যা!

আবার লাউ কাটতে বসে মা। আমাকে চুলায় ভাতের পাতিলের কাছে বসতে বলে। ঘ্যানঘ্যান করতে থাকা মুন্না হঠাৎ অনেক্ষণ চুপ করে আছে দেখে কী মনে করে মা লাউ কাটতে কাটতেই তাকায় ভাইয়ার দিকে। অমনি মা দেখে দায়ের উপর দ্রুত চলতে থাকা তার হাতের দিকে তীক্ষ্নচোখে তাকিয়ে আছে মুন্না। ভীষণ চমকে যায় মা, আমারও আর বলা হয় না ভাত পুড়ে যাবার কথা, গনগন করে জ্বলতে থাকা চুলার উপর পুড়তে থাকা ভাতের চটচট শব্দ শুনতে শুনতেই দেখি মা'র বটির নিচে কেটে রাখা কুচিকুচি লাউয়ের স্তুপ ক্রমে লাল হয়ে উঠছে। আর মা তীব্র অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মুন্নার দিকে_ তার চোখে আতঙ্ক।

বিথীর কাছে শোনা বিস্তারিত বর্ণনা এসব। তা মুন্নার সেই তাকিয়ে থাকা দেখেই রওশনবুর হাত পর্যন্ত ফসকে গেল। মিহিন করে একেবারে কুচিকুচি করে কাটা লাউয়ের স্তুপ লাল হয়ে ভিজে উঠল, এমনকি চাকরি থাক বা যাক তবু দুলাভাইর সেদিনই নারায়ণগঞ্জ যাওয়া পর্যন্ত বরবাদ হয়ে গেল।

- মামা! ভাইয়ার চোহে সত্যিই খুনেচাউনি, না? মা পর্যন্ত লক্ষ্মীছাড়া কয়ে গাল পা'ল্লো ভাইয়াক্। আর ও সেইযে উইটে চলে গেল। মা কুনুদিনও এত গাল পারেনাই ওক্।

আমার বড় কষ্ট হয় সবকথা শুনে। এতদিনে তবে বাড়ির লোকজনও বিশ্বাস করতে শুরু করে দিল। হাত কাটল বলে বুবুও বিশ্বাস করা শুরু করে দিল। হাততো এমনিও কাটতে পারত। এতকিছুর মধ্যেও আমার মনে আসে সবকিছুর শুরু করেছিল সেই হারাধন। হারাধনই অভিযোগটা প্রথম তুলেছিল। তার দোকানের সামনে রাস্তার ওপার থেকে নাকি তাকিয়ে ছিল মুন্না। তা প্রথমে তেমন একটা আমল দেয়নাই হারাধন, কিন্তু এতদিনের অভিজ্ঞ হারাধন খুব ভালো করে জানে টায়ারখোলা টিউবে কতখানি হাওয়া দিতে হয়, নতুন টিউবখানা টায়ারে ভরে দেবার আগে সে একটু হাওয়া ভরে টেস্ট করে দেখছিল, আর ঠিক ওইদিকেই নাকি সুঁইয়ের মতো করে তাকিয়েছিল মুন্না। হারাধন যখনই হাওয়াভরা বন্ধ করতে যাবে তখনই বিকট শব্দ করে নতুন টিউবখানা ফেটে গেল। তা টিউব যে কারণেই ফাটুক, হারাধন হয়ত খেয়ালই করত না, যদি না মুন্না রাস্তার ওপার থেকে প্রচণ্ড উল্লাসে হেসে ফেলে হাততালি দিয়ে বলে উঠত, 'আমি আগেই জানি, ও ফাটপি'। এই বলেই মুন্না নাকি হারধানকে হতভম্ব করে দিয়ে দৌড়ে সেখান থেকে চলে যায়।

মুন্নাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, 'আমার কেন জানি মনে অলো উডা ফাটপি। তাই কলাম'। আর সেইদিন থেকে সমস্ত হাতিগারা তো হাতিগারা, বড়পায়না থেকে শুরু করে ভিটেপাড়ার লোক পর্যন্ত জেনে গেল মুন্নার অলক্ষুণে চাউনির কথা।
রওশনবু কাঁদতেই থাকে। এপাশের ঘর থেকে শুনি, দুলাভাই একবার ধমক দেয় বুবুকে।

- তুমার জন্যিইতো! জানোই যে ওসব ফালতুকথা। তারপরও কী মনে কইরে ধমক দিল্যা?

খানিকপর কী বুঝে দুলাভাই আবার বোঝাতে বসে বুবুকে। দুলাভাই'র হয়ত বুবুর জন্য খারাপ লাগে। দুলাভাই হয়ত জানে যে বুবু মন থেকে কথাটা বলেনি।

- ও রুনু, তুমিই যদি এরম করে কাঁদতি থাকো, তালি তুমার মিয়েডাক কিডা সান্ত্বনা দেয়? আমারইবা কিরম লাগে, কও?
দুলাভাই বুবুকে রুনু ডাকে, এই প্রথম শুনলাম। আশ্চর্য, এতদিন বুবুর এতকাছে থেকেও আজই প্রথম শুনলাম দুলাভাই বুবুকে রুনু বলে ডাকে? শুনে আমার কেন যেন লজ্জা লাগতে থাকে। লজ্জা এখন দুলাভাই বুবুকে রুনু ডাকে আর আমি শুনে ফেলি বলে নয়, লজ্জা পাই অন্যকথা মনে করে। আমি তখনতো আর খুব ছোট নই, যখন বিয়ে হয় বুবুর, বিয়ের পর তবু কতদিন ঘ্যানঘ্যান করেছি বুবুর কাছে শোয়ার জন্য। ছোটফুপু একবার খুব ধমক দেয়, 'ধাড়ি ছেমড়া, বুবুর কাছে শোবো! যা! বাংলাঘরে গিয়ে শো, যা!'

এত কান্না পেয়েছিল আমার! তবে তার চেয়ে বেশি কান্না যে রওশনবুর পেয়েছিল তা সকালবেলা বুঝতে পারি, ভোর ভোর উঠে এসে বাংলাঘরে আমার পাশে বসে বুবু ডাকল।

- বিটু, ও বিটু, ওঠতো বাই!

- না, যাও।

দুইটিমাত্র কথা বলতে আমার গলা ভার হয়ে আসে। বুবু অনেক্ষণ কিছু বলে না দেখে ফিরে তাকিয়ে দেখি, আঁচলে চোখ চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁদে বুবু। আমি উঠে বুবুকে জড়িয়ে ধরি। বুবু বলে, 'তোর খুব কষ্ট, নারে?'

- না বুবু। আমার ইট্টুও কষ্ট নাই।

তারপরে বুবুর সাথে এবাড়ি চলে আসি। ফুপু রাখতে চেয়েছিল, থাকিনাই। বাবা নিতে এসেছিল, নতুন মা'র কাছে যেতে দিতে রাজি হয়নাই বুবু। এই নিয়ে তাকে কমকথা শুনতে হয়নাই শ্বশুরবাড়িতে, কিন্তু অনড় থেকেছে রওশনবু। সেই রওশনবু এখন কাঁদে। তাহলে আমাকেতো কিছু একটা করতেই হয়। বুবুর এতকিছুর প্রতিদান কি আর এইজনমে দেয়ার সাধ্য আছে আমার? জামাটা গায়ে দিয়ে বের হতে গেলে বিথী এসে নিচু গলায় বলে, 'ভাত খায়া যাও'।

- সুমায় নাই।

- মা কিন্তু আমাক গাল পারবিনি।

- কইস, খায়াই গেছি।

রাস্তায় পা দিয়েই প্রথমে মনে হয় কোথায় যাব? বেচারা মুন্না। একেতো তারই জন্য মা'র হাত কেটে গেছে, তার উপর রওশনবু দিয়েছে ধমক। নাজানি কোথায় অভিমান করে বসে আছে। আদর করে ডেকে না আনলে কি আর আসতে পারবে?
সিরাজগঞ্জের দিকে শেষবাসটা শেষবিকালে ছেড়ে যাবার পর সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ডে আর একটা লোককেও দেখা যায় না। বাসস্ট্যান্ডে বাজারের সমস্ত কোলাহল থেমে গেলে যখন ঝমঝম করা চায়ের দোকানটা পর্যন্ত খালি হয়ে যাওয়ায় দোকানদার উঠে বন্ধ করতে যায় তখন আস্তে আস্তে ওঠে মুন্না। সারাদিন পাম্পহাউজ আর সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ডে বসে থাকার পরও কেউ তার খোঁজ নিতে আসে না দেখে একটা অভিমান তার বুক থেকে গলা পর্যন্ত পাকিয়ে ওঠে। না আব্বা, না বিটুমামা, না বিথী, না ছবি, কেউ না। তবে মুন্না হারিয়ে গেলে তাদের কিছু যায় আসে না? মুন্না কি ছবিকে ভালোবাসে?

- তুই ছবিক্ খুব পছন্দ করিস, না ভাইয়া?

বিথী বলেছিল একদিন। আর ছবি?

- ছবি কলাম তোক্ খুব পছন্দ করে।

এও বিথীর কাছেই শোনা। আর এখনও সে যে সাইফুলকে খোঁজার ছুতা করে মাঝেমধ্যে ছবিদের বাসায় যায়, সেতো ছবির জন্যই। ছবি তা বোঝে কই? বলে, ভাইয়া এখনও ফেরেনাই। তাকি আর মুন্না জানে না? সাইফুলকে ওরা যে ওর সামনেই ছুরি মেরে মেরে একসময় মেরেই ফেলল। কী রক্ত? এত রক্ততো আর কোনোদিন দেখেনাই মুন্না।

মুন্নার জন্যইতো! জয়নগরের সাথে খেলায় দুইগোল দিল সাইফুল একাই, হেরে গিয়ে গেদু আর চম্পক ঝগড়া করতে এল। এই মারেতো সেই মারে করে ঝগড়া করতে এল, তা গায়ে না মেখে চলে এলেইতো হত। এইতো, এই ব্রিজের উপরইতো। সাইকেলে করে ফিরছিল সে আর সাইফুল। আশ্চর্য! সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ড থেকে মুন্না কখন ব্রিজের উপর চলে এসেছে? তবে কি মুন্না বাড়ি ফিরে যাচ্ছে? কিন্তু কেউতো তাকে নিতে আসেনাই, সে নির্লজ্জের মতো একাই ফিরবে? কিন্তু মুন্নাতো ভাবছে সাইফুলের কথা। এইতো এই ব্রিজের উপর সেদিন গেদু আর চম্পকের সাথে তাদের ঝগড়ার কথা। মুন্না খুব রেগে রেগে জবাব দিচ্ছিল ওদের কথার আর সাইফুল বারবার মুন্নার জামার হাতা ধরে টানছিল, 'চল চলে যাই'।

- চলে যাই মানে? লজ্জা করে না তোর?

মুন্নার অাঁচানো কথাটা শুনে সাইফুল একবার তাকায় মুন্নার দিকে, তারপর 'উরি শালারে!' বলে সোজা গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গেদু আর চম্পকের উপর। মুন্না বাধা দেবার আগেই। মুন্না এতটা চায়নাই, কিন্তু আবার কিছুই না বলে চুপচাপ সরে পড়তেও চায়নাই। তা ওদের কাছে যে কোমরেগোঁজা ক্ষুর ছিল তা কি আর জানত ওরা? না মুন্না, না সাইফুল, কারোরই কি আর জানা ছিল? সাইফুলের পেট ফালাফালা করে দিল ওরা, তারপর ব্রিজ থেকে সাইফুলকে নিচে ফেলে দৌড়, সেদিনওতো এমনই সন্ধ্যা। সেদিনও কেউ ছিল না রাস্তায়। টাকিমাছের খোবলানোর মতো করে সাইফুল এই ক্যানেলের কোমরজলে খোবলায়, আর যখন তার মুখ ভেসে ওঠে পানির উপর, তখনই কেবল এক বিকট চিৎকার শোনা যায়, আর বাকিসময় কেবল জলের খলবল শব্দ। সাইফুল কি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে জলের ভেতর? হঠাৎ সচকিত হয় মুন্না, বহুবছর পর তার ঘোর ভাঙে আর সে সাইকেলটা ব্রিজের উপর দড়াম করে ফেলে দৌড়ে নেমে যায় ক্যানেলের পানিতে। কাদা আর রক্তে মাখামাখি সাইফুলকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে আসে ব্রিজের উপর। ক্যানেলের কোমরপানিতে আর কত জল, তারচেয়ে সাইফুলের রক্ত বেশি। স্ট্যান্ডের উপর সাইকেলটা কোনোমতে দাঁড়া করিয়ে কেরিয়ারে সাইফুলের পেট রেখে দুইপাশে শরীরের বাকি অংশ ঝুলিয়ে দেয়, অনেকটা নিস্তেজ হয়ে গেলেও তখনও বেঁচে ছিল সে। সাইকেলে উপর কি আর থাকতে চায়, পিছলে পড়ে যায়। কিভাবে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল তা এখন আর বোঝানো সম্ভব নয়, শুধু সাইফুল এরইমধ্যে একবার বলেছিল, 'মুন্নারে! মা আর ছবিক্ দেহিস'।

ব্রিজের নিচে প্রায় শুকনা ক্যানেলের তলায় জমে থাকা সামান্য গোড়ালিজল সন্ধ্যার বাতাসে থিরথির করে কাঁপে। ব্রিজের রেলিং থেকে ঝুঁকে পড়ে সেই জলের কাঁপন দেখতে থাকে মুন্না। খুনে দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। সেই দৃষ্টিতে সে ক্যানেলের জলকে দায়ী করে সাইফুলের মৃতু্যর জন্য। আর ভাবে, তার চাউনি এমন কেন? মা'র হাত পর্যন্ত কেটে দিয়ে এল আজ। সে এমন কেন? তার চোখ এমন কেন?

কিন্তু তার দোষ কী? মা একটা করে লাউয়ের বড় টুকরা নিচ্ছিল আর সেই টুকরাটা মা'র হাতের নিচে বটির উপর কেমন দ্রুত ছোট হয়ে আসছিল, আর একসময় শেষ হয়ে যাচ্ছিল পুরা লাউয়ের টুকরাটা, ঠিক যাদুমন্ত্রের মতো। সে খুব মজার একটা দৃশ্য, কেউ কখনও বুঝবে না। সে ঠিক জানে, সে যদি কাউকে বলে, খুব খেয়াল করে তাকিয়ে দেখ, ধর মা নাই, বটিও নাই, নিচে গামলা নাই, শুধু একটা লাউয়ের টুকরা, আস্তে আস্তে কেমন ছোট হয়ে যাচ্ছে, সেতো মা'র হাতের দিকে নয়, বটির দিকেও নয়, সবকিছু বাদ দিয়ে স্রেফ লাউয়ের টুকরাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে চাইছিল, মা আর বটিকে বাদ দিয়ে শুধু লাউয়ের টুকরা দেখা এত সহজ নয়, একারণেই তাকে খুব তীক্ষ্ন করে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছিল। আর তখনিতো মার হাত কেটে গেল। কেন হল? তার চোখের জন্য? তার খুব ইচ্ছা করছিল মা'র হাতটা ধরে কেঁদে ফেলে। অথচ মা! মা খুব নিষ্ঠুর! মা কেন তবে লক্ষ্মীছাড়া বলল? আমার চোখ তবে কানা হয়ে যাক। ভস্ম হয়ে যাক।

মুন্নার চোখ দিয়ে জল গড়ায়। মুন্না জানে তার মা কখনও এরকম নয়। তার চোখ কানা হয়ে গেলে মার কত কষ্ট হবে? কিন্তু তবু মা কেন তাকে লক্ষ্মীছাড়া বলল? তার কী দোষ?

চারপাশে তাকায় মুন্না। দেখে রাস্তায় একটা লোক দূরে থাক, একটা কুকুরও নাই। সবলোকতো বাসায় চলে গেছে, তাতো যাবেই। এইযে মুন্না সকালেও খায়নাই, দুপুরেওতো খায়নাই, বাসার সবাই নিশ্চয়ই ঠিকই খেয়েদেয়ে বসে আছে, রান্না কি আর আজ হয়নাই বাসায়, ঠিকই হয়েছে, সবকিছুই ঠিকমতো চলছে, শুধু মুন্নাই নাই বাসায়। এইযে সন্ধ্যা হয়ে গেল, কই তাকেতো কেউ আর খুঁজতে আসলো না। সেতো আর এমন কোথাও যায়নাই যে কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। মুন্নার ক্ষুধা লাগলেই কী আর না লাগলেই কী? এইতো পরশুদিনইতো, নাকি অন্য কোনোদিন, যাইহোক, বিথীর স্কুল থেকে আসতে দেরি দেখে মা'র কী চিন্তা? সবার খাওয়া হলে মা খেতে বসতে গিয়েও বলল, থাক বিথী আসুক, তারপরে খাবনে। আর আজ আমার বেলা? সবাই ঠিকই খেয়েদেয়ে বসে আছে, হয়ত ঘুমিয়েও গেছে, আব্বা বোধহয় এতক্ষণে নারায়ণগঞ্জে পেঁৗছেও গেছে। আর বিটুমামাও বের হয়ে গেছে, ফিরবে সেই রাত নয়টা-দশটায়। মুন্না বিছানায় নাই দেখেও হয়ত একটুও অবাক হবে না, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই চুপচাপ খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। ছবি কী করছে? আর সাইফুল? সাইফুল থাকলে হয়ত দুইজনে মিলে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়া যেত নিরুদ্দেশে, মুন্না শুধু পেছনে বসে থাকত। সাইফুল এত জোরে চালায়! চাকার নিচে পিচের রাস্তা শুধু কেমন শোঁ শোঁ শব্দ করতে থাকে। আর কিছু শোনা যায় না।

- পারবি? ওহানথেন লাফ দিবের পারবি?

মুন্নার একটা জেদ চেপে যায়। তার চ্যালেঞ্জে সাইফুল যদি চম্পকদের উপর কোনো দ্বিধা না করে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, তবে এই সামান্য ব্রিজের উপর থেকে লাফ দেয়া এমন আর কী? সাইফুল খুব বীর, খুব বাহাদুর, মুন্না কি আর কম? সেও পারে। কিন্তু তবু মা'র জন্য তার মন কেমন করতে থাকে।

রেলিংয়ের উপর চড়ে বসে মুন্না। দুইপাশে তাকিয়ে দেখে কেউ তাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যেতে আসল কিনা, তারপর সাইফুলের ডাকে সাড়া দিয়ে আলগোছে শরীরটা ছেড়ে দেয়। নিচে পড়তে পড়তে সে পাম্পহাউজের দিক থেকে একটা গুমগুম আওয়াজ শুনতে পায়। আজতো শনিবার। আজইতো ক্যানেলে পানি ছেড়ে দেবার কথা। ব্রিজের নিচে প্রায় শুকনা মাটিতে পড়ার ঠিক আগে মুন্না দেখতে পায় পাম্পহাউজের দিক থেকে টনকে টন পানি গমগম হমহম করতে করতে ধেয়ে আসছে। ঝমঝম করতে করতে আসছে। মুন্নার মনে হয়, ইস্! আর একটুপরে লাফ দিলে ঐ শীতল জলে পড়ে অনেকদূরে ভেসে যেতে পারত সে। এখনও সে ভেসেই যাবে। তবে তখন যেত মুন্না নিজে, সাঁতরে সাঁতরে, ভাসতে ভাসতে, সবকিছু দুইচোখ ভরে দেখতে দেখতে আর এখন যাবে মুন্নার নির্জীব শরীর। দুইচোখ দিয়ে এখন আর সে কিছুই দেখবে না।

No comments: