শুধু শুধু কেন অপু দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে? দেয়ালের যে জায়গাটার দিকে সে তাকিয়ে থাকে সেখানে যে কিছু নাই সেটা বুঝে উঠতেও তাই তার এক-দুইঘণ্টা সময় লেগে যায়। আসলে ঘড়ি ধরেতো আর তাকিয়ে নাই অপু যে ঠিক ঠিক বলতে পারবে কতক্ষণ ধরে সে তাকিয়ে আছে, তাই, দেয়ালে কী নাই তা বোঝার জন্যই হয়ত, অপু এক অথবা দুইঘণ্টা সময় ব্যয় করে। আর তখন তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, আসলে কী নাই তা বোঝার জন্য কিংবা দেয়ালে কিছু একটা দেখার জন্য সে তাকিয়ে নাই। তাহলে, এতক্ষণ সাদা আর খালি দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় সে কী কী ভেবেছে সেটাই যখন তার কাছে নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তখনই সে খেয়াল করতে পারে শাঁখারিবাজার থেকে মিত্রার সাথে কেনা রাধাকৃষ্ণের ছবিটা দেয়াল থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, কালও ছিল ছবিটা, মিত্রাই টাঙাতে টাঙাতে অপুকে বলছিল, চিত্রাপু এরকম ছবি এখানে রাখতে দেবে না, কারণ চিত্রাপু এইঘরে প্রায়ই নামাজ পড়ে।
ছবির জায়গা থেকে চোখ সরিয়ে বামদিকে তাকালে অপু দেখতে পায় চিত্রাপু নাই, কখন হয়ত চলে গেছে। চিত্রাপু যেখানে বসেছিল তার পেছনে একটা শেলফভর্তি সেবা'র বই। অপুর কাছে এ এক রহস্য। মিত্রাদের এই ছোট্ট ড্রয়িংরুমে কোনোকিছুর সাথেই কোনোকিছু মেলে না_ মাসুদ রানা, বেহেশতী জেওর আর রাধাকৃষ্ণের ছবি। তবে ওদের ড্রয়িংরুমটা খুব ছোট্ট, পুরানো কুঠুরি টাইপের বাড়ি, খুব গোছানো, খুব ঠাণ্ডা, খুব ছিমছাম, ছোটবেলায় বড়আপা আর মেজোআপার সাথে রান্নাবাটি খেলার সময় উঠানে অপুরা যে খেলাঘর বানাতো, ঠিক সেইরকম ঘর।
রামনগরে অপুদের বাড়ির পেছনে পুকুরের পালানে হাজার হাজার তেলাকোচা ফলত বলেই হয়ত বাজার থেকে লাউ কিনে এনে রান্নাঘরে থরেথরে সাজিয়ে রাখার পর্বটি সেসব খেলায় অনিবার্য ছিল। পুকুরের সবুজ চারপাশ ঘিরে আরও ছিল চিংড়িলতা, ঘোড়াফুল, হাতিশুঁড়, শিয়ালমোথা, বিড়ালহাঁচি, জিলিপি, আমরুল, শুশনিশাক, বতুয়া, ঢোলকলমি, মোরগফুল, ধুনচি, আগড়া_ দুনিয়ার যতসব জংলাগাছের ফুল, পাতা আর কাঁটাফল_ এর সবই ছিল বাজারিপণ্য; রীতিমতো কাঁঠালপাতার টাকা দিয়ে নগদদামে কিনে আনতে হত সেসব। দূর থেকে কাঁটাকাঁটা আগড়ার ফল কারও মাথায় ছুঁড়ে মারলে সাথেসাথে চুলে আটকে যেত। মাথার ক্লিপ বা খোঁপার ফুল বানানো হত সেই আগড়ার ফল দিয়ে। বড়আপা খুব ঘরসাজাতে পারত তখন থেকেই_ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কেবলই ঘর গোছাত। ছোটফুপির তখনও বিয়ে হয়নাই, আবার বড়আপাদের সাথে খেলার বয়সও তার ছিল না, ফুপি বলত, এ মেয়ে বড় হলে খুব সংসারি হবে। বড়আপা খুব খেপে যেত, ফুপির সাথে ঝগড়া করত আর তাই নিয়ে ফুপি গালফুলিয়ে নালিশ করত আব্বার কাছে। ফুপি হয়ত অপুদের ঈর্ষা করত, ওদের সাথে হয়ত খেলতে চাইত। আম্মা অবশ্য ফুপির যখন-তখন ভাইয়ের কাছে নালিশ করা পছন্দ করত না। আর সেও ছিল এক নালিশ, আম্মার সেসব নালিশও ছিল আব্বার কাছেই।
আম্মা অপুদের খেলাও পছন্দ করত না, সমস্ত উঠান খুঁদে, বাঁশখুঁটি পুঁতে যতসব ঘর আর কারেন্টের খাম্বা বানানো আর দুনিয়ার জঙ্গল তুলে আনা কে হররোজ পছন্দ করতে যাবে, একেকসময় খুব রেগে যেত আম্মা, তার শক্তিশালী শরীরের সামান্য পলকা হঁ্যাচকা টানেই ধূলায় লুটিয়ে পড়ত সেসব খেলাঘর, সাজানো সংসার। তখন কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলত বড়আপা, মেজোআপা আর মাঝেমাঝে অপুও। এও ছিল নালিশ, তাও সেই আব্বার কাছে। আব্বার কাঁচাপাকা লোমেভরা মস্ত বুক সমস্ত নালিশ নিয়ে নিতে পারত। কতদিন ঐ বুকে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছে অপু, মেজোআপা, বড়আপা। আম্মাও হয়ত। ছোটফুপি কি আর বাদ গেছে? কখনও দেখিনাই অবশ্য। আম্মাকেও দেখিনাই কখনও।
মিত্রাদের বাইরের টানা বারান্দার রেলিঙে একটা দাঁড়কাক এসে বসে। দাঁড়কাক নাকি খুব কালো হয়। মিশমিশে। এই কাকটা সেইরকম ষণ্ডামার্কা। কী সব আবোলতাবোল যে ভাবে অপু। এসব ভাবার কি সময় এখন? চিত্রাপু কতকিছু বলতে এসেছিল, অপুকে বলে হয়ত হালকা হতে চেয়েছিল, বলতে পারল নাতো, ঝরঝর করে কাঁদল, কতক্ষণ ধরে কাঁদল। অপুর উচিত ছিল_ কী উচিত ছিল? এসব বিষয় খুব ভালো করে জানে না অপু, এইসব সময় কী করতে হয়, কী বলতে হয়, সে তাই সোজা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করতে করতে এক-দুইঘণ্টা পার করে দেয়। অপুর কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না কেন? অপু কি পাথর? গাছপাথর? গাছ কি কখনও পাথর হয়। অপুর নানী বলত, হয়। হাজার হাজার বছর পড়ে থেকে থেকে নাকি গাছ একসময় পাথর হয়ে যায়। নানীর যতসব আজগুবি কথা।
অপুর মাথায় একটা কম্পিউটার বসানো থাকলে বেশ হত_ নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট পরিবেশে নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রোগ্রাম চালু করা যেত। অপু হয়ত চিত্রাপুকে খুব গুছিয়ে দুইএকটা সান্ত্বনার কথা বলতে পারত। আর অপু কিনা খুঁজে মরছে মিত্রার সাথে শাঁখারিবাজার থেকে কেনা রাধাকৃষ্ণের ছবিটা কোথায় গেল।
এরকম কেন হয়? একলা ড্রয়িংরুমে বসে অপুও একবার কান্নার কথা ভাবে। কিন্তু একলা অপুর চোখ ভিজে ওঠে না, শুষ্ক চোখ জ্বালা করতে থাকে না, বুক খাঁ খাঁ করতে থাকে না, গলার ভেতর কেমন একটা দুমড়ানো ব্যথা দলা পাকাতে থাকে না। অপু এসবের জন্য হয়ত অপেক্ষা করে, কিংবা অন্যকিছুর, অপু ঠিক জানে না। আব্বার কথা মনে হয়, খুব ক্ষীণভাবে একবার মনে হয়, আব্বা বেঁচে থাকলে সে হয়ত আব্বার কাছে নালিশ করতে পারত, হয়ত নালিশ করতে করতে কাঁদতে পারত।
অনেক্ষণ ধরে সকাল আটটা বেজে আছে। শুয়ে শুয়ে বিরক্ত হয়ে মিত্রা ঘড়ির দিকে তাকায়_ কই ঘড়িতো বন্ধ নয়। এইতো সেকেন্ডের কাঁটা একঘর থেকে আরেকঘরে যাচ্ছে, তবে অনন্তকাল পরে পরে। সময় কাটানোর জন্য অলসভাবে ঘুরতে থাকা ফ্যানটার দিকে প্রায় দশমিনিট তাকিয়ে থাকার পর মিত্রা আবার ঘড়ির দিকে তাকালে দেখতে পায় সেকেন্ডের কাঁটা সন্তর্পণে আরেকটা ঘর পার হয়ে যায়। ছাদে পা দিয়ে উল্টো হয়ে থাকা একটা মাকড়শা ঝুলে ঝুলে ছাদময় হেঁটে বেড়ায়। মিত্রার মনে হয় এই ফ্যানের ঘোরা, এই মাকড়শার উল্টো হয়ে ঝুলে ঝুলে হেঁটে যাওয়া, এই দশমিনিট পরপর একসেকেন্ড করে পার হওয়া, আর মিত্রাকে ঠকিয়ে, মিত্রাকে ধোকা দিয়ে ক্রমাগত আটটা বেজে থাকা আরও কবে কোথায় যেন হয়েছিল, ঠিক এইরকম হয়েছিল। ঠিক এরকম করে বিপ্লবদের বাসায় কাঠমিস্ত্রিরা সারাদিন ধরে ঠক ঠক করে হাতুড়ি পিটিয়ে যাচ্ছিল। হাতুড়ির শব্দ কি এখনও হচ্ছে বিপ্লবদের বাসায়? নাকি অন্য যেদিনের কথা মিত্রা এখন ভাবছে সেদিনের কোনো কাঠমিস্ত্রির ক্রমাগত পেটানো হাতুড়ির শব্দ মিত্রার মাথার ভেতর থেকে বাজে। তাহলে সেদিনও এমনি করে মাথার ভেতরে হাতুড়ি বাজছিল, বিপ্লবদের বাসায় নয়। আর সেদিনও মিত্রা ঠিক এইসব কথাই ভাবছিল। এসব শব্দ আর তার পরিপাশর্্ব হয়ত মিত্রার জন্মের সময় থেকেই তার স্মৃতির ভেতর লেখা হয়ে ছিল, না খোলা পৃষ্ঠার মতো, এখন এই প্রতিদিন, প্রতিঘণ্টায়, প্রতিমুহূর্তে একটু একটু করে বড় হতে হতে সেইসব না খোলা, না দেখা, না পড়া পৃষ্ঠাগুলোই মিত্রা উল্টে কেবল মিলিয়ে দেখে। তা না হলে এত মিল কিভাবে হয়? এই জীবনটা বোধহয় মিত্রা আরও একবার কোনো এককালে যাপন করেছিল, অপু ছিল, চিত্রাপু ছিল, মা ছিল, বিপ্লবরা ঠিক পাশের বাসায়ই ছিল। সেবারও এমনি করে বিপ্লব সত্য কি মিথ্যা অস্ত্র মামলায় জেলে গিয়েছিল আর বিপ্লবের মা পা ছড়িয়ে বসে সারাদিন ধরে ইনিয়ে বিনিয়ে কেঁদেছিল। আর এবার শুধু যেন মিত্রাকে বলে দেয়া হয়নাই, এরপর কী ঘটবে, কিন্তু ঘটামাত্র সে সবকিছু টের পেয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে আরও কোনো একবার, কোনো একদিন ঠিক এইরকম ঘটেছিল। গোপনে মিত্রা যদি শেষের পৃষ্ঠাগুলো পড়ে নিতে পারত একবার? তবে মিত্রার মনে হয় এসব ঘটেছিল খুব কাছাকাছি সময়ে, এখনও তরতাজা সেসব স্মৃতি। মিত্রা হয়ত সেদিন বাড়ি থেকে একদৌড়ে চৌধুরীর ঘাটের উঁচু পাড় থেকে লাফিয়ে পড়েছিল ইছামতির ঠাণ্ডা জলে। লাল ইটে গাঁথা ঐ উঁচু পাড় থেকে ইছামতির ঠাণ্ডা বুকে পড়ার আগ পর্যন্ত ঐ পতনের সময়টুকু হয়ত এরকমই দীর্ঘ ছিল। হতে পারে সেই পতনের সময় দশমিনিট পর পর একসেকেন্ড করে পার হয়েছিল। সেদিনও, সেই পতনের সময় ঠিক এমনি করে তলপেটের আরেকটু নিচের দিকটায় এমন শিরশির করে উঠছিল। খুব উঁচু কোনো ব্রিজে দ্রুতগতিতে উঠে যাওয়া শেষ হয়ে গেলে হঠাৎ নামতে থাকা গাড়ির ভেতরে বসে থাকলে তলপেটে যেরকম শিরশির করে, সেরকম।
মিত্রার মনে হয় আরও কোনো একদিন, অন্য কোনোদিন, আরও একবার এই একইভাবে দুনিয়ার আলস্য নিয়ে ঘুরে মরছিল সবুজ ফ্যানটা আর ছাদে পা দিয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে ঝুলে হাঁটছিল একটা মাকড়শা আর মিত্রাকে ধোঁকা দিয়ে এরকমই সারারাত বা সারাদিন ধরে অথবা সারাক্ষণ আটটা বেজে ছিল নচ্ছাড় ঘড়িটাতে। অন্য কোনোদিন তবে সত্যি এরকম হয়েছিল? তবে সেদিন হয়ত ছোট ফুপির রেগে গিয়ে একঢিলে গুদামের চালে তুলে দেয়া সবুজের মধ্যে অপরূপ সাদা ছোট্ট হাতিশুঁড় ফুলের গোছা পেড়ে আনতে বৃষ্টির মধ্যেই পেঁপে গাছ বেয়ে চালে উঠতে গিয়েছিল মিত্রা। মিত্রা এখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটার অন্তহীন আকাশ থেকে নেমে আসা দেখতে পায়। মিত্রার মনে হয় সেও আকাশ থেকে এরকম করে নেমে আসে। আর সেই হাতিশুঁড় ফুলের গোছা পাড়তে গুদামের চালে প্রায় উঠে গেছে মিত্রা, একপা তুলেও দিয়েছে চালের উপর, ঠিক তখনই পা ফসকে যাওয়া চাই। কয় সেকেন্ড লেগেছিল নিচে পড়তে? তখনও এমনি একঘণ্টা পরপর হয়ত সেকেন্ডের কাঁটা একটা করে ঘর পার হচ্ছিল আর নিচে জড়ো করে রাখা পুরানো ঢেউটিনের স্তুপের উপর পড়তে পড়তে তলপেটের নিচের দিকে কোথাও শিরশির করছিল। মিত্রা এখন বিছানায় শুয়েই খুব সাবধানে তার তলপেটে হাত দেয়। কী রক্ত! নানাজান এসেছিল সেদিন, নানাজান কোথা থেকে দৌড়ে এসে মেজোআপাকে কোলে নিয়ে সোজা কুয়াতলা, অপুকে কেউ দেখতে দেয়নাই, কুয়াতলায় মেজোআপাকে শোয়ানোমাত্র মা, ছোপফুপি, বড়আপা আর নাসরিণদের বাড়ির ফুপি-কাকীদের দিয়ে ভরে গেল, সব ঘিরে গেল, অপু কি আর অত ভিড় ঠেলে তার মেজোআপাকে একবার দেখতে পারে?
যোনীর সামান্য উপরে তলপেটের একেবারে শেষসীমায় একটা গভীর চেড়া দাগ, মিত্রার একার গোপন কাটা দাগ, একলা দাগ। অপুও জানে না, এখনও জানে না, হয়ত জানবে কোনো একদিন, খুব অবাক হবে সেদিন অপু, হয়ত দাগটার উপর মমতা নিয়ে হাত রাখবে সে। মিত্রা মনেমনে সেখানে হাত দেয়_ কোথায় দাগ? মিত্রা অবাক হয়ে যায়। এটাতো অপুর কাছে শোনা অপুর মেজোআপার গল্প। মেজোআপা এখন থাকে সেই আমেরিকা। মিত্রারতো কোনো দাগ নাই। তবে মিত্রার শরীরে এত রক্ত কেন, মিত্রার তলপেটে, যোনীতে এত ব্যথা কেন? পাশ ফিরতে গিয়ে প্রচণ্ড ব্যথায় ছাদ, ফ্যান বা মাকড়শা আর বেহায়ার মতো তখনও আটটা বেজে থাকা ঘড়ি আর মিত্রার সমস্ত জগত তার অস্তিত্বশুদ্ধ নড়েচড়ে ওঠে, দুলে ওঠে, অন্ধকার হয়ে আসতে চায়। কিন্তু মিত্রার বড় আলোর দরকার এখন। সবকিছু এখন মিত্রার মনে করতে হবে।
কতজন ছিল ওরা? ছয় পর্যন্ত গুণতে পেরেছিল মিত্রা, তারপর কেমন একটা অভ্যাসের মতো, তীব্র ব্যথা_ সেও অভ্যাসের মতো, তীব্র বমির বেগ, তলপেট থেকে বা আরও নিচে পা থেকে পর্যন্ত সবকিছু বের হয়ে আসতে চায় অথচ বমি হয় না_ সেও অভ্যাসের মতো। আর একসময় সবকিছু শেষ হয়। মিত্রা জ্ঞান হারায় না, কেবল আচ্ছন্নের মতো চিৎ হয়ে পড়ে থাকে কলাভবনের কোনো একটা রুমে বা হয়ত বারান্দায় কিংবা টয়লেটে। কয়েকটা মশা এসে ভনভন করে আবার অন্ধকারের দিকে উড়ে যায়, দলবল নিয়ে ফিরে আসে। মশা তাড়ানোর কোনো ইচ্ছাও মিত্রার অবশিষ্ট থাকে না। কলাভবনে আলো জ্বলে না, অপু, রাতে? বাতি নাই? কেউ একটা বাতি জ্বেলে দেবে?
বাইরেও কি অন্ধকার হয়ে গেছে? হোক, অন্ধকারই হোক তবে, মিত্রাকে ফেলে রেখে ওরা দিনের আলোতে বের হয়ে যায় যাক, মিত্রা কি আর দিনের আলোতে বের হতে পারে? এত ছেঁড়া জামা, আর গায়ে এত রক্ত মেখে কী করে বের হয় মিত্রা? এত রক্ত! সব রক্ত কি তার একার শরীরেই ছিল?
আরও কোথায় যেন মিত্রা দেখেছে একবার এমনই ভেসে যাওয়া রক্ত। কোথায়? কোরবানীর ঈদে বিপ্লবদের নিচতলার ফাঁকা জায়গাটাতে বিপ্লবদের দুইটা, মিত্রাদের একটা আর শাহানাদের একটা করে গরু জবাই হয়। একবার দেখেছিল মিত্রা, মনে আছে, কোরবানী হুজুরের সারা গা ভেসে যাচ্ছিল রক্ত দিয়ে, সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা লুঙ্গির কিছু অংশ তখনও সাদা ছিল বলে, নাকি লম্বা তলোয়ার হাতে ঋজূভঙ্গিতে গ্রীবা উঁচু করে হাসতে হাসতে এজিদের মতো দুলে দুলে ঈদের নতুন শাড়িপড়া কিশোরী মিত্রার দিকে হুজুর এগিয়ে আসছিল বলে, কে জানে কেন, মিত্রা ভীষণ জোরে চেঁচিয়ে উঠে চিত্রাপু'র ধমক খেয়েছিল, আর বিপ্লবরা, বিপ্লবদের মায়েরা, ফুপুরা আর শাহানাদের নানীরা সবাই হাসাহাসি করেছিল মিত্রাকে নিয়ে আর হুজুরও যোগ দিয়েছিল সেই হাসিতে আর মিত্রা দৌড়ে ঘরে চলে গেলেও সেখান থেকেই শুনতে পেয়েছিল চিত্রাপু হুজুরকে একটু সেমাই খেয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করছে আর হুজুর বলছে, 'নাবালিকা মাইয়া তড়াশ হইছে, থাক আম্মা, আছর নামাজবাদ আসব, এখনও কতগুলা জবাই বাকী রয়া গেছেগা।'
হুজুরকে এত বীভৎস দেখাচ্ছিল! হুজুর সেই সাদা ছোপ ছোপ রক্তলাল পাঞ্জাবী পরে, সারা গা বেয়ে বেয়ে পড়া তাজা রক্ত নিয়ে দিনের আলোয় সমস্ত উত্তর মৈশুন্দি কি ভজহরি সাহা স্ট্রিট কি তামাম টিপু সুলতান রোড ঘুরে বেড়াতে পারে, তাতে হুজুরের গৌরবও বাড়ে, কিন্তু এখন এতরক্ত গায়ে, ফালিফালি হয়ে যাওয়া জামা গায়ে দিয়ে কী করে বাইরে যায় মিত্রা? তবে অন্ধকারই হোক।
একসময় কীভাবে কোথা থেকে কী অসীম শক্তি পেয়ে শরীর টেনে টেনে বাইরে আসতে পারে মিত্রা আর একটুপর দেখতে পায় ইকনোমিক্সের শিহাবভাই হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছে, মিত্রাই ডেকেছিল নাকি শিহাবভাই নিজেই মিত্রাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসেছিল তা এখন আর মনে নাই, শুধু মনে আছে তার হাত ধরে সিঁড়িতে যত্ন করে বসিয়ে দিতে দিতে শিহাবভাই বলেছিল, একটু বসো মিত্রা, আমি এক্ষুণি আসছি, এই যাব আর আসব।
আর তাকে সেই বসিয়ে রেখে শিহাবভাই অনন্তকাল পরে ফিরেছিল একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে। বেবিট্যাক্সির প্রচণ্ড শব্দ নির্জন কলাভবনকে যেন নুইয়ে দিচ্ছিল। সেই প্রচণ্ড শব্দের মধ্যে মিত্রা বড় নিঃশব্দে রাতের অন্ধকারে কলাভবন ছেড়ে চলে আসে শিহাবভাইয়ের সাথে। আসতে আসতে ঘুমে কি নির্ঘুমে, কি এক আচ্ছন্নতার মধ্যেই বেবিট্যাক্সির বাইরে তার পরিচিত শহর আর রাস্তা আর দোকানপাট আর তাদের আলো আরেকবার দেখে মিত্রা। বেবিট্যাক্সির খোলা দরজা দিয়ে সাঁইসাঁই করে বাতাস ঢোকে।
বাইরে থেকে আসা জোরবাতাসে মাথার কাছের জানালার পর্দাটা উড়ে মিত্রার মুখের উপর চলে এসে বেশ কিছুক্ষণ ফুলে থাকে। ফুলেথাকা নৌকার পালের মতো পর্দাটা কিছুক্ষণ শূন্যে স্থির থেকে আবার চুপসে নেমে যাবার ঠিক আগে ছাইরঙের উপর নীলনীল বুটি আঁকা একটা প্রজাপতি জানালা দিয়ে উড়ে এসে পর্দার নিচ দিয়ে মিত্রার ঘরে ঢুকে পড়ে, যেন তার আসার জন্যই পর্দাটা উঁচু হয়েছিল। মিত্রার চোখ, অথবা মিত্রা নিজেই প্রজাপতিটার সাথে সাথে উড়ে যায়। প্রজাপতিটা প্রথমে ছাদের কাছাকাছি উচ্চতায় যায় তারপর সারা ছাদ ঘুরে জায়গা পছন্দ করতে থাকে আর একসময় মিত্রার পা বরাবর একটা ঘুলঘুলির পাশে গিয়ে ছাদে পা দিয়ে মেঝের দিকে পিঠ দিয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে বসে। কি আশ্চর্য! মিত্রা আগে থেকেই জানত প্রজাপতি ঠিক ওই জায়গায় বসবে। কিজানি কেন, কিন্তু মিত্রার মনে হয় প্রজাপতিটা হয়ত ঠিক ওই ভেন্টিলেটরের পাশে গিয়ে বসবে। আসলে পুরা ছাদ মিত্রার চেনা। সেই কবে থেকে সে শুয়ে শুয়ে ছাদ দেখছে, কতবছর ধরে একটা মাকড়শার ছাদের গায়ে পা দিয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে ঝুলে হাঁটা দেখছে, রাতের দিকে একটা মোটা টিকটিকি আসে হেলেদুলে। সেও ছাদে পা দিয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে ঝুলে ছাদময় হেঁটে বেড়ায়। আর যে প্রজাপতিটি এখন এসে বসল, সেও উল্টো হয়ে বসল। বসার পর কিন্তু প্রজাপতি পাখা আর মেলে রাখে না, পিঠের উপর দুইহাত এককরে প্রণামের ভঙ্গিতে জড়ো করে রাখে। মাঝেমাঝে একবার দুইডানা দুইদিকে মেলে দিয়ে আবার আগের মতো গুটিয়ে ফেলে। হয়ত বসার পর রঙিন পাখা আর কাউকে দেখাতে চায় না প্রজাপতি। হয়ত কেবল ওড়ার সময়ই দেখাতে চায় তার সব রঙ, বিত্ত, বৈভব।
টিকটিকি-মাকড়শা-প্রজাপতি সবকিছু উল্টো হয়ে ঝুলে আছে, নাকি ওরাই ঠিক আছে আর মিত্রাই ছাদের গায়ে ঝুলে ঝুলে ওদের দেখছে? তা কি আর হয় কখনও? কিন্তু মিত্রার কেন যেন মনে হয় সে যদি তার চুলের দিকে কিংবা তার বিছানার চাদরের দিকে, ওড়না, জামার ঝুল কিংবা আর সবকিছুর দিকে তাকায় তাহলে সে হয়ত দেখতে পাবে সেগুলো সব ছাদের দিকে ঝুলে আছে। হয়ত যেখানে টিকটিকি-মাকড়শা-প্রজাপতি ঘুরে বেড়ায়, হাঁটে, জীবনযাপন করে সেটাই হয়ত মেঝে আর মিত্রা যেখানে শুয়ে আছে, যে খাটের উপর শুয়ে আছে সেটাই হয়ত ছাদ, আর মিত্রা বছর বছর ধরে ছাদে ঝুলে আছে উল্টো হয়ে। মিত্রার তাকাতে ভয় করে। আর একসময় মিত্রা তার সকল ভয় জয় করে একে একে তাকায় তার চুলের দিকে, বিছানার চাদরের দিকে, তার ওড়নার দিকে, জামার ঝুলের দিকে, আর অসহায়ের মতো মিত্রা দেখতে পায় তার আশঙ্কাই সত্যি। মিত্রা হতভম্ব হয়ে যায়। আচ্ছা, এমনতো হতে পারে যে মিত্রা তাহলে উড়তে পারে, ঠিক যেমন করে প্রজাপতি উড়ে আসে বাইরে থেকে, মিত্রাও হয়ত তেমনি উড়ে যেতে পারে বাইরে, মেঘের পাশ দিয়ে, ইছামতি নদীর উপর দিয়ে। কতদিন মিত্রা ইছামতি নদী দেখে না। তবে তাই হোক, উড়ে যাক মিত্রা।
আলগোছে হাতপা ছেড়ে দেয় মিত্রা, কিন্তু মিত্রার হাতপাতো ছাড়াই ছিল, তাহলে মিত্রা কেবল মনেমনে ভাবে সে উড়ে গেল। মিত্রা সত্যি দেখতে পায় সে উড়ে যাচ্ছে। বিছানা থেকে তার শরীর আলাদা হয়ে গেছে। কি আশ্চর্য ভরশূন্য তার শরীর! এখন মিত্রা ইচ্ছা করলেই উড়ে যেতে পারে। চোখ বন্ধ করে মিত্রা শরীর ছেড়ে দেয়। আর মিত্রা অনন্তের দিকে পড়তে থাকে। মিত্রার তলপেটে শিরশির করতে থাকে। মিত্রা কি তাকাবে? কিন্তু তাকালে যদি সে পতনের শেষ দেখতে না পায়? যদি তাকালে দেখে নিচে কেবলই শূন্য? মিত্রা শূন্যের মধ্যেই হাতপা কুঁকড়ে কুণ্ডলি পাকিয়ে ফেলে।
খুব আস্তে আস্তে সময় নিয়ে চোখ খোলে মিত্রা। ঝরোবাতাসে মিত্রার চুল পেছনদিকে উড়তে থাকে আর সে অবিশ্রান্ত পড়তে থাকে কোনো এক অনন্তের দিকে। মিত্রা চারপাশে তাকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু প্রবল বাতাসে কিছুই দেখতে পায় না। মিত্রা দুইহাতে চোখ আড়াল করে। মিত্রা কি গুদামের চাল থেকে নিচে রাখা টিনের স্তুপের দিকে পড়ছে? মিত্রার হাতে তাহলে হাতিশুঁড়ের অপরূপ সবুজ আর সাদা ফুলের গোছা কই? মিত্রা তবে ঝাঁপ দিয়েছে ইছামতির কোমল ঠাণ্ডা জলে। অপু যদি থাকত এখন! তাহলে দুইজনে একসাথে পড়তে পারত ইছামতির বুকে। কী আশ্চর্য! ওইতো অপু। আসলেই আশ্চর্য। মিত্রা যা ভাবছে, তাই হয়ে যাচ্ছে। নাকি আগে থেকেই সব ঠিক করা ছিল, মিত্রা কেবল সময়মতো সবকিছু ভাবতে পারছে। এই তার উল্টো হয়ে শুয়ে থাকা, তার হাতপা ছেড়ে দেয়া, তার ইছামতির কোমল জলে ঝাঁপিয়ে পড়া আর এই পতনের শেষ না হওয়া_ সবকিছু। সব আগে থেকে ঠিক করা ছিল। সবাই জানে, কেবল মিত্রা জানে না।
অপুর কোমরে বাঁধা লালগামছা মিত্রার প্রায় নাগালের ভেতর বাতাসে ওড়ে। একবার সামান্যতম সময়ের জন্য মিত্রা অপুর আঙুলের নাগাল পায়, পায় কি? শেষমুহূর্তে উড়তে থাকা গামছার কোণা খামচে ধরে ফেলে মিত্রা। চোখবুজে মিত্রা শক্ত করে ধরে রাখে অপুর গামছা।
ইছামতির বুকে পড়তে আর কতক্ষণ লাগবে? কতদিন লাগবে? খুব ধীরে ধীরে চোখ খুললে মিত্রা দেখে সে বিছানার চাদর মুচড়ে ধরে আছে। মিত্রার বুক ভেঙে যায়। সে কেন শুকনা বালির দাগ হয়ে রাস্তায় পড়ে নাই? সে কেন ইছামতির পাড়ে অপুর কোমরের গামছা ধরে নাই? অথবা কেন সে ইছামতিতেই কেন তবে ডুবে গেল না? তা ডুবে যদি নাই গেল তবে, এইযে, তাকালেই যে, সোজা ছাদের দিকে তার পড়ে যাবার কথা ছিল, তবে তাই গেল না কেন? ভয়ে ভয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখে মিত্রা বিছানার চাদর ছাদের দিকে ঝুলে নাই, তার চুল, ওড়না, জামার ঝুল সব নেতিয়ে পড়ে আছে বিছানায়। তারই মতো। মিত্রা কেঁদে ফেলে।
- এই! এই! ধরে ফেললতো! আই, আই টিকটিকি! আই বজ্জাত!
পালা! পালা শিগগির! ও প্রজাপতি, পালা তুই ভাই! ও মিত্রা! দৌড় দাও, খুব জোরে দৌড় দাও, এইতো আরেকটু, আরে দূর! স্যান্ডেল খুলে ফেল না! পা ঝটকা দিয়ে ছুঁড়ে দাও!
মিত্রা পা ঝটকায়, স্যান্ডেলের শক্ত বেল্ট তার পা বেঁধে রাখে।
ও মিত্রা! এইতো সামনেই বামদিকে ভেন্টিলেটর, ওখান দিয়ে উড়ে যাও মিত্রা! আর একটু, ওইতো গেট, গেট পেরুলেই রাস্তা, রাস্তায় নিশ্চয়ই অনেক লোক থাকবে। ও মিত্রা, তোমার চোখে কী পড়েছে? দেখতে পাও না কিছু? কিচ্ছু দেখতে হবে না, শুধু দৌড় দাও, দৌড়_ দৌড়__ দৌ_ _ ড়! পালাও! ও প্রজাপতি পালা, প্রজাপতি আমার, মিত্রা আমার, পালা তুই!
ঝটফট করে ডানা ঝাপটায় মিত্রা, দ্রুত পা ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করে প্রজাপতি, ভেন্টিলেটরের বদলে দেয়ালে গিয়ে বাড়ি খায়, মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে, হাত-পা-ডানা অবশ হয়ে আসে, আর একটামাত্র লাফ দিয়ে মিত্রার ডানা মুখে পোরে টিকটিকি। কলাভবন এত অন্ধকার কেন অপু?
উত্তর মৈশুন্দির গলি থেকে বের হয়ে ডানে ঘুরে রুন্টি হোটেল ছেড়ে খানিকটা এগিয়ে এলে বামে ধোলাইখাল যাবার রাস্তা, সেই রাস্তা ছাড়িয়ে আরও খানিকটা সামনে এসে ডানে বনগ্রাম রোড রেখে সোজা অনেকখানি গেলে তবে রথখোলা মোড়_ তবে এতকিছু, এই মিত্রাদের বাসা থেকে বের হওয়া, গেট খুলে বাইরে এসে উত্তর মৈশুন্দির গলি থেকে বের হয়ে সোজা এতখানি রাস্তা, এক মুহূর্তে কোথায় হারিয়ে গেল সব? এইতো অপু বসা ছিল মিত্রাদের ছোট্ট ড্রয়িংরুমে, আর এখন রথখোলার মোড়, তবে এতখানি রাস্তা আর এতখানি সময়, এতলোক সব বুঝি অপুর আঙুলের ফাঁক গলে শুকনা বালুর মতো পড়ে যায়। রান্নাবাটি খেলায় এই শুকনা বালু হত চাল। পুকুর ঘুরে নাসরিণদের বাড়ির পেছন থেকে দুইহাতের তালু এক করে সবচেয়ে বেশি যতখানি শুকনা বালু নেয়া যায় সেভাবে করে নিয়ে এসে ছোট্ট অপু দেখত হাতে কিছুই নাই। এতখানি পথ আসতে আসতে আঙুলের ফাঁক গলে সব বালু পড়ে গেছে। বড়আপা কষে চড় মারে অপুর নরম গালে। ঝাপসা চোখে পেছনে ফেলে আসা, পার হয়ে চলে আসা রাস্তার দিকে তাকালে অপু দেখতে পায় উত্তর মৈশুন্দি থেকে বের হবার পর থেকে ধোলাইখাল যাবার রাস্তার তেমাথা আর বনগ্রাম যাবার রাস্তার তেমাথা যথাক্রমে পার হয়ে এই রথখোলার মোড় পর্যন্ত কালো রাস্তায় সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে লম্বা দাগের মতো পড়ে আছে ওর সফেদ শৈশব। সব এইভাবে কেন পড়ে যায় আঙুলের ফাঁক গলে, কিছুই কি ধরে রাখতে পারে না অপু? অপুর শৈশব, মিত্রা, সব। বড়আপা খুব কষে একটা চড় মারে না কেন অপুর গালে? অপু তবে প্রাণভরে একটু কাঁদতে পারত।
Monday, September 1, 2008
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment