শুধু শুধু কেন অপু দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে? দেয়ালের যে জায়গাটার দিকে সে তাকিয়ে থাকে সেখানে যে কিছু নাই সেটা বুঝে উঠতেও তাই তার এক-দুইঘণ্টা সময় লেগে যায়। আসলে ঘড়ি ধরেতো আর তাকিয়ে নাই অপু যে ঠিক ঠিক বলতে পারবে কতক্ষণ ধরে সে তাকিয়ে আছে, তাই, দেয়ালে কী নাই তা বোঝার জন্যই হয়ত, অপু এক অথবা দুইঘণ্টা সময় ব্যয় করে। আর তখন তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, আসলে কী নাই তা বোঝার জন্য কিংবা দেয়ালে কিছু একটা দেখার জন্য সে তাকিয়ে নাই। তাহলে, এতক্ষণ সাদা আর খালি দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় সে কী কী ভেবেছে সেটাই যখন তার কাছে নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তখনই সে খেয়াল করতে পারে শাঁখারিবাজার থেকে মিত্রার সাথে কেনা রাধাকৃষ্ণের ছবিটা দেয়াল থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, কালও ছিল ছবিটা, মিত্রাই টাঙাতে টাঙাতে অপুকে বলছিল, চিত্রাপু এরকম ছবি এখানে রাখতে দেবে না, কারণ চিত্রাপু এইঘরে প্রায়ই নামাজ পড়ে।
ছবির জায়গা থেকে চোখ সরিয়ে বামদিকে তাকালে অপু দেখতে পায় চিত্রাপু নাই, কখন হয়ত চলে গেছে। চিত্রাপু যেখানে বসেছিল তার পেছনে একটা শেলফভর্তি সেবা'র বই। অপুর কাছে এ এক রহস্য। মিত্রাদের এই ছোট্ট ড্রয়িংরুমে কোনোকিছুর সাথেই কোনোকিছু মেলে না_ মাসুদ রানা, বেহেশতী জেওর আর রাধাকৃষ্ণের ছবি। তবে ওদের ড্রয়িংরুমটা খুব ছোট্ট, পুরানো কুঠুরি টাইপের বাড়ি, খুব গোছানো, খুব ঠাণ্ডা, খুব ছিমছাম, ছোটবেলায় বড়আপা আর মেজোআপার সাথে রান্নাবাটি খেলার সময় উঠানে অপুরা যে খেলাঘর বানাতো, ঠিক সেইরকম ঘর।
রামনগরে অপুদের বাড়ির পেছনে পুকুরের পালানে হাজার হাজার তেলাকোচা ফলত বলেই হয়ত বাজার থেকে লাউ কিনে এনে রান্নাঘরে থরেথরে সাজিয়ে রাখার পর্বটি সেসব খেলায় অনিবার্য ছিল। পুকুরের সবুজ চারপাশ ঘিরে আরও ছিল চিংড়িলতা, ঘোড়াফুল, হাতিশুঁড়, শিয়ালমোথা, বিড়ালহাঁচি, জিলিপি, আমরুল, শুশনিশাক, বতুয়া, ঢোলকলমি, মোরগফুল, ধুনচি, আগড়া_ দুনিয়ার যতসব জংলাগাছের ফুল, পাতা আর কাঁটাফল_ এর সবই ছিল বাজারিপণ্য; রীতিমতো কাঁঠালপাতার টাকা দিয়ে নগদদামে কিনে আনতে হত সেসব। দূর থেকে কাঁটাকাঁটা আগড়ার ফল কারও মাথায় ছুঁড়ে মারলে সাথেসাথে চুলে আটকে যেত। মাথার ক্লিপ বা খোঁপার ফুল বানানো হত সেই আগড়ার ফল দিয়ে। বড়আপা খুব ঘরসাজাতে পারত তখন থেকেই_ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কেবলই ঘর গোছাত। ছোটফুপির তখনও বিয়ে হয়নাই, আবার বড়আপাদের সাথে খেলার বয়সও তার ছিল না, ফুপি বলত, এ মেয়ে বড় হলে খুব সংসারি হবে। বড়আপা খুব খেপে যেত, ফুপির সাথে ঝগড়া করত আর তাই নিয়ে ফুপি গালফুলিয়ে নালিশ করত আব্বার কাছে। ফুপি হয়ত অপুদের ঈর্ষা করত, ওদের সাথে হয়ত খেলতে চাইত। আম্মা অবশ্য ফুপির যখন-তখন ভাইয়ের কাছে নালিশ করা পছন্দ করত না। আর সেও ছিল এক নালিশ, আম্মার সেসব নালিশও ছিল আব্বার কাছেই।
আম্মা অপুদের খেলাও পছন্দ করত না, সমস্ত উঠান খুঁদে, বাঁশখুঁটি পুঁতে যতসব ঘর আর কারেন্টের খাম্বা বানানো আর দুনিয়ার জঙ্গল তুলে আনা কে হররোজ পছন্দ করতে যাবে, একেকসময় খুব রেগে যেত আম্মা, তার শক্তিশালী শরীরের সামান্য পলকা হঁ্যাচকা টানেই ধূলায় লুটিয়ে পড়ত সেসব খেলাঘর, সাজানো সংসার। তখন কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলত বড়আপা, মেজোআপা আর মাঝেমাঝে অপুও। এও ছিল নালিশ, তাও সেই আব্বার কাছে। আব্বার কাঁচাপাকা লোমেভরা মস্ত বুক সমস্ত নালিশ নিয়ে নিতে পারত। কতদিন ঐ বুকে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছে অপু, মেজোআপা, বড়আপা। আম্মাও হয়ত। ছোটফুপি কি আর বাদ গেছে? কখনও দেখিনাই অবশ্য। আম্মাকেও দেখিনাই কখনও।
মিত্রাদের বাইরের টানা বারান্দার রেলিঙে একটা দাঁড়কাক এসে বসে। দাঁড়কাক নাকি খুব কালো হয়। মিশমিশে। এই কাকটা সেইরকম ষণ্ডামার্কা। কী সব আবোলতাবোল যে ভাবে অপু। এসব ভাবার কি সময় এখন? চিত্রাপু কতকিছু বলতে এসেছিল, অপুকে বলে হয়ত হালকা হতে চেয়েছিল, বলতে পারল নাতো, ঝরঝর করে কাঁদল, কতক্ষণ ধরে কাঁদল। অপুর উচিত ছিল_ কী উচিত ছিল? এসব বিষয় খুব ভালো করে জানে না অপু, এইসব সময় কী করতে হয়, কী বলতে হয়, সে তাই সোজা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করতে করতে এক-দুইঘণ্টা পার করে দেয়। অপুর কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না কেন? অপু কি পাথর? গাছপাথর? গাছ কি কখনও পাথর হয়। অপুর নানী বলত, হয়। হাজার হাজার বছর পড়ে থেকে থেকে নাকি গাছ একসময় পাথর হয়ে যায়। নানীর যতসব আজগুবি কথা।
অপুর মাথায় একটা কম্পিউটার বসানো থাকলে বেশ হত_ নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট পরিবেশে নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রোগ্রাম চালু করা যেত। অপু হয়ত চিত্রাপুকে খুব গুছিয়ে দুইএকটা সান্ত্বনার কথা বলতে পারত। আর অপু কিনা খুঁজে মরছে মিত্রার সাথে শাঁখারিবাজার থেকে কেনা রাধাকৃষ্ণের ছবিটা কোথায় গেল।
এরকম কেন হয়? একলা ড্রয়িংরুমে বসে অপুও একবার কান্নার কথা ভাবে। কিন্তু একলা অপুর চোখ ভিজে ওঠে না, শুষ্ক চোখ জ্বালা করতে থাকে না, বুক খাঁ খাঁ করতে থাকে না, গলার ভেতর কেমন একটা দুমড়ানো ব্যথা দলা পাকাতে থাকে না। অপু এসবের জন্য হয়ত অপেক্ষা করে, কিংবা অন্যকিছুর, অপু ঠিক জানে না। আব্বার কথা মনে হয়, খুব ক্ষীণভাবে একবার মনে হয়, আব্বা বেঁচে থাকলে সে হয়ত আব্বার কাছে নালিশ করতে পারত, হয়ত নালিশ করতে করতে কাঁদতে পারত।
অনেক্ষণ ধরে সকাল আটটা বেজে আছে। শুয়ে শুয়ে বিরক্ত হয়ে মিত্রা ঘড়ির দিকে তাকায়_ কই ঘড়িতো বন্ধ নয়। এইতো সেকেন্ডের কাঁটা একঘর থেকে আরেকঘরে যাচ্ছে, তবে অনন্তকাল পরে পরে। সময় কাটানোর জন্য অলসভাবে ঘুরতে থাকা ফ্যানটার দিকে প্রায় দশমিনিট তাকিয়ে থাকার পর মিত্রা আবার ঘড়ির দিকে তাকালে দেখতে পায় সেকেন্ডের কাঁটা সন্তর্পণে আরেকটা ঘর পার হয়ে যায়। ছাদে পা দিয়ে উল্টো হয়ে থাকা একটা মাকড়শা ঝুলে ঝুলে ছাদময় হেঁটে বেড়ায়। মিত্রার মনে হয় এই ফ্যানের ঘোরা, এই মাকড়শার উল্টো হয়ে ঝুলে ঝুলে হেঁটে যাওয়া, এই দশমিনিট পরপর একসেকেন্ড করে পার হওয়া, আর মিত্রাকে ঠকিয়ে, মিত্রাকে ধোকা দিয়ে ক্রমাগত আটটা বেজে থাকা আরও কবে কোথায় যেন হয়েছিল, ঠিক এইরকম হয়েছিল। ঠিক এরকম করে বিপ্লবদের বাসায় কাঠমিস্ত্রিরা সারাদিন ধরে ঠক ঠক করে হাতুড়ি পিটিয়ে যাচ্ছিল। হাতুড়ির শব্দ কি এখনও হচ্ছে বিপ্লবদের বাসায়? নাকি অন্য যেদিনের কথা মিত্রা এখন ভাবছে সেদিনের কোনো কাঠমিস্ত্রির ক্রমাগত পেটানো হাতুড়ির শব্দ মিত্রার মাথার ভেতর থেকে বাজে। তাহলে সেদিনও এমনি করে মাথার ভেতরে হাতুড়ি বাজছিল, বিপ্লবদের বাসায় নয়। আর সেদিনও মিত্রা ঠিক এইসব কথাই ভাবছিল। এসব শব্দ আর তার পরিপাশর্্ব হয়ত মিত্রার জন্মের সময় থেকেই তার স্মৃতির ভেতর লেখা হয়ে ছিল, না খোলা পৃষ্ঠার মতো, এখন এই প্রতিদিন, প্রতিঘণ্টায়, প্রতিমুহূর্তে একটু একটু করে বড় হতে হতে সেইসব না খোলা, না দেখা, না পড়া পৃষ্ঠাগুলোই মিত্রা উল্টে কেবল মিলিয়ে দেখে। তা না হলে এত মিল কিভাবে হয়? এই জীবনটা বোধহয় মিত্রা আরও একবার কোনো এককালে যাপন করেছিল, অপু ছিল, চিত্রাপু ছিল, মা ছিল, বিপ্লবরা ঠিক পাশের বাসায়ই ছিল। সেবারও এমনি করে বিপ্লব সত্য কি মিথ্যা অস্ত্র মামলায় জেলে গিয়েছিল আর বিপ্লবের মা পা ছড়িয়ে বসে সারাদিন ধরে ইনিয়ে বিনিয়ে কেঁদেছিল। আর এবার শুধু যেন মিত্রাকে বলে দেয়া হয়নাই, এরপর কী ঘটবে, কিন্তু ঘটামাত্র সে সবকিছু টের পেয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে আরও কোনো একবার, কোনো একদিন ঠিক এইরকম ঘটেছিল। গোপনে মিত্রা যদি শেষের পৃষ্ঠাগুলো পড়ে নিতে পারত একবার? তবে মিত্রার মনে হয় এসব ঘটেছিল খুব কাছাকাছি সময়ে, এখনও তরতাজা সেসব স্মৃতি। মিত্রা হয়ত সেদিন বাড়ি থেকে একদৌড়ে চৌধুরীর ঘাটের উঁচু পাড় থেকে লাফিয়ে পড়েছিল ইছামতির ঠাণ্ডা জলে। লাল ইটে গাঁথা ঐ উঁচু পাড় থেকে ইছামতির ঠাণ্ডা বুকে পড়ার আগ পর্যন্ত ঐ পতনের সময়টুকু হয়ত এরকমই দীর্ঘ ছিল। হতে পারে সেই পতনের সময় দশমিনিট পর পর একসেকেন্ড করে পার হয়েছিল। সেদিনও, সেই পতনের সময় ঠিক এমনি করে তলপেটের আরেকটু নিচের দিকটায় এমন শিরশির করে উঠছিল। খুব উঁচু কোনো ব্রিজে দ্রুতগতিতে উঠে যাওয়া শেষ হয়ে গেলে হঠাৎ নামতে থাকা গাড়ির ভেতরে বসে থাকলে তলপেটে যেরকম শিরশির করে, সেরকম।
মিত্রার মনে হয় আরও কোনো একদিন, অন্য কোনোদিন, আরও একবার এই একইভাবে দুনিয়ার আলস্য নিয়ে ঘুরে মরছিল সবুজ ফ্যানটা আর ছাদে পা দিয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে ঝুলে হাঁটছিল একটা মাকড়শা আর মিত্রাকে ধোঁকা দিয়ে এরকমই সারারাত বা সারাদিন ধরে অথবা সারাক্ষণ আটটা বেজে ছিল নচ্ছাড় ঘড়িটাতে। অন্য কোনোদিন তবে সত্যি এরকম হয়েছিল? তবে সেদিন হয়ত ছোট ফুপির রেগে গিয়ে একঢিলে গুদামের চালে তুলে দেয়া সবুজের মধ্যে অপরূপ সাদা ছোট্ট হাতিশুঁড় ফুলের গোছা পেড়ে আনতে বৃষ্টির মধ্যেই পেঁপে গাছ বেয়ে চালে উঠতে গিয়েছিল মিত্রা। মিত্রা এখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটার অন্তহীন আকাশ থেকে নেমে আসা দেখতে পায়। মিত্রার মনে হয় সেও আকাশ থেকে এরকম করে নেমে আসে। আর সেই হাতিশুঁড় ফুলের গোছা পাড়তে গুদামের চালে প্রায় উঠে গেছে মিত্রা, একপা তুলেও দিয়েছে চালের উপর, ঠিক তখনই পা ফসকে যাওয়া চাই। কয় সেকেন্ড লেগেছিল নিচে পড়তে? তখনও এমনি একঘণ্টা পরপর হয়ত সেকেন্ডের কাঁটা একটা করে ঘর পার হচ্ছিল আর নিচে জড়ো করে রাখা পুরানো ঢেউটিনের স্তুপের উপর পড়তে পড়তে তলপেটের নিচের দিকে কোথাও শিরশির করছিল। মিত্রা এখন বিছানায় শুয়েই খুব সাবধানে তার তলপেটে হাত দেয়। কী রক্ত! নানাজান এসেছিল সেদিন, নানাজান কোথা থেকে দৌড়ে এসে মেজোআপাকে কোলে নিয়ে সোজা কুয়াতলা, অপুকে কেউ দেখতে দেয়নাই, কুয়াতলায় মেজোআপাকে শোয়ানোমাত্র মা, ছোপফুপি, বড়আপা আর নাসরিণদের বাড়ির ফুপি-কাকীদের দিয়ে ভরে গেল, সব ঘিরে গেল, অপু কি আর অত ভিড় ঠেলে তার মেজোআপাকে একবার দেখতে পারে?
যোনীর সামান্য উপরে তলপেটের একেবারে শেষসীমায় একটা গভীর চেড়া দাগ, মিত্রার একার গোপন কাটা দাগ, একলা দাগ। অপুও জানে না, এখনও জানে না, হয়ত জানবে কোনো একদিন, খুব অবাক হবে সেদিন অপু, হয়ত দাগটার উপর মমতা নিয়ে হাত রাখবে সে। মিত্রা মনেমনে সেখানে হাত দেয়_ কোথায় দাগ? মিত্রা অবাক হয়ে যায়। এটাতো অপুর কাছে শোনা অপুর মেজোআপার গল্প। মেজোআপা এখন থাকে সেই আমেরিকা। মিত্রারতো কোনো দাগ নাই। তবে মিত্রার শরীরে এত রক্ত কেন, মিত্রার তলপেটে, যোনীতে এত ব্যথা কেন? পাশ ফিরতে গিয়ে প্রচণ্ড ব্যথায় ছাদ, ফ্যান বা মাকড়শা আর বেহায়ার মতো তখনও আটটা বেজে থাকা ঘড়ি আর মিত্রার সমস্ত জগত তার অস্তিত্বশুদ্ধ নড়েচড়ে ওঠে, দুলে ওঠে, অন্ধকার হয়ে আসতে চায়। কিন্তু মিত্রার বড় আলোর দরকার এখন। সবকিছু এখন মিত্রার মনে করতে হবে।
কতজন ছিল ওরা? ছয় পর্যন্ত গুণতে পেরেছিল মিত্রা, তারপর কেমন একটা অভ্যাসের মতো, তীব্র ব্যথা_ সেও অভ্যাসের মতো, তীব্র বমির বেগ, তলপেট থেকে বা আরও নিচে পা থেকে পর্যন্ত সবকিছু বের হয়ে আসতে চায় অথচ বমি হয় না_ সেও অভ্যাসের মতো। আর একসময় সবকিছু শেষ হয়। মিত্রা জ্ঞান হারায় না, কেবল আচ্ছন্নের মতো চিৎ হয়ে পড়ে থাকে কলাভবনের কোনো একটা রুমে বা হয়ত বারান্দায় কিংবা টয়লেটে। কয়েকটা মশা এসে ভনভন করে আবার অন্ধকারের দিকে উড়ে যায়, দলবল নিয়ে ফিরে আসে। মশা তাড়ানোর কোনো ইচ্ছাও মিত্রার অবশিষ্ট থাকে না। কলাভবনে আলো জ্বলে না, অপু, রাতে? বাতি নাই? কেউ একটা বাতি জ্বেলে দেবে?
বাইরেও কি অন্ধকার হয়ে গেছে? হোক, অন্ধকারই হোক তবে, মিত্রাকে ফেলে রেখে ওরা দিনের আলোতে বের হয়ে যায় যাক, মিত্রা কি আর দিনের আলোতে বের হতে পারে? এত ছেঁড়া জামা, আর গায়ে এত রক্ত মেখে কী করে বের হয় মিত্রা? এত রক্ত! সব রক্ত কি তার একার শরীরেই ছিল?
আরও কোথায় যেন মিত্রা দেখেছে একবার এমনই ভেসে যাওয়া রক্ত। কোথায়? কোরবানীর ঈদে বিপ্লবদের নিচতলার ফাঁকা জায়গাটাতে বিপ্লবদের দুইটা, মিত্রাদের একটা আর শাহানাদের একটা করে গরু জবাই হয়। একবার দেখেছিল মিত্রা, মনে আছে, কোরবানী হুজুরের সারা গা ভেসে যাচ্ছিল রক্ত দিয়ে, সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা লুঙ্গির কিছু অংশ তখনও সাদা ছিল বলে, নাকি লম্বা তলোয়ার হাতে ঋজূভঙ্গিতে গ্রীবা উঁচু করে হাসতে হাসতে এজিদের মতো দুলে দুলে ঈদের নতুন শাড়িপড়া কিশোরী মিত্রার দিকে হুজুর এগিয়ে আসছিল বলে, কে জানে কেন, মিত্রা ভীষণ জোরে চেঁচিয়ে উঠে চিত্রাপু'র ধমক খেয়েছিল, আর বিপ্লবরা, বিপ্লবদের মায়েরা, ফুপুরা আর শাহানাদের নানীরা সবাই হাসাহাসি করেছিল মিত্রাকে নিয়ে আর হুজুরও যোগ দিয়েছিল সেই হাসিতে আর মিত্রা দৌড়ে ঘরে চলে গেলেও সেখান থেকেই শুনতে পেয়েছিল চিত্রাপু হুজুরকে একটু সেমাই খেয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করছে আর হুজুর বলছে, 'নাবালিকা মাইয়া তড়াশ হইছে, থাক আম্মা, আছর নামাজবাদ আসব, এখনও কতগুলা জবাই বাকী রয়া গেছেগা।'
হুজুরকে এত বীভৎস দেখাচ্ছিল! হুজুর সেই সাদা ছোপ ছোপ রক্তলাল পাঞ্জাবী পরে, সারা গা বেয়ে বেয়ে পড়া তাজা রক্ত নিয়ে দিনের আলোয় সমস্ত উত্তর মৈশুন্দি কি ভজহরি সাহা স্ট্রিট কি তামাম টিপু সুলতান রোড ঘুরে বেড়াতে পারে, তাতে হুজুরের গৌরবও বাড়ে, কিন্তু এখন এতরক্ত গায়ে, ফালিফালি হয়ে যাওয়া জামা গায়ে দিয়ে কী করে বাইরে যায় মিত্রা? তবে অন্ধকারই হোক।
একসময় কীভাবে কোথা থেকে কী অসীম শক্তি পেয়ে শরীর টেনে টেনে বাইরে আসতে পারে মিত্রা আর একটুপর দেখতে পায় ইকনোমিক্সের শিহাবভাই হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছে, মিত্রাই ডেকেছিল নাকি শিহাবভাই নিজেই মিত্রাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসেছিল তা এখন আর মনে নাই, শুধু মনে আছে তার হাত ধরে সিঁড়িতে যত্ন করে বসিয়ে দিতে দিতে শিহাবভাই বলেছিল, একটু বসো মিত্রা, আমি এক্ষুণি আসছি, এই যাব আর আসব।
আর তাকে সেই বসিয়ে রেখে শিহাবভাই অনন্তকাল পরে ফিরেছিল একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে। বেবিট্যাক্সির প্রচণ্ড শব্দ নির্জন কলাভবনকে যেন নুইয়ে দিচ্ছিল। সেই প্রচণ্ড শব্দের মধ্যে মিত্রা বড় নিঃশব্দে রাতের অন্ধকারে কলাভবন ছেড়ে চলে আসে শিহাবভাইয়ের সাথে। আসতে আসতে ঘুমে কি নির্ঘুমে, কি এক আচ্ছন্নতার মধ্যেই বেবিট্যাক্সির বাইরে তার পরিচিত শহর আর রাস্তা আর দোকানপাট আর তাদের আলো আরেকবার দেখে মিত্রা। বেবিট্যাক্সির খোলা দরজা দিয়ে সাঁইসাঁই করে বাতাস ঢোকে।
বাইরে থেকে আসা জোরবাতাসে মাথার কাছের জানালার পর্দাটা উড়ে মিত্রার মুখের উপর চলে এসে বেশ কিছুক্ষণ ফুলে থাকে। ফুলেথাকা নৌকার পালের মতো পর্দাটা কিছুক্ষণ শূন্যে স্থির থেকে আবার চুপসে নেমে যাবার ঠিক আগে ছাইরঙের উপর নীলনীল বুটি আঁকা একটা প্রজাপতি জানালা দিয়ে উড়ে এসে পর্দার নিচ দিয়ে মিত্রার ঘরে ঢুকে পড়ে, যেন তার আসার জন্যই পর্দাটা উঁচু হয়েছিল। মিত্রার চোখ, অথবা মিত্রা নিজেই প্রজাপতিটার সাথে সাথে উড়ে যায়। প্রজাপতিটা প্রথমে ছাদের কাছাকাছি উচ্চতায় যায় তারপর সারা ছাদ ঘুরে জায়গা পছন্দ করতে থাকে আর একসময় মিত্রার পা বরাবর একটা ঘুলঘুলির পাশে গিয়ে ছাদে পা দিয়ে মেঝের দিকে পিঠ দিয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে বসে। কি আশ্চর্য! মিত্রা আগে থেকেই জানত প্রজাপতি ঠিক ওই জায়গায় বসবে। কিজানি কেন, কিন্তু মিত্রার মনে হয় প্রজাপতিটা হয়ত ঠিক ওই ভেন্টিলেটরের পাশে গিয়ে বসবে। আসলে পুরা ছাদ মিত্রার চেনা। সেই কবে থেকে সে শুয়ে শুয়ে ছাদ দেখছে, কতবছর ধরে একটা মাকড়শার ছাদের গায়ে পা দিয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে ঝুলে হাঁটা দেখছে, রাতের দিকে একটা মোটা টিকটিকি আসে হেলেদুলে। সেও ছাদে পা দিয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে ঝুলে ছাদময় হেঁটে বেড়ায়। আর যে প্রজাপতিটি এখন এসে বসল, সেও উল্টো হয়ে বসল। বসার পর কিন্তু প্রজাপতি পাখা আর মেলে রাখে না, পিঠের উপর দুইহাত এককরে প্রণামের ভঙ্গিতে জড়ো করে রাখে। মাঝেমাঝে একবার দুইডানা দুইদিকে মেলে দিয়ে আবার আগের মতো গুটিয়ে ফেলে। হয়ত বসার পর রঙিন পাখা আর কাউকে দেখাতে চায় না প্রজাপতি। হয়ত কেবল ওড়ার সময়ই দেখাতে চায় তার সব রঙ, বিত্ত, বৈভব।
টিকটিকি-মাকড়শা-প্রজাপতি সবকিছু উল্টো হয়ে ঝুলে আছে, নাকি ওরাই ঠিক আছে আর মিত্রাই ছাদের গায়ে ঝুলে ঝুলে ওদের দেখছে? তা কি আর হয় কখনও? কিন্তু মিত্রার কেন যেন মনে হয় সে যদি তার চুলের দিকে কিংবা তার বিছানার চাদরের দিকে, ওড়না, জামার ঝুল কিংবা আর সবকিছুর দিকে তাকায় তাহলে সে হয়ত দেখতে পাবে সেগুলো সব ছাদের দিকে ঝুলে আছে। হয়ত যেখানে টিকটিকি-মাকড়শা-প্রজাপতি ঘুরে বেড়ায়, হাঁটে, জীবনযাপন করে সেটাই হয়ত মেঝে আর মিত্রা যেখানে শুয়ে আছে, যে খাটের উপর শুয়ে আছে সেটাই হয়ত ছাদ, আর মিত্রা বছর বছর ধরে ছাদে ঝুলে আছে উল্টো হয়ে। মিত্রার তাকাতে ভয় করে। আর একসময় মিত্রা তার সকল ভয় জয় করে একে একে তাকায় তার চুলের দিকে, বিছানার চাদরের দিকে, তার ওড়নার দিকে, জামার ঝুলের দিকে, আর অসহায়ের মতো মিত্রা দেখতে পায় তার আশঙ্কাই সত্যি। মিত্রা হতভম্ব হয়ে যায়। আচ্ছা, এমনতো হতে পারে যে মিত্রা তাহলে উড়তে পারে, ঠিক যেমন করে প্রজাপতি উড়ে আসে বাইরে থেকে, মিত্রাও হয়ত তেমনি উড়ে যেতে পারে বাইরে, মেঘের পাশ দিয়ে, ইছামতি নদীর উপর দিয়ে। কতদিন মিত্রা ইছামতি নদী দেখে না। তবে তাই হোক, উড়ে যাক মিত্রা।
আলগোছে হাতপা ছেড়ে দেয় মিত্রা, কিন্তু মিত্রার হাতপাতো ছাড়াই ছিল, তাহলে মিত্রা কেবল মনেমনে ভাবে সে উড়ে গেল। মিত্রা সত্যি দেখতে পায় সে উড়ে যাচ্ছে। বিছানা থেকে তার শরীর আলাদা হয়ে গেছে। কি আশ্চর্য ভরশূন্য তার শরীর! এখন মিত্রা ইচ্ছা করলেই উড়ে যেতে পারে। চোখ বন্ধ করে মিত্রা শরীর ছেড়ে দেয়। আর মিত্রা অনন্তের দিকে পড়তে থাকে। মিত্রার তলপেটে শিরশির করতে থাকে। মিত্রা কি তাকাবে? কিন্তু তাকালে যদি সে পতনের শেষ দেখতে না পায়? যদি তাকালে দেখে নিচে কেবলই শূন্য? মিত্রা শূন্যের মধ্যেই হাতপা কুঁকড়ে কুণ্ডলি পাকিয়ে ফেলে।
খুব আস্তে আস্তে সময় নিয়ে চোখ খোলে মিত্রা। ঝরোবাতাসে মিত্রার চুল পেছনদিকে উড়তে থাকে আর সে অবিশ্রান্ত পড়তে থাকে কোনো এক অনন্তের দিকে। মিত্রা চারপাশে তাকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু প্রবল বাতাসে কিছুই দেখতে পায় না। মিত্রা দুইহাতে চোখ আড়াল করে। মিত্রা কি গুদামের চাল থেকে নিচে রাখা টিনের স্তুপের দিকে পড়ছে? মিত্রার হাতে তাহলে হাতিশুঁড়ের অপরূপ সবুজ আর সাদা ফুলের গোছা কই? মিত্রা তবে ঝাঁপ দিয়েছে ইছামতির কোমল ঠাণ্ডা জলে। অপু যদি থাকত এখন! তাহলে দুইজনে একসাথে পড়তে পারত ইছামতির বুকে। কী আশ্চর্য! ওইতো অপু। আসলেই আশ্চর্য। মিত্রা যা ভাবছে, তাই হয়ে যাচ্ছে। নাকি আগে থেকেই সব ঠিক করা ছিল, মিত্রা কেবল সময়মতো সবকিছু ভাবতে পারছে। এই তার উল্টো হয়ে শুয়ে থাকা, তার হাতপা ছেড়ে দেয়া, তার ইছামতির কোমল জলে ঝাঁপিয়ে পড়া আর এই পতনের শেষ না হওয়া_ সবকিছু। সব আগে থেকে ঠিক করা ছিল। সবাই জানে, কেবল মিত্রা জানে না।
অপুর কোমরে বাঁধা লালগামছা মিত্রার প্রায় নাগালের ভেতর বাতাসে ওড়ে। একবার সামান্যতম সময়ের জন্য মিত্রা অপুর আঙুলের নাগাল পায়, পায় কি? শেষমুহূর্তে উড়তে থাকা গামছার কোণা খামচে ধরে ফেলে মিত্রা। চোখবুজে মিত্রা শক্ত করে ধরে রাখে অপুর গামছা।
ইছামতির বুকে পড়তে আর কতক্ষণ লাগবে? কতদিন লাগবে? খুব ধীরে ধীরে চোখ খুললে মিত্রা দেখে সে বিছানার চাদর মুচড়ে ধরে আছে। মিত্রার বুক ভেঙে যায়। সে কেন শুকনা বালির দাগ হয়ে রাস্তায় পড়ে নাই? সে কেন ইছামতির পাড়ে অপুর কোমরের গামছা ধরে নাই? অথবা কেন সে ইছামতিতেই কেন তবে ডুবে গেল না? তা ডুবে যদি নাই গেল তবে, এইযে, তাকালেই যে, সোজা ছাদের দিকে তার পড়ে যাবার কথা ছিল, তবে তাই গেল না কেন? ভয়ে ভয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখে মিত্রা বিছানার চাদর ছাদের দিকে ঝুলে নাই, তার চুল, ওড়না, জামার ঝুল সব নেতিয়ে পড়ে আছে বিছানায়। তারই মতো। মিত্রা কেঁদে ফেলে।
- এই! এই! ধরে ফেললতো! আই, আই টিকটিকি! আই বজ্জাত!
পালা! পালা শিগগির! ও প্রজাপতি, পালা তুই ভাই! ও মিত্রা! দৌড় দাও, খুব জোরে দৌড় দাও, এইতো আরেকটু, আরে দূর! স্যান্ডেল খুলে ফেল না! পা ঝটকা দিয়ে ছুঁড়ে দাও!
মিত্রা পা ঝটকায়, স্যান্ডেলের শক্ত বেল্ট তার পা বেঁধে রাখে।
ও মিত্রা! এইতো সামনেই বামদিকে ভেন্টিলেটর, ওখান দিয়ে উড়ে যাও মিত্রা! আর একটু, ওইতো গেট, গেট পেরুলেই রাস্তা, রাস্তায় নিশ্চয়ই অনেক লোক থাকবে। ও মিত্রা, তোমার চোখে কী পড়েছে? দেখতে পাও না কিছু? কিচ্ছু দেখতে হবে না, শুধু দৌড় দাও, দৌড়_ দৌড়__ দৌ_ _ ড়! পালাও! ও প্রজাপতি পালা, প্রজাপতি আমার, মিত্রা আমার, পালা তুই!
ঝটফট করে ডানা ঝাপটায় মিত্রা, দ্রুত পা ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করে প্রজাপতি, ভেন্টিলেটরের বদলে দেয়ালে গিয়ে বাড়ি খায়, মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে, হাত-পা-ডানা অবশ হয়ে আসে, আর একটামাত্র লাফ দিয়ে মিত্রার ডানা মুখে পোরে টিকটিকি। কলাভবন এত অন্ধকার কেন অপু?
উত্তর মৈশুন্দির গলি থেকে বের হয়ে ডানে ঘুরে রুন্টি হোটেল ছেড়ে খানিকটা এগিয়ে এলে বামে ধোলাইখাল যাবার রাস্তা, সেই রাস্তা ছাড়িয়ে আরও খানিকটা সামনে এসে ডানে বনগ্রাম রোড রেখে সোজা অনেকখানি গেলে তবে রথখোলা মোড়_ তবে এতকিছু, এই মিত্রাদের বাসা থেকে বের হওয়া, গেট খুলে বাইরে এসে উত্তর মৈশুন্দির গলি থেকে বের হয়ে সোজা এতখানি রাস্তা, এক মুহূর্তে কোথায় হারিয়ে গেল সব? এইতো অপু বসা ছিল মিত্রাদের ছোট্ট ড্রয়িংরুমে, আর এখন রথখোলার মোড়, তবে এতখানি রাস্তা আর এতখানি সময়, এতলোক সব বুঝি অপুর আঙুলের ফাঁক গলে শুকনা বালুর মতো পড়ে যায়। রান্নাবাটি খেলায় এই শুকনা বালু হত চাল। পুকুর ঘুরে নাসরিণদের বাড়ির পেছন থেকে দুইহাতের তালু এক করে সবচেয়ে বেশি যতখানি শুকনা বালু নেয়া যায় সেভাবে করে নিয়ে এসে ছোট্ট অপু দেখত হাতে কিছুই নাই। এতখানি পথ আসতে আসতে আঙুলের ফাঁক গলে সব বালু পড়ে গেছে। বড়আপা কষে চড় মারে অপুর নরম গালে। ঝাপসা চোখে পেছনে ফেলে আসা, পার হয়ে চলে আসা রাস্তার দিকে তাকালে অপু দেখতে পায় উত্তর মৈশুন্দি থেকে বের হবার পর থেকে ধোলাইখাল যাবার রাস্তার তেমাথা আর বনগ্রাম যাবার রাস্তার তেমাথা যথাক্রমে পার হয়ে এই রথখোলার মোড় পর্যন্ত কালো রাস্তায় সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে লম্বা দাগের মতো পড়ে আছে ওর সফেদ শৈশব। সব এইভাবে কেন পড়ে যায় আঙুলের ফাঁক গলে, কিছুই কি ধরে রাখতে পারে না অপু? অপুর শৈশব, মিত্রা, সব। বড়আপা খুব কষে একটা চড় মারে না কেন অপুর গালে? অপু তবে প্রাণভরে একটু কাঁদতে পারত।
Monday, September 1, 2008
খুনে
টিনের গেটটা এখনও মজবুত। তবে খুব অবহেলায় বেড়ে ওঠা একটা জীবনের মতো কাঠের ফ্রেম থেকে টিন অনেকটা আলগা হয়ে গেছে বলে বাইরে থেকে কেউ গেট ধাক্কালেই ভীষণ শব্দ হয়। মেনে নিতে নিতে একসময় আর না পেরে কোনো কোনো সন্ধ্যায় বেদেপাড়ায় বেধে যাওয়া তুমুল ঝগড়ার মতো হঠাৎ পাড়া সচকিত করা শব্দ তোলে গেটটা। আর সে তীব্র খানখান শব্দে বাড়ির লোকেরা যতটা না চমকায় তারচেয়ে গেট ধাক্কা দেয়া নতুন কোনো লোক বড় বেশি চমকে যায়। লজ্জিত হয়ে পড়ে। আর এত সাতসকালে গেট ভেঙে ফেলার মতো করে ধাক্কানোর শব্দে প্রথমেই কেউ মরে টরে গেছে জাতীয় সংবাদ পাবার আশঙ্কা নিয়ে কাঁচাঘুম ভেঙে থমধরা বুকে অনেকক্ষণ বসে থেকে শেষ পর্যন্ত উঠে এসে তখনও বিপুল উৎসাহে শব্দ করতে থাকা গেটটা খুলেই দেখি হারাধন চণ্ডমূর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে। সাতসকালেই তার হাতেমুখে কালি, মবিল। হাতে একটা প্লায়ার্স। এতক্ষণ ধরে কেউ গেট ধাক্কায়? 'সকালবেলা একখান টুকা দিলি বাড়ির লোকতো বাড়ির লোক, সারা হাতিগারার তাবৎ লোক তা শুনবের পারে'। তা এতকথা অবশ্য হারাধন কওয়ার সুযোগ দেয় না। কিছু বলতে যাবার আগেই, এতজোরে গেট ধাক্কানোর অপরাধে বিরক্ত হবার সামান্য সুযোগটুকু নেবার আগেই হারাধন বরঞ্চ হাতের প্লায়ার্স নাড়িয়ে আমাকেই দুইকথা শুনিয়ে দিয়ে বেগে চলে যায়।
হারাধন কোনোকথা আস্তে বলতে পারে না। আস্তে গেট ধাক্কাতে পারে না। সবকিছু তাকে অনেক জোরে করতে হয়, বলতে হয়। হারাধন অবশ্য কানেখাটো নয়। কানেখাটো লোক নাকি জোরে জোরে কথা বলে, ভাবে জোরে না বললে কেউ শুনতে পাবে না। বরং হারাধন একটু বেশিই শোনে। কেউ কোনো একটা কথা বলছে, সেখানে হারাধন নামটা যদি প্রসঙ্গক্রমে এসে পড়ল_ তা সে যত আস্তেই বলুক, বিশত্রিশ গজের মধ্যে থাকলে হারাধন তা শুনতে পাবেই। আর অমনি, "কী? হারাদন কী করিচে? অঁ্যা, বলি করিচেডা কী হারাদন?" বলতে বলতে ছুটে আসবে।
হারাধনের এই একরকম। ইয়ার্কি বুঝবে না, ঠাট্টা বুঝবে না, কেউ কিছু বললেই মনে করবে সে হিন্দু বলে, তার মতো দুয়েকজন হতভাগা ছাড়া এলাকার হিন্দুরা সবাই ওপার চলে গেছে বলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষমতার অপব্যবহার করে, বিশেষকরে তাকে লক্ষ্য করেই কথাটা বলা হয়েছে। তখনকার মতো সে কিছুই বলবে না। চুপ মেরে থাকবে। কিন্তু ঐদিনই এলাকার মুরবি্বদের কাছে নালিশ ফালিশ করে, ইনিয়ে বিনিয়ে, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে, দিব্যি দিয়ে, কিরা দিয়ে বিচার আদায় করে তবে ছাড়বে।
সাতসকালে তাই এবাড়িতে ছুটে আসা হারাধনের। ব্যাপার গুরুতর কিছু নয়। সামপ্রদায়িক কিছু নয়। বরঞ্চ সংখ্যালঘিষ্ট আর একলা পড়ে যাওয়া হারাধনও সংখ্যাগরিষ্ঠ এই আমাদের ধমকে যায়, শুধু এইবাড়ির লোকদের। আমরা কাউকে জোরে কথা বলি না। আমরা কাউকে ধমক দেই না। কেউ কিছু বললে আমরা শুনি, মেনে নেই। মুন্নার জন্য মেনে নেই।
হারাধন বলতে আসে, আমরা কেন মুন্নাকে দেখে রাখি না_ আমরা কেন মুন্নাকে রাস্তায় বের হতে দেই? আমাদের না হয় মুন্নার জন্য অনেক আল্লাদ আছে, তাই বলে মানুষকে যে সেই আল্লাদের দাম দিতে হয়, আমাদের মতো ভদ্দরলোকের কি সেই খবর একটু রাখতে নাই? নিজের ছেলে কি ভাই হলে মুন্নাকে তারা বেঁধে রাখত, এইসব কথা খুব করে শুনিয়ে দিয়ে হারাধন হাতের প্লায়ার্স দোলাতে দোলাতে হনহন করে চলে যায়।
মুন্নাকে নিয়ে আল্লাদ করার খুব একটা ইচ্ছা, ইচ্ছা কী, সেরকম আল্লাদ করার, এমনকি তা ভাবার সুযোগও আমাদের নাই। তা না থাকলেও কাক অথবা মোরগ ডাকার আগেই গেটটা সন্তর্পণে খুলে বাইরে চলে যাওয়া চাই মুন্নার। যদিও উত্তরে ইছামতির চৌধুরীঘাট বা তারও উত্তরে হুরাসাগর নদীর কোলঘাট বা বড়পায়না'র বটতলা, দক্ষিণে উপজেলা সদর, পূবে ডাকবাংলার মোড় আর পশ্চিমে হাসপাতাল পার হয়ে সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ড অথবা তার কিছুটা উত্তরপাশে স্লুইজগেট, পাম্পহাউজ_ মুন্নার যাতায়াতের সীমা বড়জোর এইকয়টা জায়গার মধ্যে হলেও সাইকেল মেকানিক হারাধনের দোকান এই সীমার বাইরে নয় বলেই সে মুন্নার পাগলামির নালিশ করতে আসে, বিশেষকরে ওর খুনেদৃষ্টির জেরে তার ক্ষতি হয়ে যাবার নালিশ।
তা মুন্নাকে আমরা বেঁধে রাখি না। মুন্নার বলার বোঝার ধরন সাধারণের চেয়ে একটু আলাদা হলেও, আসলে একটু নয় বেশ খানিকটাই আলাদা, একথা আমরা বুঝলেও, মেনে নিলেও, মুন্না পাগল, মুন্নার চোখের দৃষ্টি 'খুনে', 'অলক্ষুণে', যা কিছুর দিকে সে তাকাবে একেবারে মিছমার করে ছাড়বে, হাজার হাজার নজির আছে তার_ এসবকথা আমাদের মানতে কষ্ট হয়। এ হয়ত আমাদের পক্ষপাত, খুব কোলেতোলা আদর, কিন্তু মুন্না যে আর দশজনের মতো করে ভাত খায়, কথা বলে, রাগ করে, অভিমান করে, পড়া মুখস্থ করতে পারে, বিদু্যতবিলের লাস্টডেট মনে রাখতে পারে; সেকথা হারাধনেরা জানবে কোথা থেকে? কিসের পক্ষপাত? মেধাতো তার কম নাই। তবু কী করেছে মুন্না হারাধনের, আসুক মুন্না, বুবুকে না বলুক, বিথীকে না বলুক, দুলাভাই আসলে তাকেও না বলুক, আমাকে নিশ্চয়ই বলবে।
রাত্রে পাশের বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি ঠিক তার সবকথা শুনছি বিশ্বাস করে কতকথা বলে যেতে থাকে সে একঘেয়ে স্বরে, হয়ত কোনো কোনোদিন আমি শুনি, কিন্তু বেশিরভাগ দিনই ওর একঘেয়ে স্বর শুনতে শুনতে আমি কখন ঘুমিয়ে যাই। আর সেজন্য, সেজন্যই বোধহয়, আজ এখন হারাধন একগাদা কথা শুনিয়ে রাগ দেখিয়ে চলে যাবার পর আমার খারাপ লাগতে থাকে, একটা অপরাধবোধ হতে থাকে। আজ আমি ঠিক শুনব, সবকথা শুনব, বলতে বলতে যদি ঘুমিয়ে পড়িস তুই, তোর মায়াভরা মুখের দিকে তাকিয়ে সকাল পর্যন্ত বসে থাকব আমি, তোর ঘুম ভাঙলে তারপর আবার সবকথা শুনব। আমাকে আজ শুনতেই হবে। তারপর আমিও হারাধনকে দুইকথা খুব করে শুনিয়ে দিয়ে আসব।
মুন্না কিন্তু জানে যে বিটুমামা দৈনিকই তার কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যায়, অথচ সকালে উঠে আর স্বীকার করতে চায় না, মুন্নার বরং মায়া লাগে, তাকে বুঝ দেওয়ার জন্য বিটুমামার পাগলামি চেষ্টা দেখে বরং বিটুমামার জন্য তার মায়া লাগে। 'থাইক, তুমি ঘুমপাইরো মামা, তাতে আমার কুনুই অসুবিদা নাই'। মুন্নার বরঞ্চ তাতে অনেক সুবিধা, মনের সুখে অনেক কথা বলে ফেলা যায়, কে বিশ্বাস করল, কে করল না, তা নিয়ে অনেক ভাবার যন্ত্রণা নাই। 'হইছে এখন চুপ কর'_ বলে কারও ধমকে থামিয়ে দেওয়ার ভয় নাই। সবাই এরকম করে কেন? না, সবাই না, ছবি কিন্তু সব বিশ্বাস করে। এ বরং এক ফ্যাকড়া, ছবি সব বিশ্বাস করতে যায় কেন?
ছবিদের বাসায় গেট দিয়ে ঢুকেই বামদিকে আমগাছ আর টিনের বেড়ার চিবির মধ্যে একটা মাটির কলস যুগ যুগ ধরে উপুড় করা আছে, কলসটা ভাঙা, নাকি ভালো, কেন কী কারণে সেটা ওখানে উপুড় করে রাখা হয়েছিল, আর এখনও কেন উপুড় করে রাখা_ ছবিদের বাসার কেউ এখন আর বলতে পারে না, মুন্না অবশ্য কখনও জিজ্ঞেস করেনাই, তবে সে অনুমান করতে পারে ওরা কেউ বলতে পারবে না। বলতেই যদি পারবে, তো প্রথম যেদিন মুন্না ছবিকে বলল, 'আরে! তোমাগরে বাসায় এত্তোবড় উঁইঢিবি হল কবে'? সেদিন ছবি কেন বলতে গেল যে, সেতো অনেকদিন!
- কেন মুন্নাভাই, তুমি এতদিন আস আমাগরে বাসায়, ইডা দেহনাই কুনুদিন? তুমার না সব মনে থাকে!
মুন্না আশ্চর্য হয়ে যায়। ছবির মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করে, ছবি কোনো দুষ্টামির চেষ্টা করছে কিনা, তা ছবির মুখ দেখে সে কিছু বুঝতে পারে না। ছবি টলটলে চোখে সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছবির অনেক আশা করে তাকিয়ে থাকা দেখে বরঞ্চ মুন্নার মায়া হয়, সে ছবির কথায় সায় দেয়। আহা! বেচারি এত সখ করে যখন বলেছে, তখন মুন্না বানিয়ে বানিয়ে বলে যে তাদের বাসায় এরচেয়ে বড় উঁইঢিপি আছে।
- জানি, তোমাগরে কুয়াতলার কাছে, তাইনা?
মুন্নার আরও অবাক লাগে, মেয়েটা নিশ্চয়ই পাগল। আহারে! সাইফুলেরইতো বোন, আহা! সাইফুল থাকলে নিশ্চয়ই অনেক আদর করত ছবিকে, এটাওটা এনে দিত। বিথীরতো খুব সিনেমা দেখার সখ, ছবিরও নিশ্চয়ই আগ্রহ থাকবে। সাইফুল থাকলে নিশ্চয়ই ওদের সিনেমায় নিয়েটিয়ে যেত, তা এখন কে নিয়ে যাবে? মুন্না প্রসঙ্গ পাল্টায়।
- বিকালে রেডি থাইকো ছবি, ইছামতিত্ সোহাগী আইছে, টিকেট লিয়ে আসবোনে দুইটা, না দাঁড়াও, বিলুআপা কই?
- খুলনা।
- কালইতো দেখলাম মনে অ'লো।
- কাল আছিল, আজই চলে গেছে।
- তালিতো দুইটা টিকেটেই হবি।
মুন্নার খারাপ লাগে। ছবি কেন তার সাথে মিথ্যা বলে? শুধু তার কথা ঠিক রাখার জন্য? মুন্নার সবকথায় সায় দেবে কেন ছবি? বিলুআপা গতমাসে একবার এসেছিল, তারপর আর আসেনাই। তবে ছবি কেন বলল যে কালতো ছিল, আজই গেছে?
ছবি কেবল সায় দিয়ে যায়, বিটুমামাও বলে সে তার সবকথা শুনেছে, অখচ মুন্না জানে সবকথা কি, শুরুর দিকে কিছুকথা হয়ত শুনেছে মামা, তারপরতো তার নাকডাকার শব্দে হেসে ফেলে মুন্না। সবদিন না, মাঝেমাঝে বিটুমামা বেশ নাক ডাকে। সব ফ্যাকড়া, আর সবার মতো করে তারা বললেইতো পারে, চুপ কর এখন, তা নয়, কেবল কায়দা করে সায় দিয়ে যাওয়া, কে চায় এত আল্লাদ?
হারাধনের দোকানের সামনে এসে থামে মুন্না, দেখে মন দিয়ে কাজ করছে হারাধন। একটা সাইকেল মাটিতে পেড়ে ফেলে পেছনের টায়ার থেকে টিউব খুলে এনে লিক বের করার জন্য ছোট একটা চারির মধ্যে রাখা পানিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে বুদবুদ ওঠে কিনা তাই দেখছে। মুন্না জানে এই লিক খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন, অনেক ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়, এগুলোকে হারাধন বলে চোরা লিক। মুন্নার বেশ আগ্রহ হয়, পায়েপায়ে এগিয়ে এসে হারাধনের পেছনে দাঁড়ায় দেখবে বলে। মুন্না আসামাত্রই লিক খুঁজে পায় হারাধন। মুন্না বেশ অবাক হয়, এরকমতো হবার কথা না? সে কাছাকাছি থাকলে হয় হারাধনের টায়ার ফাটবে, নাহয় বিয়ারিংয়ের ডজন দুইতিন রূপালী বল তার হাত থেকে ফসকে মাটিতে ছড়িয়ে পড়বে। একটা একটা করে সবকটি বল খুঁটে তুলেও আরও অন্তত গোটা পাঁচছয় বল হারিয়ে গেছে মনে করে তারপর আট কি দশদিন মন খারাপ করে থাকবে সে। চেনা, আধচেনা কি অচেনা যেই হোক তার কাছেই সবিস্তারে মুন্নার কুকীর্তি ব্যাখ্যা করবে। মুন্নার যন্ত্রণায় যে কী অশান্তিতে তার দিন কাটছে তার ফিরিস্তি শোনাবে। হারাধন কি আর এমনি এমনি তার উপর খ্যাপা? অথচ সে আসামাত্রই হারাধন কিনা লিক খুঁজে পায়?
লিক জায়গাটা চক দিয়ে একটা দাগ দিয়ে তারপর একটা ঝামা দিয়ে জায়গাটা ঘষতে থাকে হারাধন, ঘষতে ঘষতেই হাতের সামনে মাটিতে কারো ছায়া পড়তে দেখে ঘুরে পেছনে তাকায় সে। মুন্নাকে দেখেই মুখ তেতো হয়ে যায় তার। সামনে রাখা প্লায়ার্সটাই তুলে নিয়ে তেড়ে আসে, গালাগালের তুবড়ি ছোটে মুখে।
- শালা পাগলের গুষ্টি, পাগলের গুষ্টি মারি আমি, সর! সর কলাম এহেন থে!
হারাধনের তাড়া খেয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে হঠাৎ একদৌড়ে রাস্তা পার হয়ে যায় মুন্না। দ্রুত আসতে থাকা একটা রিক্সা মুন্নাকে বাঁচাতে ব্রেক চেপেও থামাতে পারছে না দেখে আচমকাই বামদিকে ঘুরিয়ে দেয়, ফলে ডানদিকে কাত হয়ে রাস্তার উপর পড়ে যায় রিক্সাটা। রিক্সাওয়ালাও খেপে যায়। কোনোমতে ধূলা ঝাড়তে ঝাড়তে আর ব্যথা পাওয়া জায়গাটায় হাত বুলাতে বুলাতে উঠে দাঁড়ায় সে। মুন্নার দিকে তাকিয়ে সেও একচোট ঝাড়ে।
- শালার কানাচুদা লোক না কি? দেহাশুনা নাই, চোকবুজে দিলো দৌড়!
রিক্সাওয়ালার আঁচানো কথায় হারাধনের রাগে ঘি পড়ে, আরও ক্ষিপ্ত হয়ে সে বলতে থাকে, 'অলুক্ষুণে কে আর সাদে কই, শালার কুফা, যেহেনে যাবি, সব মিছমার করবি'। আরও সব কী কী বলতে থাকে হারাধন, অতসব কানেও যায় না মুন্নার, তার বরঞ্চ মনে হয়, রিক্সা থেকে যে পড়ে গেল লোকটা, খুব ব্যথা পায়নাইতো, তারইতো দোষ। করুণচোখে সে পড়ে যাওয়া লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তা রিক্সাওয়ালা যখন হারাধনের কথা থেকে বুঝতে পারে যে মুন্না পাগল, তখন কিন্তু তার সুর পাল্টে যায়, সে বরঞ্চ আরেকবার মুন্নার দিকে তাকিয়ে রিক্সাটা তুলতে তুলতে হারাধনকে বলে, 'থাকই বাই, পাগল ছাগল মানুষ, দোষতো আর করে নাই!' হারাধন খেপে যায়_ 'কিসির পাগল, সব ওর জাইর্যামি, আমার পাছে সারাসুমায় ওর লাইগে থাহাই লাগবি, আমার যে কত ক্ষতিই ও করিছে!'
হারাধন হয়ত বলেই যেত, তার ক্ষতির ফিরিস্তি দিয়েই যেত, কিন্তু রিক্সাটা যখন তার দোকানের দিকেই ঠেলে নিয়ে এসে রিক্সাওয়ালা বলে_ 'বেরেকের রবারডা লাগা দেনতো বাই, শালা এত জোরে বেরেক দিছি, রবার ছুটা ফালাইছি!' তখন কিন্তু হারাধনের মন সামান্য ভালো হয়। সে ব্রেকটা নেড়েচেড়ে দেখে বলে_ 'ইডা আর লাগান যাবিনোনে, নতুন আরাকটা লাগা দেই?' রিক্সাওয়ালা হারাধনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার ব্রেকের দিকে তাকায়। সে নিজেই ব্রেকটা নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, নতুন ব্রেক লাগাবে কিনা। আবার প্যাসেঞ্জারের দিকে তাকিয়ে বলে_ 'বাই, আপনে চলে যান, ব্যতা পাননাইতো বাই?'
মুন্না হাঁটা দেয়। হারাধন তাকে যতই গাল পাড়ুক, মুন্না বোঝে, সে অলক্ষুণে একথা হারাধন বিশ্বাস করুক বা নাই করুক, এখন মুন্নার কারণে রিক্সার ব্রেক সারার কিংবা স্টিলকেসসহ পুরা ব্রেকসু বদলাবার কাজ পেয়ে হারাধন নিশ্চয়ই খুশি। মুন্না একটু হাসে, তবে আরও অনেক হাসি পায় তার, এইযে হারাধন খুশি, তা কি সে কারও কাছে বলতে পারবে এখন? তা পারবে না, আসলে তার পারা উচিত হবে না, সবসময় তাকে মুন্নার উপর বিরক্ত হবার ভাণ করতে হবে। সবাই ভাণ করে, ছবিকে তার অনেক ভালো লাগে, কিন্তু ছবিও যখন বাছবিচার না করেই তার কথায় সায় দেয়_ তখন মুন্নার হাসি পায়, পাগল আসলে সে নয়, বরঞ্চ পাগল যদি কেউ থাকেতো সে ওই হারাধন, ছবি, বিটুমামা।
কোনো কোনো সময় তার খুব রাগ হয়, অভিমান হয়। সবাই তাকে করুণা করে দেখে তার অভিমান হয়। সে কি আর বোঝে না? বোঝে যদি তবে আর বুঝ দেয়া কেন শুধু তারবেলা? এইতো সেদিন বিথী একটা গ্লাস ভাঙল আর কিলিয়ে বিথীর পিঠ ভাঙল মা। গ্লাস ভাঙলে কি তাকেও অমন করে মারবে মা? খুব কৌতুহল হল তার, পানি খাবার নাম করে রান্নাঘরে গিয়ে গ্লাসটা তুলে নিয়ে ছেড়ে দেয় সে, অনেক সময় নিয়ে গ্লাসটা দ্রুত মেঝের দিকে নেমে যায় আর শেষে ভেঙে যাওয়া আলোর মতো করে কাচ আর কাচের মতো পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে_ কী যে ভালো লাগে দেখতে! রোজ যদি একটা গ্লাস ভাঙতে পারত সে? ভাঙাকাচের টুকরা আর কেবল মোছা ঘরে একগাদা পানি ফেলে তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে সে, মা, বিথী সবাই ছুটে আসে গ্লাসভাঙার শব্দে। সবাই আসার পর যতক্ষণ সবাই নিরব থাকে ততক্ষণ মুন্না একে একে সবার দিকে তাকায়। হঠাৎ মা খুব খেপে গিয়ে আবারও সেই বিথীর উপরই চড়াও হয়।
- ভাইক এক গিলাস পানি ডালে খাওয়ানো গেল না, না? কী? সারাদিন এত কিসির ব্যস্ত? অঁ্যা? কিসির ব্যস্ত?
আবার দুমদুম কিল পড়ে বিথীর নরম পিঠে।
গনগনে রোদের দুপুরে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কান্না পায় মুন্নার। আর কী যেন মনে আসতে চায়, কেবলই মনে হয় কিসের থেকে সে যেন পালিয়ে বেড়ায়। কী করেছে মুন্না? মুন্নার কেবলই মনে হতে থাকে, সে বড়রকমের কোনো অপরাধ করে এসেছে। মা পছন্দ করবে না_ এরকম কিছু, কিন্তু মাতো তাকে কখনও কিছু বলে না। সে গ্লাস ভাঙলেও মা বিথীকে মারে। তবে বোধহয় ছবি পছন্দ করবে না_ এরকম কিছু। কিন্তু ছবিতো কেবলই তার সবকথায় সায় দিয়ে যায়, ছবির অপছন্দের কিছু করলেও ছবি তাকে আবার কী বলবে? বরঞ্চ কোনো অন্যায় যদি সে করেও বসে, আর ছবি যদি তাতে কোনো কষ্ট পেয়েও থাকে, তবু তাকে কিছু বলবে না সে। কেবল সায় দেবে। হয়ত মনখারাপ করে কোথাও বসে থাকবে। তবে হারাধন পছন্দ করবে না_ এমন কিছু? ধুর! হারাধনের থোড়াই পরোয়া করে সে।
তাহলে কী? তাহলে কিসের থেকে সে পালিয়ে বেড়ায়? আসলে সেতো সবসময়ই দোষ করার তালেই আছে, সেতো কোনোকিছুর দিকে তাকালেই সেটা ভেঙেচুরে যায়, এ নিয়েতো আর কম কথা শুনতে হয় না মাকে, বিটুমামাকে, বিথীকে। বিথীর স্কুলে স্যাররা আর মেয়েরা সারাক্ষণ নাকি বিথীকে প্রশ্ন করে, মুন্না কী কী পাগলামি করে, সে কি ন্যাংটা হয়ে থাকে? সে কি কামড়ায়? বিথী একেকদিন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি আসে। সবাই বিথীকে এত কষ্ট দিতে পছন্দ করে কেন? মুন্না তাহলে একদিন তাদের সত্যি কামড়াবে, তাদের সামনে গিয়ে কাপড় খুলে ফেলবে। মুন্নারওতো দায়িত্ব আছে বিথীর প্রতি। মুন্নার ছোট বোন না?
আসলে এসব হয়ত নয়, হয়ত সে তবে কোনো অন্যায় করে আসেনাই, তবু কী যেন মনে হতে চায় মুন্নার, খুব মনদিয়ে সে ভাবে, তবে কিছুতেই মনে করতে পারে না।
হাসপাতাল পার হয়ে এসে ছোট ব্রিজটার উপর উঠে তার মনে হয়, কালতো জয়নগরের সাথে খেলা, আরে! এতক্ষণ ভুলে ছিল কী করে সে একথাটা? সাইফুলদের বাসায় যেতে হয় এক্ষুণি।
অনেক্ষণ ধাক্কানোর পর ঠাণ্ডা আর ভেজা সি্নগ্ধ ছবি এসে দরজা খুলে দেয়। খুব অাঁচানো রোদের ভেতর থেকে এসে ছবির ভেজা ভেজা গা, ভেজামাথায় ভেজাগামছা পেঁচানো ঠাণ্ডা ছবিকে দেখে তার খুব ভালো লাগে। সব ক্লান্তি আর তৃষ্ণা তার নিমেষে কোথায় চলে যায়।
- ভিতরে আসো মুন্নাভাই।
- না, এহন আসপো না। জরুরি কাজ আছে, সাইফুলেক্ ডাকো।
- ভাইয়াতো আসেনাই এখনও, আসো না, ভিতরে আসো।
মুন্না কিন্তু ভেতরে ঢোকে না। কাজ আছে বলে ঘুরে আবার আঁচানো রোদের মধ্যে চলে আসে সে। তার আবার তৃষ্ণা পেতে থাকে। পেছনে না তাকিয়েও মুন্না বুঝতে পারে ভেজা ভেজা ঠাণ্ডা ছবি তখনও গেটে দাঁড়ানো। ছবি তাকে দেখছে, তার দিকেই তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে মুন্নার তৃষ্ণা আবার চলে যায়। তার খুব ভালোলাগতে থাকে। ছবিকে তবে কি সে ভালোবাসে? বিথী সেদিন বলছিল, 'তুই ছবিক্ খুব পছন্দ করিস, না ভাইয়া?' তা মুন্না স্পষ্ট করে কোনোকিছু বলেনাই বিথীকে, কেবল হেসেছে। এই একটাজিনিস সে খুব ভালো জানে, কাউকে কিছু লুকাতে হবে, কাউকে কিছু ভোলাতে হবে, তো সুন্দর করে তার দিকে তাকিয়ে হাসা। তবে এই কাউকের দলে আছে কেবল মা, বিথী, বিটুমামা, আব্বা আর, আর ছবিও বোধহয়। ছবিকে দেখলে তার এত শান্তি হয় কেন?
হাসপাতালের সামনের ছোট ব্রিজটার উপর আবার এসে দাঁড়ায় মুন্না। কিসের খেলা কাল জয়নগরের সাথে? সেতো বছরপাঁচেক আগেকার কথা। জয়নগরের সাথে সেই খেলা নিয়েইতো মারামারি। ব্রিজ থেকে উঁকি দিয়ে নিচে তাকায় সে। ক্যানেলে পানি নাই এখন। তলাটা কেবল সামান্য ভেজা ভেজা, কোথাও কোথাও সামান্য গোড়ালি পর্যন্ত জমে থাকা জলে দুইএকটা চিংড়ির অতি উৎসাহী লাফ দেখা যায়। আর আছে ব্যাঙ। সবুজ শেওলার ভেতর থেকেই বাইরে সামান্য উঁকি দিয়ে রোদবাতাস নেয়।
- ও সাইফুল! সাইফুল রে! এই যে আমি! ও সাইফুল!
নিচে তাকিয়ে ডাকে মুন্না। পশ্চিমদিক থেকে আসা গরম বাতাসে ব্রিজের নিচে জমে থাকা সামান্য জলে একটু ঢেউয়ের মতো হয়। তাই দেখে মুন্নার মনে হয় সাইফুল বুঝি সাড়া দেবে, অপেক্ষা করে সে, অনেক্ষণ পর সাইফুল যখন আর সাড়াশব্দ করে না, তখন তার মনেহয় ছবি কেন তার সাথে মিথ্যা কথা বলে? বললেইতো পারে সাইফুল আর নাই, তোমাদের সাথে খেলতে গিয়েইতো আর এল না। মুন্নার কাছে ছবি যদি একটু অনুযোগ করে কাঁদত! তা কেন? মুন্নাতো পাগল! তাই
সান্ত্বনা করে বলা, 'ভাইয়াতো এখনও ফেরেনাই!' মুন্নার কষ্ট হয়, প্রবল অপরাধবোধে তার বুকগলা ভার হয়ে আসতে থাকে।
হাঁটতে হাঁটতেই খেয়াল করে মুন্না, পাম্পহাউজের রাস্তা ধরেছে সে। তবে পাম্পহাউজেই যাওয়া যাক। হুমহুম গুমগুম করে টনকে টন পানির অবিশ্রান্ত পতন দেখতে তার খারাপ লাগে না। এমন গর্জন করে পানি, মাইলখানেক দূর থেকে পর্যন্ত শোনা যায়, তখন একরকম, আবার কাছে চলে এলে একেবারে আলাদা। জলের শব্দ তখন আর সেই দূর থেকে শোনা বাজনার মতো লাগে না, বরঞ্চ কানের সবটুকু দখল করে নেয়, আর কোনোকিছু তখন শোনার অবকাশ থাকে না, উপায়ও থাকে না। দূর থেকে যেরকম জলের শব্দ কেবলই কাছেযাই কছেযাই করে ডাকে, কাছে এলেও সেরকমই, তবে এই কাছেযাইয়ের মানে তখন বড় ভয়ঙ্কর_ কাছে এলে মনে হয় ঝাঁপিয়ে পড়ি, সব শেষ করে দেই, কোনো কারণ ছাড়াই, মনখারাপ থাকুক আর মনে অনেক আনন্দ থাকুক, খুব কাছে এসে অনেক্ষণ পানির অন্তহীন পতনের দিকে তাকিয়ে থাকলে একসময় মনে হবেই, দেই ঝাঁপ। মরে যেতে ইচ্ছা করবে। বলে বোঝানো যাবে না, সে অন্যরকম, সে বড় কষ্টের। আর যখন ইরির মৌসুমে পাম্পহাউজ থেকে টনকে টন আটকে রাখা জল ছেড়ে দেয়া হয় ক্যানেলের মধ্যে, তখন মুক্তির এক প্রলয়ঙ্করী আনন্দে ধেয়ে যায় সেই পানি, ক্যানেলের ধার কেটে কেটে বড় করে দিতে দিতে হুমড়ে মুচড়ে চলে যায় সেই জল। মুন্না একদিন সেই জলের সাথে সাথে চলে যাবে অনেকদূর। মুন্নার তাই মনে হয়। কেন? কোথায় চলে যাবে মুন্না? তাকি আর মুন্না জানে?
পানির ছোঁয়া লেগে আসা বাতাস ভারি ঠাণ্ডা। বিথীকে আর ছবিকে একদিন নিয়ে আসতে হবে এখানে, ছবিতো বিথীর সাথেই পড়ে। আজ কী বার? শনি? বিথীদের আজ মর্নিংস্কুল, ছুটির সময় হয়ে গেল। তা ছবিতো আজ স্কুলে যায়নাই দেখলাম। নাকি স্কুল শেষ করে চলে এসেছে? দুপুর তবে গড়িয়ে গেছে অনেক আগে, এজন্যই হয়ত ক্ষুধা লাগে মুন্নার।
- তুই মুন্নাক্ খুঁজে আন। কনে যায়া কার আতে মার খাচ্চে তার ঠিক কী? ... কনে আর যাবি? দেখ্গা যায়া কার কাচে মার খায়া ওই সুইজগেটের অহনে বসে রইচে। দরকার অ'লি বাসায় আনে বাঁইদে থো, তাও আমার চোহের সামনেই থাকুক। মরে যদি তাও আমার চোহের সামনেই মরুক।
রওশনবু কাঁদতে থাকে। আমি বুবুকে কী বলে সান্ত্বনা দেই? আজ খুব ভোরে উঠেছিল সে, অন্ধকার থাকতে দুলাভাই নারায়ণগঞ্জ চলে যাবে বলে সবার আগে ওঠে সে। বাপের সাথে তখন থেকেই এটাওটা নিয়ে দুয়েকটা কথাও বলছিল।
- আলো ফুটপি ফুটপি, তহন আব্বা গোসল করবের গেলি ও যায়া রান্নাঘরে বসে বসে বায়না করিছিল, মা, ওমা, খিদে লাগিছে।
বিথী বলে এসব। তখন নাকি রওশনবু সেমাই বানানোর জন্য লাউ কাটছিল কুচিকুচি করে। দুলাভাই লাউসেমাই পছন্দ করে খুব, তাই নারায়ণগঞ্জ যাবার সময় সাথে দিয়ে দিবে বুবু। একেতো খুব তাড়া, তাছাড়া বুবুর অভ্যাসতো আছেই, একেবারে ঘচঘচ করে কাটা, মরিয়মকে ভাতের চুলায় আরেকটা খড়ি দিতে আর কুয়াতলায় জড়ো করে রাখা থালাবাসন কয়টা ধুয়ে আনতে বলতে বলতে ঘচঘচ করে কেটে যেতে থাকে, বটির দিকে কি লাউয়ের দিকে কিংবা হাতের দিকে তাকাতে হয় না রওশনবুর, একবারও না।
সেইযে মা মারা গেল, রওশনবু তখন কেবল ফাইভে পড়ে, আর আমি মাঝেমধ্যে রওশনবুর সাথে তাদের বিপিন বিহারী বালিকা বিদ্যালয়ে যাই, মাষ্টাররা যখন তখন খেপায়।
- এই ছেমড়া, সারাজীবন মেয়েস্কুলে পড়বি নাকি?
তা একদিন বুবুদের ক্লাসের গীতাদি জামগাছে উঠতে বলল, আমিও উঠলাম, আর ওদের নারায়ণ স্যার এসে এমন ধমক দিল, তাড়াহুড়ায় নামতে গিয়ে অর্ধেক এসেই হাতফসকে গেল, কোনো এক হতচ্ছাড়া ডালের কোণায় বেধে পড়ে গেলাম, হাফপ্যান্টটা রয়ে গেল গাছেই। রওশনবুদের স্কুলে তারপর আর কখনও যাওয়া হয়নাই, লজ্জায়, ব্যথায়। রওশনবু তখনও মাঝেমধ্যে আমায় কোলে নিত, মা মরে যাবার কারণেই বোধহয় অতবড় হয়েও বুবুর কোলে চড়তে লজ্জা পাইনাই কোনোদিন। সেইথেকেই রওশনবুর ট্রেনিং, ক্লাস এইটের পর আর পড়া হয়নাই বুবুর, কিন্তু সেইথেকেই ঘচঘচ করে, খুব কুচিকুচি করে লাউকাটার অভ্যাস রওশনবুর।
সংসার করায় ট্রেনিং পাওয়া রওশনবু, পোড়খাওয়া রওশনবু, যেকিনা মরিয়মের সাথে কথা বলে আর মুন্নার আব্বা ভোর ছয়টার ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ চলে যাবে বলে অবলীলায় অন্যান্য দিনের চেয়েও দ্রুত লাউ কাটতে থাকে, তা মুন্না অতো দ্রুত কাটা দেখেই হয়ত, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তার হাতের দিকে।
পটপট করে ওদিকে চুলার উপর ভাত ধরে যাবার শব্দ শুনে মরিয়মকে ডাক দিতে গিয়ে খুব রেগে গেল মা, বলল, যেদিনই কাজের চাপ সেদিনই সব নষ্ট হবার যোগাড়, মরিয়মকে ডেকে না পেয়ে নিজেই উঠে গেল ভাতের জ্বাল কমাতে, খড়ি তুলতে গিয়ে কাপড়ে আঙড়া লেগে খানিকটা পুড়েও গেল আঁচলের কাছে, ঘরে ঢুকতে গিয়ে দরজার কাছে মাথায় বাড়ি খেয়েই মা ঘুরে তাকিয়ে দেখে মরিয়ম আধঘণ্টা পর দুইটা মোটে থালা ধুয়ে এনে তার সাথেই ঘরে ঢুকছে, তার জন্যইতো বাড়ি লাগে মা'র মাথায়। আর মা রেগে গিয়ে মরিয়মের হাত থেকে সেই থালা কেড়ে নিয়ে আছাড় দিয়ে ফেলে উঠানে।
- কাম দেহাবের আসিস আমাক? এত সুমায় লাগে দুইথাল ধুতি, না? সর এহেনথে, সর! ওত্তোরে যা!
আবার লাউ কাটতে বসে মা। আমাকে চুলায় ভাতের পাতিলের কাছে বসতে বলে। ঘ্যানঘ্যান করতে থাকা মুন্না হঠাৎ অনেক্ষণ চুপ করে আছে দেখে কী মনে করে মা লাউ কাটতে কাটতেই তাকায় ভাইয়ার দিকে। অমনি মা দেখে দায়ের উপর দ্রুত চলতে থাকা তার হাতের দিকে তীক্ষ্নচোখে তাকিয়ে আছে মুন্না। ভীষণ চমকে যায় মা, আমারও আর বলা হয় না ভাত পুড়ে যাবার কথা, গনগন করে জ্বলতে থাকা চুলার উপর পুড়তে থাকা ভাতের চটচট শব্দ শুনতে শুনতেই দেখি মা'র বটির নিচে কেটে রাখা কুচিকুচি লাউয়ের স্তুপ ক্রমে লাল হয়ে উঠছে। আর মা তীব্র অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মুন্নার দিকে_ তার চোখে আতঙ্ক।
বিথীর কাছে শোনা বিস্তারিত বর্ণনা এসব। তা মুন্নার সেই তাকিয়ে থাকা দেখেই রওশনবুর হাত পর্যন্ত ফসকে গেল। মিহিন করে একেবারে কুচিকুচি করে কাটা লাউয়ের স্তুপ লাল হয়ে ভিজে উঠল, এমনকি চাকরি থাক বা যাক তবু দুলাভাইর সেদিনই নারায়ণগঞ্জ যাওয়া পর্যন্ত বরবাদ হয়ে গেল।
- মামা! ভাইয়ার চোহে সত্যিই খুনেচাউনি, না? মা পর্যন্ত লক্ষ্মীছাড়া কয়ে গাল পা'ল্লো ভাইয়াক্। আর ও সেইযে উইটে চলে গেল। মা কুনুদিনও এত গাল পারেনাই ওক্।
আমার বড় কষ্ট হয় সবকথা শুনে। এতদিনে তবে বাড়ির লোকজনও বিশ্বাস করতে শুরু করে দিল। হাত কাটল বলে বুবুও বিশ্বাস করা শুরু করে দিল। হাততো এমনিও কাটতে পারত। এতকিছুর মধ্যেও আমার মনে আসে সবকিছুর শুরু করেছিল সেই হারাধন। হারাধনই অভিযোগটা প্রথম তুলেছিল। তার দোকানের সামনে রাস্তার ওপার থেকে নাকি তাকিয়ে ছিল মুন্না। তা প্রথমে তেমন একটা আমল দেয়নাই হারাধন, কিন্তু এতদিনের অভিজ্ঞ হারাধন খুব ভালো করে জানে টায়ারখোলা টিউবে কতখানি হাওয়া দিতে হয়, নতুন টিউবখানা টায়ারে ভরে দেবার আগে সে একটু হাওয়া ভরে টেস্ট করে দেখছিল, আর ঠিক ওইদিকেই নাকি সুঁইয়ের মতো করে তাকিয়েছিল মুন্না। হারাধন যখনই হাওয়াভরা বন্ধ করতে যাবে তখনই বিকট শব্দ করে নতুন টিউবখানা ফেটে গেল। তা টিউব যে কারণেই ফাটুক, হারাধন হয়ত খেয়ালই করত না, যদি না মুন্না রাস্তার ওপার থেকে প্রচণ্ড উল্লাসে হেসে ফেলে হাততালি দিয়ে বলে উঠত, 'আমি আগেই জানি, ও ফাটপি'। এই বলেই মুন্না নাকি হারধানকে হতভম্ব করে দিয়ে দৌড়ে সেখান থেকে চলে যায়।
মুন্নাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, 'আমার কেন জানি মনে অলো উডা ফাটপি। তাই কলাম'। আর সেইদিন থেকে সমস্ত হাতিগারা তো হাতিগারা, বড়পায়না থেকে শুরু করে ভিটেপাড়ার লোক পর্যন্ত জেনে গেল মুন্নার অলক্ষুণে চাউনির কথা।
রওশনবু কাঁদতেই থাকে। এপাশের ঘর থেকে শুনি, দুলাভাই একবার ধমক দেয় বুবুকে।
- তুমার জন্যিইতো! জানোই যে ওসব ফালতুকথা। তারপরও কী মনে কইরে ধমক দিল্যা?
খানিকপর কী বুঝে দুলাভাই আবার বোঝাতে বসে বুবুকে। দুলাভাই'র হয়ত বুবুর জন্য খারাপ লাগে। দুলাভাই হয়ত জানে যে বুবু মন থেকে কথাটা বলেনি।
- ও রুনু, তুমিই যদি এরম করে কাঁদতি থাকো, তালি তুমার মিয়েডাক কিডা সান্ত্বনা দেয়? আমারইবা কিরম লাগে, কও?
দুলাভাই বুবুকে রুনু ডাকে, এই প্রথম শুনলাম। আশ্চর্য, এতদিন বুবুর এতকাছে থেকেও আজই প্রথম শুনলাম দুলাভাই বুবুকে রুনু বলে ডাকে? শুনে আমার কেন যেন লজ্জা লাগতে থাকে। লজ্জা এখন দুলাভাই বুবুকে রুনু ডাকে আর আমি শুনে ফেলি বলে নয়, লজ্জা পাই অন্যকথা মনে করে। আমি তখনতো আর খুব ছোট নই, যখন বিয়ে হয় বুবুর, বিয়ের পর তবু কতদিন ঘ্যানঘ্যান করেছি বুবুর কাছে শোয়ার জন্য। ছোটফুপু একবার খুব ধমক দেয়, 'ধাড়ি ছেমড়া, বুবুর কাছে শোবো! যা! বাংলাঘরে গিয়ে শো, যা!'
এত কান্না পেয়েছিল আমার! তবে তার চেয়ে বেশি কান্না যে রওশনবুর পেয়েছিল তা সকালবেলা বুঝতে পারি, ভোর ভোর উঠে এসে বাংলাঘরে আমার পাশে বসে বুবু ডাকল।
- বিটু, ও বিটু, ওঠতো বাই!
- না, যাও।
দুইটিমাত্র কথা বলতে আমার গলা ভার হয়ে আসে। বুবু অনেক্ষণ কিছু বলে না দেখে ফিরে তাকিয়ে দেখি, আঁচলে চোখ চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁদে বুবু। আমি উঠে বুবুকে জড়িয়ে ধরি। বুবু বলে, 'তোর খুব কষ্ট, নারে?'
- না বুবু। আমার ইট্টুও কষ্ট নাই।
তারপরে বুবুর সাথে এবাড়ি চলে আসি। ফুপু রাখতে চেয়েছিল, থাকিনাই। বাবা নিতে এসেছিল, নতুন মা'র কাছে যেতে দিতে রাজি হয়নাই বুবু। এই নিয়ে তাকে কমকথা শুনতে হয়নাই শ্বশুরবাড়িতে, কিন্তু অনড় থেকেছে রওশনবু। সেই রওশনবু এখন কাঁদে। তাহলে আমাকেতো কিছু একটা করতেই হয়। বুবুর এতকিছুর প্রতিদান কি আর এইজনমে দেয়ার সাধ্য আছে আমার? জামাটা গায়ে দিয়ে বের হতে গেলে বিথী এসে নিচু গলায় বলে, 'ভাত খায়া যাও'।
- সুমায় নাই।
- মা কিন্তু আমাক গাল পারবিনি।
- কইস, খায়াই গেছি।
রাস্তায় পা দিয়েই প্রথমে মনে হয় কোথায় যাব? বেচারা মুন্না। একেতো তারই জন্য মা'র হাত কেটে গেছে, তার উপর রওশনবু দিয়েছে ধমক। নাজানি কোথায় অভিমান করে বসে আছে। আদর করে ডেকে না আনলে কি আর আসতে পারবে?
সিরাজগঞ্জের দিকে শেষবাসটা শেষবিকালে ছেড়ে যাবার পর সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ডে আর একটা লোককেও দেখা যায় না। বাসস্ট্যান্ডে বাজারের সমস্ত কোলাহল থেমে গেলে যখন ঝমঝম করা চায়ের দোকানটা পর্যন্ত খালি হয়ে যাওয়ায় দোকানদার উঠে বন্ধ করতে যায় তখন আস্তে আস্তে ওঠে মুন্না। সারাদিন পাম্পহাউজ আর সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ডে বসে থাকার পরও কেউ তার খোঁজ নিতে আসে না দেখে একটা অভিমান তার বুক থেকে গলা পর্যন্ত পাকিয়ে ওঠে। না আব্বা, না বিটুমামা, না বিথী, না ছবি, কেউ না। তবে মুন্না হারিয়ে গেলে তাদের কিছু যায় আসে না? মুন্না কি ছবিকে ভালোবাসে?
- তুই ছবিক্ খুব পছন্দ করিস, না ভাইয়া?
বিথী বলেছিল একদিন। আর ছবি?
- ছবি কলাম তোক্ খুব পছন্দ করে।
এও বিথীর কাছেই শোনা। আর এখনও সে যে সাইফুলকে খোঁজার ছুতা করে মাঝেমধ্যে ছবিদের বাসায় যায়, সেতো ছবির জন্যই। ছবি তা বোঝে কই? বলে, ভাইয়া এখনও ফেরেনাই। তাকি আর মুন্না জানে না? সাইফুলকে ওরা যে ওর সামনেই ছুরি মেরে মেরে একসময় মেরেই ফেলল। কী রক্ত? এত রক্ততো আর কোনোদিন দেখেনাই মুন্না।
মুন্নার জন্যইতো! জয়নগরের সাথে খেলায় দুইগোল দিল সাইফুল একাই, হেরে গিয়ে গেদু আর চম্পক ঝগড়া করতে এল। এই মারেতো সেই মারে করে ঝগড়া করতে এল, তা গায়ে না মেখে চলে এলেইতো হত। এইতো, এই ব্রিজের উপরইতো। সাইকেলে করে ফিরছিল সে আর সাইফুল। আশ্চর্য! সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ড থেকে মুন্না কখন ব্রিজের উপর চলে এসেছে? তবে কি মুন্না বাড়ি ফিরে যাচ্ছে? কিন্তু কেউতো তাকে নিতে আসেনাই, সে নির্লজ্জের মতো একাই ফিরবে? কিন্তু মুন্নাতো ভাবছে সাইফুলের কথা। এইতো এই ব্রিজের উপর সেদিন গেদু আর চম্পকের সাথে তাদের ঝগড়ার কথা। মুন্না খুব রেগে রেগে জবাব দিচ্ছিল ওদের কথার আর সাইফুল বারবার মুন্নার জামার হাতা ধরে টানছিল, 'চল চলে যাই'।
- চলে যাই মানে? লজ্জা করে না তোর?
মুন্নার অাঁচানো কথাটা শুনে সাইফুল একবার তাকায় মুন্নার দিকে, তারপর 'উরি শালারে!' বলে সোজা গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গেদু আর চম্পকের উপর। মুন্না বাধা দেবার আগেই। মুন্না এতটা চায়নাই, কিন্তু আবার কিছুই না বলে চুপচাপ সরে পড়তেও চায়নাই। তা ওদের কাছে যে কোমরেগোঁজা ক্ষুর ছিল তা কি আর জানত ওরা? না মুন্না, না সাইফুল, কারোরই কি আর জানা ছিল? সাইফুলের পেট ফালাফালা করে দিল ওরা, তারপর ব্রিজ থেকে সাইফুলকে নিচে ফেলে দৌড়, সেদিনওতো এমনই সন্ধ্যা। সেদিনও কেউ ছিল না রাস্তায়। টাকিমাছের খোবলানোর মতো করে সাইফুল এই ক্যানেলের কোমরজলে খোবলায়, আর যখন তার মুখ ভেসে ওঠে পানির উপর, তখনই কেবল এক বিকট চিৎকার শোনা যায়, আর বাকিসময় কেবল জলের খলবল শব্দ। সাইফুল কি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে জলের ভেতর? হঠাৎ সচকিত হয় মুন্না, বহুবছর পর তার ঘোর ভাঙে আর সে সাইকেলটা ব্রিজের উপর দড়াম করে ফেলে দৌড়ে নেমে যায় ক্যানেলের পানিতে। কাদা আর রক্তে মাখামাখি সাইফুলকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে আসে ব্রিজের উপর। ক্যানেলের কোমরপানিতে আর কত জল, তারচেয়ে সাইফুলের রক্ত বেশি। স্ট্যান্ডের উপর সাইকেলটা কোনোমতে দাঁড়া করিয়ে কেরিয়ারে সাইফুলের পেট রেখে দুইপাশে শরীরের বাকি অংশ ঝুলিয়ে দেয়, অনেকটা নিস্তেজ হয়ে গেলেও তখনও বেঁচে ছিল সে। সাইকেলে উপর কি আর থাকতে চায়, পিছলে পড়ে যায়। কিভাবে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল তা এখন আর বোঝানো সম্ভব নয়, শুধু সাইফুল এরইমধ্যে একবার বলেছিল, 'মুন্নারে! মা আর ছবিক্ দেহিস'।
ব্রিজের নিচে প্রায় শুকনা ক্যানেলের তলায় জমে থাকা সামান্য গোড়ালিজল সন্ধ্যার বাতাসে থিরথির করে কাঁপে। ব্রিজের রেলিং থেকে ঝুঁকে পড়ে সেই জলের কাঁপন দেখতে থাকে মুন্না। খুনে দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। সেই দৃষ্টিতে সে ক্যানেলের জলকে দায়ী করে সাইফুলের মৃতু্যর জন্য। আর ভাবে, তার চাউনি এমন কেন? মা'র হাত পর্যন্ত কেটে দিয়ে এল আজ। সে এমন কেন? তার চোখ এমন কেন?
কিন্তু তার দোষ কী? মা একটা করে লাউয়ের বড় টুকরা নিচ্ছিল আর সেই টুকরাটা মা'র হাতের নিচে বটির উপর কেমন দ্রুত ছোট হয়ে আসছিল, আর একসময় শেষ হয়ে যাচ্ছিল পুরা লাউয়ের টুকরাটা, ঠিক যাদুমন্ত্রের মতো। সে খুব মজার একটা দৃশ্য, কেউ কখনও বুঝবে না। সে ঠিক জানে, সে যদি কাউকে বলে, খুব খেয়াল করে তাকিয়ে দেখ, ধর মা নাই, বটিও নাই, নিচে গামলা নাই, শুধু একটা লাউয়ের টুকরা, আস্তে আস্তে কেমন ছোট হয়ে যাচ্ছে, সেতো মা'র হাতের দিকে নয়, বটির দিকেও নয়, সবকিছু বাদ দিয়ে স্রেফ লাউয়ের টুকরাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে চাইছিল, মা আর বটিকে বাদ দিয়ে শুধু লাউয়ের টুকরা দেখা এত সহজ নয়, একারণেই তাকে খুব তীক্ষ্ন করে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছিল। আর তখনিতো মার হাত কেটে গেল। কেন হল? তার চোখের জন্য? তার খুব ইচ্ছা করছিল মা'র হাতটা ধরে কেঁদে ফেলে। অথচ মা! মা খুব নিষ্ঠুর! মা কেন তবে লক্ষ্মীছাড়া বলল? আমার চোখ তবে কানা হয়ে যাক। ভস্ম হয়ে যাক।
মুন্নার চোখ দিয়ে জল গড়ায়। মুন্না জানে তার মা কখনও এরকম নয়। তার চোখ কানা হয়ে গেলে মার কত কষ্ট হবে? কিন্তু তবু মা কেন তাকে লক্ষ্মীছাড়া বলল? তার কী দোষ?
চারপাশে তাকায় মুন্না। দেখে রাস্তায় একটা লোক দূরে থাক, একটা কুকুরও নাই। সবলোকতো বাসায় চলে গেছে, তাতো যাবেই। এইযে মুন্না সকালেও খায়নাই, দুপুরেওতো খায়নাই, বাসার সবাই নিশ্চয়ই ঠিকই খেয়েদেয়ে বসে আছে, রান্না কি আর আজ হয়নাই বাসায়, ঠিকই হয়েছে, সবকিছুই ঠিকমতো চলছে, শুধু মুন্নাই নাই বাসায়। এইযে সন্ধ্যা হয়ে গেল, কই তাকেতো কেউ আর খুঁজতে আসলো না। সেতো আর এমন কোথাও যায়নাই যে কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। মুন্নার ক্ষুধা লাগলেই কী আর না লাগলেই কী? এইতো পরশুদিনইতো, নাকি অন্য কোনোদিন, যাইহোক, বিথীর স্কুল থেকে আসতে দেরি দেখে মা'র কী চিন্তা? সবার খাওয়া হলে মা খেতে বসতে গিয়েও বলল, থাক বিথী আসুক, তারপরে খাবনে। আর আজ আমার বেলা? সবাই ঠিকই খেয়েদেয়ে বসে আছে, হয়ত ঘুমিয়েও গেছে, আব্বা বোধহয় এতক্ষণে নারায়ণগঞ্জে পেঁৗছেও গেছে। আর বিটুমামাও বের হয়ে গেছে, ফিরবে সেই রাত নয়টা-দশটায়। মুন্না বিছানায় নাই দেখেও হয়ত একটুও অবাক হবে না, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই চুপচাপ খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। ছবি কী করছে? আর সাইফুল? সাইফুল থাকলে হয়ত দুইজনে মিলে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়া যেত নিরুদ্দেশে, মুন্না শুধু পেছনে বসে থাকত। সাইফুল এত জোরে চালায়! চাকার নিচে পিচের রাস্তা শুধু কেমন শোঁ শোঁ শব্দ করতে থাকে। আর কিছু শোনা যায় না।
- পারবি? ওহানথেন লাফ দিবের পারবি?
মুন্নার একটা জেদ চেপে যায়। তার চ্যালেঞ্জে সাইফুল যদি চম্পকদের উপর কোনো দ্বিধা না করে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, তবে এই সামান্য ব্রিজের উপর থেকে লাফ দেয়া এমন আর কী? সাইফুল খুব বীর, খুব বাহাদুর, মুন্না কি আর কম? সেও পারে। কিন্তু তবু মা'র জন্য তার মন কেমন করতে থাকে।
রেলিংয়ের উপর চড়ে বসে মুন্না। দুইপাশে তাকিয়ে দেখে কেউ তাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যেতে আসল কিনা, তারপর সাইফুলের ডাকে সাড়া দিয়ে আলগোছে শরীরটা ছেড়ে দেয়। নিচে পড়তে পড়তে সে পাম্পহাউজের দিক থেকে একটা গুমগুম আওয়াজ শুনতে পায়। আজতো শনিবার। আজইতো ক্যানেলে পানি ছেড়ে দেবার কথা। ব্রিজের নিচে প্রায় শুকনা মাটিতে পড়ার ঠিক আগে মুন্না দেখতে পায় পাম্পহাউজের দিক থেকে টনকে টন পানি গমগম হমহম করতে করতে ধেয়ে আসছে। ঝমঝম করতে করতে আসছে। মুন্নার মনে হয়, ইস্! আর একটুপরে লাফ দিলে ঐ শীতল জলে পড়ে অনেকদূরে ভেসে যেতে পারত সে। এখনও সে ভেসেই যাবে। তবে তখন যেত মুন্না নিজে, সাঁতরে সাঁতরে, ভাসতে ভাসতে, সবকিছু দুইচোখ ভরে দেখতে দেখতে আর এখন যাবে মুন্নার নির্জীব শরীর। দুইচোখ দিয়ে এখন আর সে কিছুই দেখবে না।
হারাধন কোনোকথা আস্তে বলতে পারে না। আস্তে গেট ধাক্কাতে পারে না। সবকিছু তাকে অনেক জোরে করতে হয়, বলতে হয়। হারাধন অবশ্য কানেখাটো নয়। কানেখাটো লোক নাকি জোরে জোরে কথা বলে, ভাবে জোরে না বললে কেউ শুনতে পাবে না। বরং হারাধন একটু বেশিই শোনে। কেউ কোনো একটা কথা বলছে, সেখানে হারাধন নামটা যদি প্রসঙ্গক্রমে এসে পড়ল_ তা সে যত আস্তেই বলুক, বিশত্রিশ গজের মধ্যে থাকলে হারাধন তা শুনতে পাবেই। আর অমনি, "কী? হারাদন কী করিচে? অঁ্যা, বলি করিচেডা কী হারাদন?" বলতে বলতে ছুটে আসবে।
হারাধনের এই একরকম। ইয়ার্কি বুঝবে না, ঠাট্টা বুঝবে না, কেউ কিছু বললেই মনে করবে সে হিন্দু বলে, তার মতো দুয়েকজন হতভাগা ছাড়া এলাকার হিন্দুরা সবাই ওপার চলে গেছে বলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষমতার অপব্যবহার করে, বিশেষকরে তাকে লক্ষ্য করেই কথাটা বলা হয়েছে। তখনকার মতো সে কিছুই বলবে না। চুপ মেরে থাকবে। কিন্তু ঐদিনই এলাকার মুরবি্বদের কাছে নালিশ ফালিশ করে, ইনিয়ে বিনিয়ে, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে, দিব্যি দিয়ে, কিরা দিয়ে বিচার আদায় করে তবে ছাড়বে।
সাতসকালে তাই এবাড়িতে ছুটে আসা হারাধনের। ব্যাপার গুরুতর কিছু নয়। সামপ্রদায়িক কিছু নয়। বরঞ্চ সংখ্যালঘিষ্ট আর একলা পড়ে যাওয়া হারাধনও সংখ্যাগরিষ্ঠ এই আমাদের ধমকে যায়, শুধু এইবাড়ির লোকদের। আমরা কাউকে জোরে কথা বলি না। আমরা কাউকে ধমক দেই না। কেউ কিছু বললে আমরা শুনি, মেনে নেই। মুন্নার জন্য মেনে নেই।
হারাধন বলতে আসে, আমরা কেন মুন্নাকে দেখে রাখি না_ আমরা কেন মুন্নাকে রাস্তায় বের হতে দেই? আমাদের না হয় মুন্নার জন্য অনেক আল্লাদ আছে, তাই বলে মানুষকে যে সেই আল্লাদের দাম দিতে হয়, আমাদের মতো ভদ্দরলোকের কি সেই খবর একটু রাখতে নাই? নিজের ছেলে কি ভাই হলে মুন্নাকে তারা বেঁধে রাখত, এইসব কথা খুব করে শুনিয়ে দিয়ে হারাধন হাতের প্লায়ার্স দোলাতে দোলাতে হনহন করে চলে যায়।
মুন্নাকে নিয়ে আল্লাদ করার খুব একটা ইচ্ছা, ইচ্ছা কী, সেরকম আল্লাদ করার, এমনকি তা ভাবার সুযোগও আমাদের নাই। তা না থাকলেও কাক অথবা মোরগ ডাকার আগেই গেটটা সন্তর্পণে খুলে বাইরে চলে যাওয়া চাই মুন্নার। যদিও উত্তরে ইছামতির চৌধুরীঘাট বা তারও উত্তরে হুরাসাগর নদীর কোলঘাট বা বড়পায়না'র বটতলা, দক্ষিণে উপজেলা সদর, পূবে ডাকবাংলার মোড় আর পশ্চিমে হাসপাতাল পার হয়ে সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ড অথবা তার কিছুটা উত্তরপাশে স্লুইজগেট, পাম্পহাউজ_ মুন্নার যাতায়াতের সীমা বড়জোর এইকয়টা জায়গার মধ্যে হলেও সাইকেল মেকানিক হারাধনের দোকান এই সীমার বাইরে নয় বলেই সে মুন্নার পাগলামির নালিশ করতে আসে, বিশেষকরে ওর খুনেদৃষ্টির জেরে তার ক্ষতি হয়ে যাবার নালিশ।
তা মুন্নাকে আমরা বেঁধে রাখি না। মুন্নার বলার বোঝার ধরন সাধারণের চেয়ে একটু আলাদা হলেও, আসলে একটু নয় বেশ খানিকটাই আলাদা, একথা আমরা বুঝলেও, মেনে নিলেও, মুন্না পাগল, মুন্নার চোখের দৃষ্টি 'খুনে', 'অলক্ষুণে', যা কিছুর দিকে সে তাকাবে একেবারে মিছমার করে ছাড়বে, হাজার হাজার নজির আছে তার_ এসবকথা আমাদের মানতে কষ্ট হয়। এ হয়ত আমাদের পক্ষপাত, খুব কোলেতোলা আদর, কিন্তু মুন্না যে আর দশজনের মতো করে ভাত খায়, কথা বলে, রাগ করে, অভিমান করে, পড়া মুখস্থ করতে পারে, বিদু্যতবিলের লাস্টডেট মনে রাখতে পারে; সেকথা হারাধনেরা জানবে কোথা থেকে? কিসের পক্ষপাত? মেধাতো তার কম নাই। তবু কী করেছে মুন্না হারাধনের, আসুক মুন্না, বুবুকে না বলুক, বিথীকে না বলুক, দুলাভাই আসলে তাকেও না বলুক, আমাকে নিশ্চয়ই বলবে।
রাত্রে পাশের বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি ঠিক তার সবকথা শুনছি বিশ্বাস করে কতকথা বলে যেতে থাকে সে একঘেয়ে স্বরে, হয়ত কোনো কোনোদিন আমি শুনি, কিন্তু বেশিরভাগ দিনই ওর একঘেয়ে স্বর শুনতে শুনতে আমি কখন ঘুমিয়ে যাই। আর সেজন্য, সেজন্যই বোধহয়, আজ এখন হারাধন একগাদা কথা শুনিয়ে রাগ দেখিয়ে চলে যাবার পর আমার খারাপ লাগতে থাকে, একটা অপরাধবোধ হতে থাকে। আজ আমি ঠিক শুনব, সবকথা শুনব, বলতে বলতে যদি ঘুমিয়ে পড়িস তুই, তোর মায়াভরা মুখের দিকে তাকিয়ে সকাল পর্যন্ত বসে থাকব আমি, তোর ঘুম ভাঙলে তারপর আবার সবকথা শুনব। আমাকে আজ শুনতেই হবে। তারপর আমিও হারাধনকে দুইকথা খুব করে শুনিয়ে দিয়ে আসব।
মুন্না কিন্তু জানে যে বিটুমামা দৈনিকই তার কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যায়, অথচ সকালে উঠে আর স্বীকার করতে চায় না, মুন্নার বরং মায়া লাগে, তাকে বুঝ দেওয়ার জন্য বিটুমামার পাগলামি চেষ্টা দেখে বরং বিটুমামার জন্য তার মায়া লাগে। 'থাইক, তুমি ঘুমপাইরো মামা, তাতে আমার কুনুই অসুবিদা নাই'। মুন্নার বরঞ্চ তাতে অনেক সুবিধা, মনের সুখে অনেক কথা বলে ফেলা যায়, কে বিশ্বাস করল, কে করল না, তা নিয়ে অনেক ভাবার যন্ত্রণা নাই। 'হইছে এখন চুপ কর'_ বলে কারও ধমকে থামিয়ে দেওয়ার ভয় নাই। সবাই এরকম করে কেন? না, সবাই না, ছবি কিন্তু সব বিশ্বাস করে। এ বরং এক ফ্যাকড়া, ছবি সব বিশ্বাস করতে যায় কেন?
ছবিদের বাসায় গেট দিয়ে ঢুকেই বামদিকে আমগাছ আর টিনের বেড়ার চিবির মধ্যে একটা মাটির কলস যুগ যুগ ধরে উপুড় করা আছে, কলসটা ভাঙা, নাকি ভালো, কেন কী কারণে সেটা ওখানে উপুড় করে রাখা হয়েছিল, আর এখনও কেন উপুড় করে রাখা_ ছবিদের বাসার কেউ এখন আর বলতে পারে না, মুন্না অবশ্য কখনও জিজ্ঞেস করেনাই, তবে সে অনুমান করতে পারে ওরা কেউ বলতে পারবে না। বলতেই যদি পারবে, তো প্রথম যেদিন মুন্না ছবিকে বলল, 'আরে! তোমাগরে বাসায় এত্তোবড় উঁইঢিবি হল কবে'? সেদিন ছবি কেন বলতে গেল যে, সেতো অনেকদিন!
- কেন মুন্নাভাই, তুমি এতদিন আস আমাগরে বাসায়, ইডা দেহনাই কুনুদিন? তুমার না সব মনে থাকে!
মুন্না আশ্চর্য হয়ে যায়। ছবির মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করে, ছবি কোনো দুষ্টামির চেষ্টা করছে কিনা, তা ছবির মুখ দেখে সে কিছু বুঝতে পারে না। ছবি টলটলে চোখে সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছবির অনেক আশা করে তাকিয়ে থাকা দেখে বরঞ্চ মুন্নার মায়া হয়, সে ছবির কথায় সায় দেয়। আহা! বেচারি এত সখ করে যখন বলেছে, তখন মুন্না বানিয়ে বানিয়ে বলে যে তাদের বাসায় এরচেয়ে বড় উঁইঢিপি আছে।
- জানি, তোমাগরে কুয়াতলার কাছে, তাইনা?
মুন্নার আরও অবাক লাগে, মেয়েটা নিশ্চয়ই পাগল। আহারে! সাইফুলেরইতো বোন, আহা! সাইফুল থাকলে নিশ্চয়ই অনেক আদর করত ছবিকে, এটাওটা এনে দিত। বিথীরতো খুব সিনেমা দেখার সখ, ছবিরও নিশ্চয়ই আগ্রহ থাকবে। সাইফুল থাকলে নিশ্চয়ই ওদের সিনেমায় নিয়েটিয়ে যেত, তা এখন কে নিয়ে যাবে? মুন্না প্রসঙ্গ পাল্টায়।
- বিকালে রেডি থাইকো ছবি, ইছামতিত্ সোহাগী আইছে, টিকেট লিয়ে আসবোনে দুইটা, না দাঁড়াও, বিলুআপা কই?
- খুলনা।
- কালইতো দেখলাম মনে অ'লো।
- কাল আছিল, আজই চলে গেছে।
- তালিতো দুইটা টিকেটেই হবি।
মুন্নার খারাপ লাগে। ছবি কেন তার সাথে মিথ্যা বলে? শুধু তার কথা ঠিক রাখার জন্য? মুন্নার সবকথায় সায় দেবে কেন ছবি? বিলুআপা গতমাসে একবার এসেছিল, তারপর আর আসেনাই। তবে ছবি কেন বলল যে কালতো ছিল, আজই গেছে?
ছবি কেবল সায় দিয়ে যায়, বিটুমামাও বলে সে তার সবকথা শুনেছে, অখচ মুন্না জানে সবকথা কি, শুরুর দিকে কিছুকথা হয়ত শুনেছে মামা, তারপরতো তার নাকডাকার শব্দে হেসে ফেলে মুন্না। সবদিন না, মাঝেমাঝে বিটুমামা বেশ নাক ডাকে। সব ফ্যাকড়া, আর সবার মতো করে তারা বললেইতো পারে, চুপ কর এখন, তা নয়, কেবল কায়দা করে সায় দিয়ে যাওয়া, কে চায় এত আল্লাদ?
হারাধনের দোকানের সামনে এসে থামে মুন্না, দেখে মন দিয়ে কাজ করছে হারাধন। একটা সাইকেল মাটিতে পেড়ে ফেলে পেছনের টায়ার থেকে টিউব খুলে এনে লিক বের করার জন্য ছোট একটা চারির মধ্যে রাখা পানিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে বুদবুদ ওঠে কিনা তাই দেখছে। মুন্না জানে এই লিক খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন, অনেক ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়, এগুলোকে হারাধন বলে চোরা লিক। মুন্নার বেশ আগ্রহ হয়, পায়েপায়ে এগিয়ে এসে হারাধনের পেছনে দাঁড়ায় দেখবে বলে। মুন্না আসামাত্রই লিক খুঁজে পায় হারাধন। মুন্না বেশ অবাক হয়, এরকমতো হবার কথা না? সে কাছাকাছি থাকলে হয় হারাধনের টায়ার ফাটবে, নাহয় বিয়ারিংয়ের ডজন দুইতিন রূপালী বল তার হাত থেকে ফসকে মাটিতে ছড়িয়ে পড়বে। একটা একটা করে সবকটি বল খুঁটে তুলেও আরও অন্তত গোটা পাঁচছয় বল হারিয়ে গেছে মনে করে তারপর আট কি দশদিন মন খারাপ করে থাকবে সে। চেনা, আধচেনা কি অচেনা যেই হোক তার কাছেই সবিস্তারে মুন্নার কুকীর্তি ব্যাখ্যা করবে। মুন্নার যন্ত্রণায় যে কী অশান্তিতে তার দিন কাটছে তার ফিরিস্তি শোনাবে। হারাধন কি আর এমনি এমনি তার উপর খ্যাপা? অথচ সে আসামাত্রই হারাধন কিনা লিক খুঁজে পায়?
লিক জায়গাটা চক দিয়ে একটা দাগ দিয়ে তারপর একটা ঝামা দিয়ে জায়গাটা ঘষতে থাকে হারাধন, ঘষতে ঘষতেই হাতের সামনে মাটিতে কারো ছায়া পড়তে দেখে ঘুরে পেছনে তাকায় সে। মুন্নাকে দেখেই মুখ তেতো হয়ে যায় তার। সামনে রাখা প্লায়ার্সটাই তুলে নিয়ে তেড়ে আসে, গালাগালের তুবড়ি ছোটে মুখে।
- শালা পাগলের গুষ্টি, পাগলের গুষ্টি মারি আমি, সর! সর কলাম এহেন থে!
হারাধনের তাড়া খেয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে হঠাৎ একদৌড়ে রাস্তা পার হয়ে যায় মুন্না। দ্রুত আসতে থাকা একটা রিক্সা মুন্নাকে বাঁচাতে ব্রেক চেপেও থামাতে পারছে না দেখে আচমকাই বামদিকে ঘুরিয়ে দেয়, ফলে ডানদিকে কাত হয়ে রাস্তার উপর পড়ে যায় রিক্সাটা। রিক্সাওয়ালাও খেপে যায়। কোনোমতে ধূলা ঝাড়তে ঝাড়তে আর ব্যথা পাওয়া জায়গাটায় হাত বুলাতে বুলাতে উঠে দাঁড়ায় সে। মুন্নার দিকে তাকিয়ে সেও একচোট ঝাড়ে।
- শালার কানাচুদা লোক না কি? দেহাশুনা নাই, চোকবুজে দিলো দৌড়!
রিক্সাওয়ালার আঁচানো কথায় হারাধনের রাগে ঘি পড়ে, আরও ক্ষিপ্ত হয়ে সে বলতে থাকে, 'অলুক্ষুণে কে আর সাদে কই, শালার কুফা, যেহেনে যাবি, সব মিছমার করবি'। আরও সব কী কী বলতে থাকে হারাধন, অতসব কানেও যায় না মুন্নার, তার বরঞ্চ মনে হয়, রিক্সা থেকে যে পড়ে গেল লোকটা, খুব ব্যথা পায়নাইতো, তারইতো দোষ। করুণচোখে সে পড়ে যাওয়া লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তা রিক্সাওয়ালা যখন হারাধনের কথা থেকে বুঝতে পারে যে মুন্না পাগল, তখন কিন্তু তার সুর পাল্টে যায়, সে বরঞ্চ আরেকবার মুন্নার দিকে তাকিয়ে রিক্সাটা তুলতে তুলতে হারাধনকে বলে, 'থাকই বাই, পাগল ছাগল মানুষ, দোষতো আর করে নাই!' হারাধন খেপে যায়_ 'কিসির পাগল, সব ওর জাইর্যামি, আমার পাছে সারাসুমায় ওর লাইগে থাহাই লাগবি, আমার যে কত ক্ষতিই ও করিছে!'
হারাধন হয়ত বলেই যেত, তার ক্ষতির ফিরিস্তি দিয়েই যেত, কিন্তু রিক্সাটা যখন তার দোকানের দিকেই ঠেলে নিয়ে এসে রিক্সাওয়ালা বলে_ 'বেরেকের রবারডা লাগা দেনতো বাই, শালা এত জোরে বেরেক দিছি, রবার ছুটা ফালাইছি!' তখন কিন্তু হারাধনের মন সামান্য ভালো হয়। সে ব্রেকটা নেড়েচেড়ে দেখে বলে_ 'ইডা আর লাগান যাবিনোনে, নতুন আরাকটা লাগা দেই?' রিক্সাওয়ালা হারাধনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার ব্রেকের দিকে তাকায়। সে নিজেই ব্রেকটা নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, নতুন ব্রেক লাগাবে কিনা। আবার প্যাসেঞ্জারের দিকে তাকিয়ে বলে_ 'বাই, আপনে চলে যান, ব্যতা পাননাইতো বাই?'
মুন্না হাঁটা দেয়। হারাধন তাকে যতই গাল পাড়ুক, মুন্না বোঝে, সে অলক্ষুণে একথা হারাধন বিশ্বাস করুক বা নাই করুক, এখন মুন্নার কারণে রিক্সার ব্রেক সারার কিংবা স্টিলকেসসহ পুরা ব্রেকসু বদলাবার কাজ পেয়ে হারাধন নিশ্চয়ই খুশি। মুন্না একটু হাসে, তবে আরও অনেক হাসি পায় তার, এইযে হারাধন খুশি, তা কি সে কারও কাছে বলতে পারবে এখন? তা পারবে না, আসলে তার পারা উচিত হবে না, সবসময় তাকে মুন্নার উপর বিরক্ত হবার ভাণ করতে হবে। সবাই ভাণ করে, ছবিকে তার অনেক ভালো লাগে, কিন্তু ছবিও যখন বাছবিচার না করেই তার কথায় সায় দেয়_ তখন মুন্নার হাসি পায়, পাগল আসলে সে নয়, বরঞ্চ পাগল যদি কেউ থাকেতো সে ওই হারাধন, ছবি, বিটুমামা।
কোনো কোনো সময় তার খুব রাগ হয়, অভিমান হয়। সবাই তাকে করুণা করে দেখে তার অভিমান হয়। সে কি আর বোঝে না? বোঝে যদি তবে আর বুঝ দেয়া কেন শুধু তারবেলা? এইতো সেদিন বিথী একটা গ্লাস ভাঙল আর কিলিয়ে বিথীর পিঠ ভাঙল মা। গ্লাস ভাঙলে কি তাকেও অমন করে মারবে মা? খুব কৌতুহল হল তার, পানি খাবার নাম করে রান্নাঘরে গিয়ে গ্লাসটা তুলে নিয়ে ছেড়ে দেয় সে, অনেক সময় নিয়ে গ্লাসটা দ্রুত মেঝের দিকে নেমে যায় আর শেষে ভেঙে যাওয়া আলোর মতো করে কাচ আর কাচের মতো পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে_ কী যে ভালো লাগে দেখতে! রোজ যদি একটা গ্লাস ভাঙতে পারত সে? ভাঙাকাচের টুকরা আর কেবল মোছা ঘরে একগাদা পানি ফেলে তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে সে, মা, বিথী সবাই ছুটে আসে গ্লাসভাঙার শব্দে। সবাই আসার পর যতক্ষণ সবাই নিরব থাকে ততক্ষণ মুন্না একে একে সবার দিকে তাকায়। হঠাৎ মা খুব খেপে গিয়ে আবারও সেই বিথীর উপরই চড়াও হয়।
- ভাইক এক গিলাস পানি ডালে খাওয়ানো গেল না, না? কী? সারাদিন এত কিসির ব্যস্ত? অঁ্যা? কিসির ব্যস্ত?
আবার দুমদুম কিল পড়ে বিথীর নরম পিঠে।
গনগনে রোদের দুপুরে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কান্না পায় মুন্নার। আর কী যেন মনে আসতে চায়, কেবলই মনে হয় কিসের থেকে সে যেন পালিয়ে বেড়ায়। কী করেছে মুন্না? মুন্নার কেবলই মনে হতে থাকে, সে বড়রকমের কোনো অপরাধ করে এসেছে। মা পছন্দ করবে না_ এরকম কিছু, কিন্তু মাতো তাকে কখনও কিছু বলে না। সে গ্লাস ভাঙলেও মা বিথীকে মারে। তবে বোধহয় ছবি পছন্দ করবে না_ এরকম কিছু। কিন্তু ছবিতো কেবলই তার সবকথায় সায় দিয়ে যায়, ছবির অপছন্দের কিছু করলেও ছবি তাকে আবার কী বলবে? বরঞ্চ কোনো অন্যায় যদি সে করেও বসে, আর ছবি যদি তাতে কোনো কষ্ট পেয়েও থাকে, তবু তাকে কিছু বলবে না সে। কেবল সায় দেবে। হয়ত মনখারাপ করে কোথাও বসে থাকবে। তবে হারাধন পছন্দ করবে না_ এমন কিছু? ধুর! হারাধনের থোড়াই পরোয়া করে সে।
তাহলে কী? তাহলে কিসের থেকে সে পালিয়ে বেড়ায়? আসলে সেতো সবসময়ই দোষ করার তালেই আছে, সেতো কোনোকিছুর দিকে তাকালেই সেটা ভেঙেচুরে যায়, এ নিয়েতো আর কম কথা শুনতে হয় না মাকে, বিটুমামাকে, বিথীকে। বিথীর স্কুলে স্যাররা আর মেয়েরা সারাক্ষণ নাকি বিথীকে প্রশ্ন করে, মুন্না কী কী পাগলামি করে, সে কি ন্যাংটা হয়ে থাকে? সে কি কামড়ায়? বিথী একেকদিন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি আসে। সবাই বিথীকে এত কষ্ট দিতে পছন্দ করে কেন? মুন্না তাহলে একদিন তাদের সত্যি কামড়াবে, তাদের সামনে গিয়ে কাপড় খুলে ফেলবে। মুন্নারওতো দায়িত্ব আছে বিথীর প্রতি। মুন্নার ছোট বোন না?
আসলে এসব হয়ত নয়, হয়ত সে তবে কোনো অন্যায় করে আসেনাই, তবু কী যেন মনে হতে চায় মুন্নার, খুব মনদিয়ে সে ভাবে, তবে কিছুতেই মনে করতে পারে না।
হাসপাতাল পার হয়ে এসে ছোট ব্রিজটার উপর উঠে তার মনে হয়, কালতো জয়নগরের সাথে খেলা, আরে! এতক্ষণ ভুলে ছিল কী করে সে একথাটা? সাইফুলদের বাসায় যেতে হয় এক্ষুণি।
অনেক্ষণ ধাক্কানোর পর ঠাণ্ডা আর ভেজা সি্নগ্ধ ছবি এসে দরজা খুলে দেয়। খুব অাঁচানো রোদের ভেতর থেকে এসে ছবির ভেজা ভেজা গা, ভেজামাথায় ভেজাগামছা পেঁচানো ঠাণ্ডা ছবিকে দেখে তার খুব ভালো লাগে। সব ক্লান্তি আর তৃষ্ণা তার নিমেষে কোথায় চলে যায়।
- ভিতরে আসো মুন্নাভাই।
- না, এহন আসপো না। জরুরি কাজ আছে, সাইফুলেক্ ডাকো।
- ভাইয়াতো আসেনাই এখনও, আসো না, ভিতরে আসো।
মুন্না কিন্তু ভেতরে ঢোকে না। কাজ আছে বলে ঘুরে আবার আঁচানো রোদের মধ্যে চলে আসে সে। তার আবার তৃষ্ণা পেতে থাকে। পেছনে না তাকিয়েও মুন্না বুঝতে পারে ভেজা ভেজা ঠাণ্ডা ছবি তখনও গেটে দাঁড়ানো। ছবি তাকে দেখছে, তার দিকেই তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে মুন্নার তৃষ্ণা আবার চলে যায়। তার খুব ভালোলাগতে থাকে। ছবিকে তবে কি সে ভালোবাসে? বিথী সেদিন বলছিল, 'তুই ছবিক্ খুব পছন্দ করিস, না ভাইয়া?' তা মুন্না স্পষ্ট করে কোনোকিছু বলেনাই বিথীকে, কেবল হেসেছে। এই একটাজিনিস সে খুব ভালো জানে, কাউকে কিছু লুকাতে হবে, কাউকে কিছু ভোলাতে হবে, তো সুন্দর করে তার দিকে তাকিয়ে হাসা। তবে এই কাউকের দলে আছে কেবল মা, বিথী, বিটুমামা, আব্বা আর, আর ছবিও বোধহয়। ছবিকে দেখলে তার এত শান্তি হয় কেন?
হাসপাতালের সামনের ছোট ব্রিজটার উপর আবার এসে দাঁড়ায় মুন্না। কিসের খেলা কাল জয়নগরের সাথে? সেতো বছরপাঁচেক আগেকার কথা। জয়নগরের সাথে সেই খেলা নিয়েইতো মারামারি। ব্রিজ থেকে উঁকি দিয়ে নিচে তাকায় সে। ক্যানেলে পানি নাই এখন। তলাটা কেবল সামান্য ভেজা ভেজা, কোথাও কোথাও সামান্য গোড়ালি পর্যন্ত জমে থাকা জলে দুইএকটা চিংড়ির অতি উৎসাহী লাফ দেখা যায়। আর আছে ব্যাঙ। সবুজ শেওলার ভেতর থেকেই বাইরে সামান্য উঁকি দিয়ে রোদবাতাস নেয়।
- ও সাইফুল! সাইফুল রে! এই যে আমি! ও সাইফুল!
নিচে তাকিয়ে ডাকে মুন্না। পশ্চিমদিক থেকে আসা গরম বাতাসে ব্রিজের নিচে জমে থাকা সামান্য জলে একটু ঢেউয়ের মতো হয়। তাই দেখে মুন্নার মনে হয় সাইফুল বুঝি সাড়া দেবে, অপেক্ষা করে সে, অনেক্ষণ পর সাইফুল যখন আর সাড়াশব্দ করে না, তখন তার মনেহয় ছবি কেন তার সাথে মিথ্যা কথা বলে? বললেইতো পারে সাইফুল আর নাই, তোমাদের সাথে খেলতে গিয়েইতো আর এল না। মুন্নার কাছে ছবি যদি একটু অনুযোগ করে কাঁদত! তা কেন? মুন্নাতো পাগল! তাই
সান্ত্বনা করে বলা, 'ভাইয়াতো এখনও ফেরেনাই!' মুন্নার কষ্ট হয়, প্রবল অপরাধবোধে তার বুকগলা ভার হয়ে আসতে থাকে।
হাঁটতে হাঁটতেই খেয়াল করে মুন্না, পাম্পহাউজের রাস্তা ধরেছে সে। তবে পাম্পহাউজেই যাওয়া যাক। হুমহুম গুমগুম করে টনকে টন পানির অবিশ্রান্ত পতন দেখতে তার খারাপ লাগে না। এমন গর্জন করে পানি, মাইলখানেক দূর থেকে পর্যন্ত শোনা যায়, তখন একরকম, আবার কাছে চলে এলে একেবারে আলাদা। জলের শব্দ তখন আর সেই দূর থেকে শোনা বাজনার মতো লাগে না, বরঞ্চ কানের সবটুকু দখল করে নেয়, আর কোনোকিছু তখন শোনার অবকাশ থাকে না, উপায়ও থাকে না। দূর থেকে যেরকম জলের শব্দ কেবলই কাছেযাই কছেযাই করে ডাকে, কাছে এলেও সেরকমই, তবে এই কাছেযাইয়ের মানে তখন বড় ভয়ঙ্কর_ কাছে এলে মনে হয় ঝাঁপিয়ে পড়ি, সব শেষ করে দেই, কোনো কারণ ছাড়াই, মনখারাপ থাকুক আর মনে অনেক আনন্দ থাকুক, খুব কাছে এসে অনেক্ষণ পানির অন্তহীন পতনের দিকে তাকিয়ে থাকলে একসময় মনে হবেই, দেই ঝাঁপ। মরে যেতে ইচ্ছা করবে। বলে বোঝানো যাবে না, সে অন্যরকম, সে বড় কষ্টের। আর যখন ইরির মৌসুমে পাম্পহাউজ থেকে টনকে টন আটকে রাখা জল ছেড়ে দেয়া হয় ক্যানেলের মধ্যে, তখন মুক্তির এক প্রলয়ঙ্করী আনন্দে ধেয়ে যায় সেই পানি, ক্যানেলের ধার কেটে কেটে বড় করে দিতে দিতে হুমড়ে মুচড়ে চলে যায় সেই জল। মুন্না একদিন সেই জলের সাথে সাথে চলে যাবে অনেকদূর। মুন্নার তাই মনে হয়। কেন? কোথায় চলে যাবে মুন্না? তাকি আর মুন্না জানে?
পানির ছোঁয়া লেগে আসা বাতাস ভারি ঠাণ্ডা। বিথীকে আর ছবিকে একদিন নিয়ে আসতে হবে এখানে, ছবিতো বিথীর সাথেই পড়ে। আজ কী বার? শনি? বিথীদের আজ মর্নিংস্কুল, ছুটির সময় হয়ে গেল। তা ছবিতো আজ স্কুলে যায়নাই দেখলাম। নাকি স্কুল শেষ করে চলে এসেছে? দুপুর তবে গড়িয়ে গেছে অনেক আগে, এজন্যই হয়ত ক্ষুধা লাগে মুন্নার।
- তুই মুন্নাক্ খুঁজে আন। কনে যায়া কার আতে মার খাচ্চে তার ঠিক কী? ... কনে আর যাবি? দেখ্গা যায়া কার কাচে মার খায়া ওই সুইজগেটের অহনে বসে রইচে। দরকার অ'লি বাসায় আনে বাঁইদে থো, তাও আমার চোহের সামনেই থাকুক। মরে যদি তাও আমার চোহের সামনেই মরুক।
রওশনবু কাঁদতে থাকে। আমি বুবুকে কী বলে সান্ত্বনা দেই? আজ খুব ভোরে উঠেছিল সে, অন্ধকার থাকতে দুলাভাই নারায়ণগঞ্জ চলে যাবে বলে সবার আগে ওঠে সে। বাপের সাথে তখন থেকেই এটাওটা নিয়ে দুয়েকটা কথাও বলছিল।
- আলো ফুটপি ফুটপি, তহন আব্বা গোসল করবের গেলি ও যায়া রান্নাঘরে বসে বসে বায়না করিছিল, মা, ওমা, খিদে লাগিছে।
বিথী বলে এসব। তখন নাকি রওশনবু সেমাই বানানোর জন্য লাউ কাটছিল কুচিকুচি করে। দুলাভাই লাউসেমাই পছন্দ করে খুব, তাই নারায়ণগঞ্জ যাবার সময় সাথে দিয়ে দিবে বুবু। একেতো খুব তাড়া, তাছাড়া বুবুর অভ্যাসতো আছেই, একেবারে ঘচঘচ করে কাটা, মরিয়মকে ভাতের চুলায় আরেকটা খড়ি দিতে আর কুয়াতলায় জড়ো করে রাখা থালাবাসন কয়টা ধুয়ে আনতে বলতে বলতে ঘচঘচ করে কেটে যেতে থাকে, বটির দিকে কি লাউয়ের দিকে কিংবা হাতের দিকে তাকাতে হয় না রওশনবুর, একবারও না।
সেইযে মা মারা গেল, রওশনবু তখন কেবল ফাইভে পড়ে, আর আমি মাঝেমধ্যে রওশনবুর সাথে তাদের বিপিন বিহারী বালিকা বিদ্যালয়ে যাই, মাষ্টাররা যখন তখন খেপায়।
- এই ছেমড়া, সারাজীবন মেয়েস্কুলে পড়বি নাকি?
তা একদিন বুবুদের ক্লাসের গীতাদি জামগাছে উঠতে বলল, আমিও উঠলাম, আর ওদের নারায়ণ স্যার এসে এমন ধমক দিল, তাড়াহুড়ায় নামতে গিয়ে অর্ধেক এসেই হাতফসকে গেল, কোনো এক হতচ্ছাড়া ডালের কোণায় বেধে পড়ে গেলাম, হাফপ্যান্টটা রয়ে গেল গাছেই। রওশনবুদের স্কুলে তারপর আর কখনও যাওয়া হয়নাই, লজ্জায়, ব্যথায়। রওশনবু তখনও মাঝেমধ্যে আমায় কোলে নিত, মা মরে যাবার কারণেই বোধহয় অতবড় হয়েও বুবুর কোলে চড়তে লজ্জা পাইনাই কোনোদিন। সেইথেকেই রওশনবুর ট্রেনিং, ক্লাস এইটের পর আর পড়া হয়নাই বুবুর, কিন্তু সেইথেকেই ঘচঘচ করে, খুব কুচিকুচি করে লাউকাটার অভ্যাস রওশনবুর।
সংসার করায় ট্রেনিং পাওয়া রওশনবু, পোড়খাওয়া রওশনবু, যেকিনা মরিয়মের সাথে কথা বলে আর মুন্নার আব্বা ভোর ছয়টার ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ চলে যাবে বলে অবলীলায় অন্যান্য দিনের চেয়েও দ্রুত লাউ কাটতে থাকে, তা মুন্না অতো দ্রুত কাটা দেখেই হয়ত, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তার হাতের দিকে।
পটপট করে ওদিকে চুলার উপর ভাত ধরে যাবার শব্দ শুনে মরিয়মকে ডাক দিতে গিয়ে খুব রেগে গেল মা, বলল, যেদিনই কাজের চাপ সেদিনই সব নষ্ট হবার যোগাড়, মরিয়মকে ডেকে না পেয়ে নিজেই উঠে গেল ভাতের জ্বাল কমাতে, খড়ি তুলতে গিয়ে কাপড়ে আঙড়া লেগে খানিকটা পুড়েও গেল আঁচলের কাছে, ঘরে ঢুকতে গিয়ে দরজার কাছে মাথায় বাড়ি খেয়েই মা ঘুরে তাকিয়ে দেখে মরিয়ম আধঘণ্টা পর দুইটা মোটে থালা ধুয়ে এনে তার সাথেই ঘরে ঢুকছে, তার জন্যইতো বাড়ি লাগে মা'র মাথায়। আর মা রেগে গিয়ে মরিয়মের হাত থেকে সেই থালা কেড়ে নিয়ে আছাড় দিয়ে ফেলে উঠানে।
- কাম দেহাবের আসিস আমাক? এত সুমায় লাগে দুইথাল ধুতি, না? সর এহেনথে, সর! ওত্তোরে যা!
আবার লাউ কাটতে বসে মা। আমাকে চুলায় ভাতের পাতিলের কাছে বসতে বলে। ঘ্যানঘ্যান করতে থাকা মুন্না হঠাৎ অনেক্ষণ চুপ করে আছে দেখে কী মনে করে মা লাউ কাটতে কাটতেই তাকায় ভাইয়ার দিকে। অমনি মা দেখে দায়ের উপর দ্রুত চলতে থাকা তার হাতের দিকে তীক্ষ্নচোখে তাকিয়ে আছে মুন্না। ভীষণ চমকে যায় মা, আমারও আর বলা হয় না ভাত পুড়ে যাবার কথা, গনগন করে জ্বলতে থাকা চুলার উপর পুড়তে থাকা ভাতের চটচট শব্দ শুনতে শুনতেই দেখি মা'র বটির নিচে কেটে রাখা কুচিকুচি লাউয়ের স্তুপ ক্রমে লাল হয়ে উঠছে। আর মা তীব্র অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মুন্নার দিকে_ তার চোখে আতঙ্ক।
বিথীর কাছে শোনা বিস্তারিত বর্ণনা এসব। তা মুন্নার সেই তাকিয়ে থাকা দেখেই রওশনবুর হাত পর্যন্ত ফসকে গেল। মিহিন করে একেবারে কুচিকুচি করে কাটা লাউয়ের স্তুপ লাল হয়ে ভিজে উঠল, এমনকি চাকরি থাক বা যাক তবু দুলাভাইর সেদিনই নারায়ণগঞ্জ যাওয়া পর্যন্ত বরবাদ হয়ে গেল।
- মামা! ভাইয়ার চোহে সত্যিই খুনেচাউনি, না? মা পর্যন্ত লক্ষ্মীছাড়া কয়ে গাল পা'ল্লো ভাইয়াক্। আর ও সেইযে উইটে চলে গেল। মা কুনুদিনও এত গাল পারেনাই ওক্।
আমার বড় কষ্ট হয় সবকথা শুনে। এতদিনে তবে বাড়ির লোকজনও বিশ্বাস করতে শুরু করে দিল। হাত কাটল বলে বুবুও বিশ্বাস করা শুরু করে দিল। হাততো এমনিও কাটতে পারত। এতকিছুর মধ্যেও আমার মনে আসে সবকিছুর শুরু করেছিল সেই হারাধন। হারাধনই অভিযোগটা প্রথম তুলেছিল। তার দোকানের সামনে রাস্তার ওপার থেকে নাকি তাকিয়ে ছিল মুন্না। তা প্রথমে তেমন একটা আমল দেয়নাই হারাধন, কিন্তু এতদিনের অভিজ্ঞ হারাধন খুব ভালো করে জানে টায়ারখোলা টিউবে কতখানি হাওয়া দিতে হয়, নতুন টিউবখানা টায়ারে ভরে দেবার আগে সে একটু হাওয়া ভরে টেস্ট করে দেখছিল, আর ঠিক ওইদিকেই নাকি সুঁইয়ের মতো করে তাকিয়েছিল মুন্না। হারাধন যখনই হাওয়াভরা বন্ধ করতে যাবে তখনই বিকট শব্দ করে নতুন টিউবখানা ফেটে গেল। তা টিউব যে কারণেই ফাটুক, হারাধন হয়ত খেয়ালই করত না, যদি না মুন্না রাস্তার ওপার থেকে প্রচণ্ড উল্লাসে হেসে ফেলে হাততালি দিয়ে বলে উঠত, 'আমি আগেই জানি, ও ফাটপি'। এই বলেই মুন্না নাকি হারধানকে হতভম্ব করে দিয়ে দৌড়ে সেখান থেকে চলে যায়।
মুন্নাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, 'আমার কেন জানি মনে অলো উডা ফাটপি। তাই কলাম'। আর সেইদিন থেকে সমস্ত হাতিগারা তো হাতিগারা, বড়পায়না থেকে শুরু করে ভিটেপাড়ার লোক পর্যন্ত জেনে গেল মুন্নার অলক্ষুণে চাউনির কথা।
রওশনবু কাঁদতেই থাকে। এপাশের ঘর থেকে শুনি, দুলাভাই একবার ধমক দেয় বুবুকে।
- তুমার জন্যিইতো! জানোই যে ওসব ফালতুকথা। তারপরও কী মনে কইরে ধমক দিল্যা?
খানিকপর কী বুঝে দুলাভাই আবার বোঝাতে বসে বুবুকে। দুলাভাই'র হয়ত বুবুর জন্য খারাপ লাগে। দুলাভাই হয়ত জানে যে বুবু মন থেকে কথাটা বলেনি।
- ও রুনু, তুমিই যদি এরম করে কাঁদতি থাকো, তালি তুমার মিয়েডাক কিডা সান্ত্বনা দেয়? আমারইবা কিরম লাগে, কও?
দুলাভাই বুবুকে রুনু ডাকে, এই প্রথম শুনলাম। আশ্চর্য, এতদিন বুবুর এতকাছে থেকেও আজই প্রথম শুনলাম দুলাভাই বুবুকে রুনু বলে ডাকে? শুনে আমার কেন যেন লজ্জা লাগতে থাকে। লজ্জা এখন দুলাভাই বুবুকে রুনু ডাকে আর আমি শুনে ফেলি বলে নয়, লজ্জা পাই অন্যকথা মনে করে। আমি তখনতো আর খুব ছোট নই, যখন বিয়ে হয় বুবুর, বিয়ের পর তবু কতদিন ঘ্যানঘ্যান করেছি বুবুর কাছে শোয়ার জন্য। ছোটফুপু একবার খুব ধমক দেয়, 'ধাড়ি ছেমড়া, বুবুর কাছে শোবো! যা! বাংলাঘরে গিয়ে শো, যা!'
এত কান্না পেয়েছিল আমার! তবে তার চেয়ে বেশি কান্না যে রওশনবুর পেয়েছিল তা সকালবেলা বুঝতে পারি, ভোর ভোর উঠে এসে বাংলাঘরে আমার পাশে বসে বুবু ডাকল।
- বিটু, ও বিটু, ওঠতো বাই!
- না, যাও।
দুইটিমাত্র কথা বলতে আমার গলা ভার হয়ে আসে। বুবু অনেক্ষণ কিছু বলে না দেখে ফিরে তাকিয়ে দেখি, আঁচলে চোখ চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁদে বুবু। আমি উঠে বুবুকে জড়িয়ে ধরি। বুবু বলে, 'তোর খুব কষ্ট, নারে?'
- না বুবু। আমার ইট্টুও কষ্ট নাই।
তারপরে বুবুর সাথে এবাড়ি চলে আসি। ফুপু রাখতে চেয়েছিল, থাকিনাই। বাবা নিতে এসেছিল, নতুন মা'র কাছে যেতে দিতে রাজি হয়নাই বুবু। এই নিয়ে তাকে কমকথা শুনতে হয়নাই শ্বশুরবাড়িতে, কিন্তু অনড় থেকেছে রওশনবু। সেই রওশনবু এখন কাঁদে। তাহলে আমাকেতো কিছু একটা করতেই হয়। বুবুর এতকিছুর প্রতিদান কি আর এইজনমে দেয়ার সাধ্য আছে আমার? জামাটা গায়ে দিয়ে বের হতে গেলে বিথী এসে নিচু গলায় বলে, 'ভাত খায়া যাও'।
- সুমায় নাই।
- মা কিন্তু আমাক গাল পারবিনি।
- কইস, খায়াই গেছি।
রাস্তায় পা দিয়েই প্রথমে মনে হয় কোথায় যাব? বেচারা মুন্না। একেতো তারই জন্য মা'র হাত কেটে গেছে, তার উপর রওশনবু দিয়েছে ধমক। নাজানি কোথায় অভিমান করে বসে আছে। আদর করে ডেকে না আনলে কি আর আসতে পারবে?
সিরাজগঞ্জের দিকে শেষবাসটা শেষবিকালে ছেড়ে যাবার পর সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ডে আর একটা লোককেও দেখা যায় না। বাসস্ট্যান্ডে বাজারের সমস্ত কোলাহল থেমে গেলে যখন ঝমঝম করা চায়ের দোকানটা পর্যন্ত খালি হয়ে যাওয়ায় দোকানদার উঠে বন্ধ করতে যায় তখন আস্তে আস্তে ওঠে মুন্না। সারাদিন পাম্পহাউজ আর সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ডে বসে থাকার পরও কেউ তার খোঁজ নিতে আসে না দেখে একটা অভিমান তার বুক থেকে গলা পর্যন্ত পাকিয়ে ওঠে। না আব্বা, না বিটুমামা, না বিথী, না ছবি, কেউ না। তবে মুন্না হারিয়ে গেলে তাদের কিছু যায় আসে না? মুন্না কি ছবিকে ভালোবাসে?
- তুই ছবিক্ খুব পছন্দ করিস, না ভাইয়া?
বিথী বলেছিল একদিন। আর ছবি?
- ছবি কলাম তোক্ খুব পছন্দ করে।
এও বিথীর কাছেই শোনা। আর এখনও সে যে সাইফুলকে খোঁজার ছুতা করে মাঝেমধ্যে ছবিদের বাসায় যায়, সেতো ছবির জন্যই। ছবি তা বোঝে কই? বলে, ভাইয়া এখনও ফেরেনাই। তাকি আর মুন্না জানে না? সাইফুলকে ওরা যে ওর সামনেই ছুরি মেরে মেরে একসময় মেরেই ফেলল। কী রক্ত? এত রক্ততো আর কোনোদিন দেখেনাই মুন্না।
মুন্নার জন্যইতো! জয়নগরের সাথে খেলায় দুইগোল দিল সাইফুল একাই, হেরে গিয়ে গেদু আর চম্পক ঝগড়া করতে এল। এই মারেতো সেই মারে করে ঝগড়া করতে এল, তা গায়ে না মেখে চলে এলেইতো হত। এইতো, এই ব্রিজের উপরইতো। সাইকেলে করে ফিরছিল সে আর সাইফুল। আশ্চর্য! সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ড থেকে মুন্না কখন ব্রিজের উপর চলে এসেছে? তবে কি মুন্না বাড়ি ফিরে যাচ্ছে? কিন্তু কেউতো তাকে নিতে আসেনাই, সে নির্লজ্জের মতো একাই ফিরবে? কিন্তু মুন্নাতো ভাবছে সাইফুলের কথা। এইতো এই ব্রিজের উপর সেদিন গেদু আর চম্পকের সাথে তাদের ঝগড়ার কথা। মুন্না খুব রেগে রেগে জবাব দিচ্ছিল ওদের কথার আর সাইফুল বারবার মুন্নার জামার হাতা ধরে টানছিল, 'চল চলে যাই'।
- চলে যাই মানে? লজ্জা করে না তোর?
মুন্নার অাঁচানো কথাটা শুনে সাইফুল একবার তাকায় মুন্নার দিকে, তারপর 'উরি শালারে!' বলে সোজা গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গেদু আর চম্পকের উপর। মুন্না বাধা দেবার আগেই। মুন্না এতটা চায়নাই, কিন্তু আবার কিছুই না বলে চুপচাপ সরে পড়তেও চায়নাই। তা ওদের কাছে যে কোমরেগোঁজা ক্ষুর ছিল তা কি আর জানত ওরা? না মুন্না, না সাইফুল, কারোরই কি আর জানা ছিল? সাইফুলের পেট ফালাফালা করে দিল ওরা, তারপর ব্রিজ থেকে সাইফুলকে নিচে ফেলে দৌড়, সেদিনওতো এমনই সন্ধ্যা। সেদিনও কেউ ছিল না রাস্তায়। টাকিমাছের খোবলানোর মতো করে সাইফুল এই ক্যানেলের কোমরজলে খোবলায়, আর যখন তার মুখ ভেসে ওঠে পানির উপর, তখনই কেবল এক বিকট চিৎকার শোনা যায়, আর বাকিসময় কেবল জলের খলবল শব্দ। সাইফুল কি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে জলের ভেতর? হঠাৎ সচকিত হয় মুন্না, বহুবছর পর তার ঘোর ভাঙে আর সে সাইকেলটা ব্রিজের উপর দড়াম করে ফেলে দৌড়ে নেমে যায় ক্যানেলের পানিতে। কাদা আর রক্তে মাখামাখি সাইফুলকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে আসে ব্রিজের উপর। ক্যানেলের কোমরপানিতে আর কত জল, তারচেয়ে সাইফুলের রক্ত বেশি। স্ট্যান্ডের উপর সাইকেলটা কোনোমতে দাঁড়া করিয়ে কেরিয়ারে সাইফুলের পেট রেখে দুইপাশে শরীরের বাকি অংশ ঝুলিয়ে দেয়, অনেকটা নিস্তেজ হয়ে গেলেও তখনও বেঁচে ছিল সে। সাইকেলে উপর কি আর থাকতে চায়, পিছলে পড়ে যায়। কিভাবে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল তা এখন আর বোঝানো সম্ভব নয়, শুধু সাইফুল এরইমধ্যে একবার বলেছিল, 'মুন্নারে! মা আর ছবিক্ দেহিস'।
ব্রিজের নিচে প্রায় শুকনা ক্যানেলের তলায় জমে থাকা সামান্য গোড়ালিজল সন্ধ্যার বাতাসে থিরথির করে কাঁপে। ব্রিজের রেলিং থেকে ঝুঁকে পড়ে সেই জলের কাঁপন দেখতে থাকে মুন্না। খুনে দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। সেই দৃষ্টিতে সে ক্যানেলের জলকে দায়ী করে সাইফুলের মৃতু্যর জন্য। আর ভাবে, তার চাউনি এমন কেন? মা'র হাত পর্যন্ত কেটে দিয়ে এল আজ। সে এমন কেন? তার চোখ এমন কেন?
কিন্তু তার দোষ কী? মা একটা করে লাউয়ের বড় টুকরা নিচ্ছিল আর সেই টুকরাটা মা'র হাতের নিচে বটির উপর কেমন দ্রুত ছোট হয়ে আসছিল, আর একসময় শেষ হয়ে যাচ্ছিল পুরা লাউয়ের টুকরাটা, ঠিক যাদুমন্ত্রের মতো। সে খুব মজার একটা দৃশ্য, কেউ কখনও বুঝবে না। সে ঠিক জানে, সে যদি কাউকে বলে, খুব খেয়াল করে তাকিয়ে দেখ, ধর মা নাই, বটিও নাই, নিচে গামলা নাই, শুধু একটা লাউয়ের টুকরা, আস্তে আস্তে কেমন ছোট হয়ে যাচ্ছে, সেতো মা'র হাতের দিকে নয়, বটির দিকেও নয়, সবকিছু বাদ দিয়ে স্রেফ লাউয়ের টুকরাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে চাইছিল, মা আর বটিকে বাদ দিয়ে শুধু লাউয়ের টুকরা দেখা এত সহজ নয়, একারণেই তাকে খুব তীক্ষ্ন করে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছিল। আর তখনিতো মার হাত কেটে গেল। কেন হল? তার চোখের জন্য? তার খুব ইচ্ছা করছিল মা'র হাতটা ধরে কেঁদে ফেলে। অথচ মা! মা খুব নিষ্ঠুর! মা কেন তবে লক্ষ্মীছাড়া বলল? আমার চোখ তবে কানা হয়ে যাক। ভস্ম হয়ে যাক।
মুন্নার চোখ দিয়ে জল গড়ায়। মুন্না জানে তার মা কখনও এরকম নয়। তার চোখ কানা হয়ে গেলে মার কত কষ্ট হবে? কিন্তু তবু মা কেন তাকে লক্ষ্মীছাড়া বলল? তার কী দোষ?
চারপাশে তাকায় মুন্না। দেখে রাস্তায় একটা লোক দূরে থাক, একটা কুকুরও নাই। সবলোকতো বাসায় চলে গেছে, তাতো যাবেই। এইযে মুন্না সকালেও খায়নাই, দুপুরেওতো খায়নাই, বাসার সবাই নিশ্চয়ই ঠিকই খেয়েদেয়ে বসে আছে, রান্না কি আর আজ হয়নাই বাসায়, ঠিকই হয়েছে, সবকিছুই ঠিকমতো চলছে, শুধু মুন্নাই নাই বাসায়। এইযে সন্ধ্যা হয়ে গেল, কই তাকেতো কেউ আর খুঁজতে আসলো না। সেতো আর এমন কোথাও যায়নাই যে কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। মুন্নার ক্ষুধা লাগলেই কী আর না লাগলেই কী? এইতো পরশুদিনইতো, নাকি অন্য কোনোদিন, যাইহোক, বিথীর স্কুল থেকে আসতে দেরি দেখে মা'র কী চিন্তা? সবার খাওয়া হলে মা খেতে বসতে গিয়েও বলল, থাক বিথী আসুক, তারপরে খাবনে। আর আজ আমার বেলা? সবাই ঠিকই খেয়েদেয়ে বসে আছে, হয়ত ঘুমিয়েও গেছে, আব্বা বোধহয় এতক্ষণে নারায়ণগঞ্জে পেঁৗছেও গেছে। আর বিটুমামাও বের হয়ে গেছে, ফিরবে সেই রাত নয়টা-দশটায়। মুন্না বিছানায় নাই দেখেও হয়ত একটুও অবাক হবে না, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই চুপচাপ খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। ছবি কী করছে? আর সাইফুল? সাইফুল থাকলে হয়ত দুইজনে মিলে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়া যেত নিরুদ্দেশে, মুন্না শুধু পেছনে বসে থাকত। সাইফুল এত জোরে চালায়! চাকার নিচে পিচের রাস্তা শুধু কেমন শোঁ শোঁ শব্দ করতে থাকে। আর কিছু শোনা যায় না।
- পারবি? ওহানথেন লাফ দিবের পারবি?
মুন্নার একটা জেদ চেপে যায়। তার চ্যালেঞ্জে সাইফুল যদি চম্পকদের উপর কোনো দ্বিধা না করে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, তবে এই সামান্য ব্রিজের উপর থেকে লাফ দেয়া এমন আর কী? সাইফুল খুব বীর, খুব বাহাদুর, মুন্না কি আর কম? সেও পারে। কিন্তু তবু মা'র জন্য তার মন কেমন করতে থাকে।
রেলিংয়ের উপর চড়ে বসে মুন্না। দুইপাশে তাকিয়ে দেখে কেউ তাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যেতে আসল কিনা, তারপর সাইফুলের ডাকে সাড়া দিয়ে আলগোছে শরীরটা ছেড়ে দেয়। নিচে পড়তে পড়তে সে পাম্পহাউজের দিক থেকে একটা গুমগুম আওয়াজ শুনতে পায়। আজতো শনিবার। আজইতো ক্যানেলে পানি ছেড়ে দেবার কথা। ব্রিজের নিচে প্রায় শুকনা মাটিতে পড়ার ঠিক আগে মুন্না দেখতে পায় পাম্পহাউজের দিক থেকে টনকে টন পানি গমগম হমহম করতে করতে ধেয়ে আসছে। ঝমঝম করতে করতে আসছে। মুন্নার মনে হয়, ইস্! আর একটুপরে লাফ দিলে ঐ শীতল জলে পড়ে অনেকদূরে ভেসে যেতে পারত সে। এখনও সে ভেসেই যাবে। তবে তখন যেত মুন্না নিজে, সাঁতরে সাঁতরে, ভাসতে ভাসতে, সবকিছু দুইচোখ ভরে দেখতে দেখতে আর এখন যাবে মুন্নার নির্জীব শরীর। দুইচোখ দিয়ে এখন আর সে কিছুই দেখবে না।
Saturday, February 9, 2008
পুরুষ
জানালার বাইরে থেকে ছোট্ট মেহগনিগাছটার নতুন কলাপাতাসবুজ রঙের পাতায় পিছলে আসা রোদ সারাঘরে একটা হালকা সবুজ আভা তৈরি করে। কেবল আভা নয়, বরং সে আলো অনেকটা রোদের আদল পায়, তবে আলোটা রোদের মতো করে জানালাপথে এসে মেঝের দিকে না গিয়ে ছাদে জানালার লম্বালম্বি ছয়টি আর আড়াআড়ি দুইটি শিকের অস্পষ্ট ছায়া ফেলে। যে জানালা দিয়ে এই মিহিন সবুজ আলো আসে সেই জানালার দিকে মাথা দিয়ে শুয়ে শিপন ভাবে, মেহগনির একটামাত্র নতুন কোমল পাতায় পিছলে আসা অস্পষ্ট আলোর আভা জানালার শিকের এত স্পষ্ট ছায়া ফেলতে পারে কিভাবে। আর এরকম সময় যখন ছাদের গায়ে ফুটে ওঠা জানালার শিকের অস্বাভাবিক মোটামোটা আবছায়াগুলো দুলে ওঠে, ভেঙে যায়, তখন শিপন বুঝতে পারে আলোটা মেহগনির পাতা থেকে পিছলে আসা নয়, এ আলো তারও পেছনে ঝিলের জলে খাঁ খাঁ করা দুপুর রোদের প্রতিফলন। শিপন আস্তে আস্তে উঠে বসে, আর অবাক হয়ে দেখে তার মাথা শূন্য, কোনো বোধভাবনা তার ভেতরে কাজ করে না। অনেক চিন্তা করতে চায় সে, কিন্তু তার যেন ছাদের গায়ে ফুটে থাকা জানালার শিকের ভেঙে যাওয়া প্রতিচিত্রটি দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নাই, অন্তত তার আর কিছু মনে আসে না।
মাথাটা একটু তুলে পাশে উপুর হয়ে শুয়ে থাকা রুহির দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় শিপন, হালকা নিশ্বাসের সাথে সাথে ওর পিঠ ওঠানামা করে। বালিশের উপর রুহির এলোমেলো চুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, দেয়ালের দিকে ফিরে শুয়ে থাকায় ওর মুখ দেখা যায় না, সেখানে এখন কী অভিব্যক্তি তা জানার কৌতুহল হলেও শিপন মুখ এগিয়ে নিয়ে রুহির মুখটা দেখার সাহস করে উঠতে পারে না। আসলে সাহস নয়, শিপন ভাবে, তার দেখার কোনো ইচ্ছা তৈরি হয় না। আসলে ইচ্ছাও নয়, তবে কী? তাও কি ঠিকভাবে নিজেই বুঝে উঠতে পারে শিপন? রুহির চোখ খোলা, না বন্ধ? শিপন যেমন ছাদে সবুজ আলোর খেলা দেখে, রুহি কি তা লক্ষ করে? রুহি হয়ত অন্যকথা ভাবে, অন্য কোনোকথা। রুহি হয়ত শিপনের ওপর খুব বিরক্ত, রুহি তবে ছাদের গায়ে ভেঙে যাওয়া ছবি, ভেঙে যাওয়া জল, ভেঙে যাওয়া গল্প, ভেঙে যাওয়া জলের ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যাওয়া গল্প দেখেনাই, দেখতে পারেনাই। এরকম করে ভেঙে যায় শিপন, সবকিছু ভেঙে যায়।
রুহি বরঞ্চ খুব গোছানো, সবকিছু গুছিয়ে করে, গুছিয়ে কথা বলে, শুনলে মনে হবে সে আগেই ভেবে রেখেছে এই এই শব্দগুলো বেছে বেছে বলবে। রুহি অনেকবার চিন্তা করে করে তারপর একসময় সিদ্ধান্ত নেয়, কোনোকিছু ভুল হলে, সামান্য অন্যরকম হলে খুব আহত হয়। রুহি খুব একমুখী। তা একমুখী কথাটার হয়ত অন্যকোনো অর্থ থেকে থাকতে পারে, তবে রুহির একমুখিতা হল, সে এখন ছাদের গায়ে ভেঙে যাওয়া কলাপাতাসবুজ আলোচিত্র দেখবে না, এখন রুহি বরঞ্চ ভাববে, আজ তার জন্মদিনে তারা হয়ত সদরঘাট থেকে মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত একটা লঞ্চটু্যর দিয়ে আসতে পারত, অথবা ট্রেনে করে চলে যেতে পারত ময়মনসিংহ, অনেককথা বলতে বলতে, অনেক বাদাম খেতে খেতে, আজ রুহির জন্মদিনটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে মুখর, সবচেয়ে স্মরণীয় করে রাখতে পারত তারা, অথচ তারা কেন সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু শুধু মধুবাগের ঝিলের পাশে শোয়েবের খালি বাসায় এসে এখন মন খারাপ করে শুয়ে আছে। শোয়েবকে ঘণ্টাদুয়েকের জন্য বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে তবে তাদের কী লাভ হল?
অথচ এতকিছুর পরও ছাদের গায়ে কলাপাতাসবুজ জলছবি দেখে নিজের অজান্তেই ভুল করে ভুল সময়ে খুশি হয়ে যায় শিপন, আর খুশি হয়ে যায় বুঝতে পেরে তার মন খারাপ লাগে। রুহি কিন্তু এই জলছবি, এই ভেঙে যাওয়া জলের গল্প দেখে না, এসব যে রুহি কখনও দেখে না তাও নয়, তবে অন্য কোনোদিন, অন্য কোনোসময় হলে এইরকম তুচ্ছ কোনো ছবি, বা ছবির গল্প হয়ত রুহিই দেখাত শিপনকে, বাচ্চাদের মতো খুশি হয়ে শিপনকেই হয়ত হঠাৎ অনেকখানি ভালোবেসে ফেলত রুহি। তবু রুহি খুব খুঁতখুঁতে, রুহির খুব জেদ, রুহি খুব যখনকার তা তখনকার হিসাবের, একের সময় অন্যের দিকে তাকানোর মতো মেয়ে রুহি নয়।
এইতো, আজকের মিছিলটাও খুব জরুরি ছিল, বিল ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মিছিল, শুনে রুহি রাগ করে। তার কথা হল, একদিন রুহি কিংবা শিপন মিছিলে না গেলে সাম্রাজ্যবাদের কিছুই হয় না, কিংবা তারা মিছিলে গেলেও ক্লিনটনের সফর রদ হয় না। কিংবা মিছিল হয়ত বাদই দেয়া গেল, এখানে আসার সময়ইতো, মগবাজার বাসস্ট্যান্ডে সোহেলের সাথে দেখা শিপনের, সেই কবে কলেজ ছেড়েছে, তারপর আর দেখা হয়নাই, পাপ্পু বা বিজয়রা এখন কে কোথায় আছে, কী করছে, এসব বিস্তারিত জানার খুব বেশি আগ্রহ যে শিপনের আছে তাও নয়, তবু অতদিন পরে সোহেলের সাথে দেখা হয়ে গেলে কিছু জিজ্ঞেস করতেতো হয়, তাতেও রুহি রাগ করে কেন? রুহির কেন মনে হয় যে সময় নষ্ট করছে শিপন, তা সে কি আর ইচ্ছা করে সময় নষ্ট করতে চায়? তাতো চায় না, সামান্য সৌজন্য না দেখালে সোহেল কী ভাববে? তবু রুহি এরকমই।
অবশ্য রুহির রাগ যে খুব অন্যায্য তাও নয়, রুহির মতো শিপনও জানে শোয়েব দুইটার মধ্যে এসে পড়বে, আর শোয়েব আসার আগ পর্যন্তই কেবল বাসাটা শুধু তাদের দুইজনের। তাছাড়া আসাদগেট বাসস্ট্যান্ডে আসতেওতো শিপনই দেরি করেছে, রুহিতো আর দেরি করেনাই। তা সবমিলিয়ে একটার আগেতো আর তারা মগবাজার আসতে পারেনাই, তাও আসার পথে যদি সোহেলের সাথে কথা বলেই সে সময় কাটায়, আবার সোহেলকে অনর্থক চা খাওয়ানোর জন্য পিড়াপিড়ি করে, তবেতো রাগ রুহি করতেই পারে।
রুহি কি এখন কিছু ভাবছে? নাকি তারও ভাবার সব ফুরিয়ে গেছে। এরকম ফুরিয়ে যায় কিন্তু। একেকসময় মনে হয় চিন্তা করার ব্যাপারটা উইন্ডোজের মতো হলে ভালো হত_ এখন এই বিষয়টা ভাবতে ভালো লাগছে না, তো বন্ধ করে রাখলাম, এখন চিন্তা করা দরকার, তো চালু করে দিলাম। খুব খারাপ কিন্তু হয় না। শিপন তাহলে সেই কবে না কবেকার স্কুলে যাবার সময়কার কথা আজ ভুলে থাকতে পারত, ভুলে থাকা কী, সেকথা আজ মনেই বা আসতে যায় কেন? সেই সেদিন বাসের মধ্যে যা ঘটেছিল, সেই দগদগে ঘা আজ কেন শুধু শুধু সবকিছু কেড়ে নেয় শিপনের কাছ থেকে, এত সাধ করে করা সব আয়োজন কেন সেটা ভেঙে দিয়ে যেতে পারে, আজ কেন শিপনের সেইসব কথা মনে আসতে হবে। সেইদিনইতো মা কত জোরাজুরি করল, তবু সেতো বলেনাই। মা কেন, কাউকেইতো বলেনাই। তবে? আজ কেন?
রুহির সাথে কতদিন কথার অভাবে বসে বসে শুধু তার হাতধরে কতসময় কাটিয়ে দিয়েছে শিপন, মনে হয়েছে, তবে কি সবকথা শেষ? কতকথা বানিয়ে বলতে গিয়ে সে থমকে গেছে, মনেমনে লজ্জাও পেয়েছে, তবে কি কথা সব শেষ? তাহলে সারাজীবন আর তারা কথা বলবে না? খুব হাঁপ ধরে আসে সেসবকথা মনে করতে গেলে। তবু সেসবদিনে কই, এই কথাটাতো কোনোদিন মনে পড়েনাই? হাতধরে বসে থেকে তারা একে অপরকে বুঝেছে, সপর্শ নিয়েছে, তারপরে আবার কোথা থেকে কথা জুটেছে, বিদায় নেবার সময়তো কথা আর শেষই হতে চায় না।
কী সব আবোলতাবোল ভাবে সে। ভাবুক শিপন, আবোলতাবোলই ভাবুক, আর করবে কী তবে সে? আসলে এখন কোনোকিছু আর তার নিয়ন্ত্রণে নাই, যে কোনোরকম একটা শেষের জন্য এখন কেবল অপেক্ষা করা। হয়ত সেই শেষ আজ দুপুর দুইটা পর্যন্ত, তবু অপেক্ষা আর কতক্ষণ করা যায়, রুহি কিছু বলুক অন্তত।
মিন্টুই একদিন প্রথম বলে, 'চল আজ ডিআইটি রোড থেকে বাসে করে স্কুলে যাবো'। বাসে নাকি চারআনা করে নেয়। তাহলে দুইজনে আটআনা, রিক্সায় গেলে একেকজনের লাগত বারোআনা করে, তাহলে বাকি একটাকায় সিরাজ ভাই'র দোকান থেকে একছটাক করে নকূলদানা, কিংবা সক্রেটিস বা প্লাতিনির দুইটা ভিউকার্ড কেনা যায় অনায়াসে। মিন্টুর অনেক সাহস, তা সাহসতো হবেই, মিন্টু একদিন হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরলেও মিন্টুর আব্বা বা আম্মা কিছু বলে না, মরিয়মের মাকে ফাঁকি দিলেও কিছু বলে না। মরিয়মের মা বলে মিন্টু নাকি গোল্লায় যাবে, কিন্তু আমার কাছে মিন্টুর আব্বা আর আম্মাকে অনেক ভালো লাগে, ওর আব্বা আর ও রাতজেগে হৈচৈ করে খেলা দেখে, নীতারা থাকতে মাঝেমধ্যে নীতার আব্বা আর ওদের মিলনমামাও মিন্টুদের বাসায় যেত খেলা দেখতে, খালাম্মা চানাচুর মাখানো মুড়ি খেতে দিত সবাইকে। আর আমাদের বাসায়! রাত নয়টার পর টিভি দেখা বন্ধ, খেলাতো আর নয়টায় হয় না, হয় সেই রাত বারোটায়, একটায়, আড়াইটায়, তা মিন্টুরাতো ঠিকই দেখে। বরঞ্চ ওর আব্বার সাথেই বসে বসে টিভি দেখে। আমার খুব মিন্টুদের বাসার কোনো একজন হতে মন যায়, হয়ত মিন্টুর ভাই হতে ইচ্ছা করে। দুইভাই একসাথে স্কুলে যেতাম, ভাগাভাগি করে ভিউকার্ড কিনতাম, আর সেসব ভিউকার্ড তখন লুকিয়েও রাখতে হত না। মিন্টু কত মজা করে সবাইকে ভিউকার্ড দেখায়, কই ওর আব্বাতো এর জন্য কখনও তার কান মলে দেয় না। ওর আব্বা বরঞ্চ সবাইকে আরও গল্প করে, ওই পুচকে মিলনের কাছে পর্যন্ত মিন্টুর জন্য পেলে'র ভিউকার্ড চায় খালুজান। আর শিপনকে কিনা ভিউকার্ড তোষকের নিচে লুকিয়ে রাখতে হয়, রোদে দেয়ার জন্য সেই তোষক উল্টে ভিউকার্ড পেয়ে মা তার কান মুচড়ে ছিঁড়ে দিতে চায়।
অথচ এসব ভাবতাম বলে, এইরকম আবোলতাবোল ভাবতাম বলে মাঝেমাঝে খুব লজ্জাও লাগত, তা আবোলতাবোলইতো, একবাসার মানুষ কি আর অন্যবাসার কারও ভাই হতে পারে? আমিতো এই বাসার, পচামার্কা একটা বাসার একজন হয়েই গেছি। একবার একবাসার কেউ হয়ে গেলে কি তা আর বদলানো যায়?
উকিলপাড়া থেকে জামতলা, তা পায়ে হেঁটে গেলে পোনে একঘণ্টাতো লাগবেই, কোনো কোনো সময় তার থেকে দশমিনিট বেশিও লাগে। আমরা রিক্সায়ই যেতাম, আমাদের বাসার মরিয়মের মা'র দায়িত্বে আমি, মিন্টু ছাড়াও নীতা, আর নীতার ভাই চিকুর একটা রিক্সায় গাদাগাদি করে যেতাম। নীতারা ময়মনসিংহ চলে যাবার পর আমি আর মিন্টু সেইযে একদিন প্রথমবার বাসে চড়ার এডভেঞ্চার করেছিলাম তা কিন্তু মিন্টুরাও চলে যাবার পর বজায় রেখেছিলাম। বাসায় কখনও বলিনাই, বাসে গিয়ে রিক্সাভাড়া বাঁচিয়ে কতকিছু করা যায়! তা কেন বলতে যাব শুধু শুধু? তাহলেতো মা ঠিক পরদিন থেকে সাথে মরিয়মের মাকে পাঠাত।
সেদিন একা একা উকিলপাড়া থেকে বের হয়ে ডিআইটি রোডের যাত্রীছাউনিটার নিচে এসে দাঁড়ায় শিপন। মরিয়মের মাকে সাথে দিয়ে দেয়ার চেষ্টা অনেক কষ্টে কাটিয়ে দিয়ে এমনকি মরিয়মের মাকে রিক্সা ডেকে দেয়ার দায়িত্ব থেকে পর্যন্ত রেহাই দিয়ে একা একা বের হয় শিপন। একটা করে বাস আসে যায়, কোনোটাতে চড়ার সাহস হয় না, কিজানি লোকে যদি জিজ্ঞেস করে বসে কেন রিক্সায় যাচ্ছে না সে, তার কী জবাব দেবে?
তা, জবাব দেয়া আর কী এমন শক্ত_ বলবে, সেতো বাসেই যায়। রিক্সায় যাবার সামর্থ্য যে তাদের নাই, তারাতো গরিব। তবে মিন্টু থাকতে কিন্তু এতকথা ভাবতে হয়নাই। মনেও আসেনাই। মিন্টুতো হড়বড় করে কথা বলতে বলতে বাসে ওঠে। এমনকি মাঝেমাঝে কন্ট্রাকটারের সাথে ঝগড়াও করে ভাড়া বেশি চাইলে।
কিন্তু কোনো পরিচিত লোকের সাথে যদি দেখা হয়ে যায়? আর শিপনের মনে হয় বাসস্ট্যান্ডের সবলোক শুধু তার দিকেই তাকিয়ে আছে, তারা কেউ যদি আব্বার চেনা হয়, এখন তাকে কিছু না বলে যদি শুধু গোপনে আব্বার কাছে গিয়ে বলে দিয়ে আসে। কত চিন্তা করতে হয় শিপনকে, ঠিক-বেঠিক, প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়, চিন্তা করতে করতেইতো শিপন অবাক হয়ে দেখে, সে কখন তাদের স্কুলের কাছে চলে এসেছে, আর এতক্ষণ এই প্রায় একঘণ্টা ধরে হেঁটে হেঁটে আসার কারণে প্রথম পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে। বাসায় ঠিক নালিশ চলে যাবে। তা আজ যদি বাসে উঠতে সে ভরসা নাই পায় তাহলে রিক্সায় আসল না কেন সে? অন্যদিন, অন্য কোনোদিন সে বাসে আসতে পারত, শিপনের খুব কান্না পায়, সে এরকম কেন? আর সবারতো এত চিন্তা করতে হয় না। আকাশপাতাল চিন্তা করে করে সে সব ভুল করে ফেলে কেন?
তা বাসে ওঠার অভ্যাস সে ঠিকই একদিন তৈরি করে ফেলে, বাসায় ফেরার সময় শুধু রিক্সায় যায়, বাসার গেটের সামনে নেমে ভাড়া দেয়, কেউ কিছু বুঝতে পারে না। কিন্তু এত লুকাছাপা, সামান্য বাসে চড়তে পারার আধঘণ্টার স্বাধীনতা, সেটাও সেদিন মিছমার হয়ে যায়। সেই বাসে চড়তে গিয়েই, হতচ্ছাড়া বাস! কুত্তা বাস! সেই শিউলি পরিবহন!
বাসা থেকে বের হতে শিপনকে একটু তাড়াহুড়া করতে হয় আজকাল, মা সন্দেহ করে, স্কুলে যাবার এত তাড়া কেন, আগেতো কোনোদিন এরকম দেখিনাই, তবু মা হয়ত খুশিই হয়, কারণ শিপন বলে, একটু তাড়াতাড়ি না গেলে প্রায়ই রেলগেটের সিগন্যালে আটকে পড়ে, সেখান থেকে বের হতে অনেক সময় লাগে, আর প্রথম পিরিয়ডে বেশিরভাগ দিনই দেরি হয়ে যায়, আর প্রথম পিরিয়ডের জয়নাল স্যারকেতো চেন না? মেরে হাড্ডি ভেঙে দেয়_ এসব কথা শুনে মা হয়ত খুশিই হয়।
তা আজ সহজেই বাসে চড়তে পারে শিপন, যদিও যাত্রীছাউনিতে এসে দাঁড়ানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই শিউলি পরিবহন নামের যে বাসটা আসে সেটাতে অনেক ভিড় দেখে দমে যায় শিপন, অথচ আজ একটু তাড়াতাড়ি যেতেই হবে, কালও জয়নাল স্যার ধমকে সাবধান করেছে তাকে, বলেছে, 'প্রতিদিন তোরই দেরি করতে হয়? কই, আরতো কারও দেরি হয় না? বাসায় বাজার করে দিয়ে তারপরে আসিস তুই, তাই না? বিয়ে করেছিস'? এইসব খারাপ করে করে কথা বলে জয়নাল স্যার। তা সেজন্য তাড়াহুড়া তাকে আজ করতেই হয়।
- কী যাবা না?
পিঠে কার হাত পড়তে ভীষণ চমকে ওঠে শিপন, এই বুঝি ধরা পড়ে গেল, ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখে, একজন লোক, তার আব্বার চেয়েও বয়সে বড় হবে, তাকেই বলছে, সে যাবে কিনা। তা যাবেতো শিপন, কিন্তু এই ভিড় ঠেলে কি আর সে উঠতে পারে। আশ্চর্য ব্যাপার লোকটা তাকে উঠতে সাহায্য করে, আর সব লোকদের ঠেলে তাকে শিউলি পরিবহনে উঠিয়ে দেয়, নিজেও ওঠে। বাসে উঠেও লোকটা শিপনকে ধরে রাখে, শিপনের পেছনে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একহাতে শিপনকে পেঁচিয়ে ধরে রাখে, শিপনের হাসি পায়, সেকি আর পড়ে যাবে নাকি? লোকটা এত বোকা কেন?
কিছুক্ষণের মধ্যেই শিপন বুঝে ফেলে লোকটা কিন্তু বোকা নয়_ উকিলপাড়া থেকে জামতলা দুইটা মোটে স্টপেজ, জামতলা পর্যন্ত যেতে পনেরমিনিট মতো লাগে, এই পনেরমিনিটের মধ্যেই শিপনের কাছে প্রমাণিত হয়, লোকটাকে যতখানি বোকা আর যতখানি ভালো ভাবা গিয়েছিল, লোকটা তার কিছুই নয়, লোকটা তবে কী, কিজানি, শিপন বলতে পারে না।
বাসের মধ্যে লোকটার জড়িয়ে ধরে থাকা যখন একসময় শিপনের কাছেই অসহ্য হয়ে উঠতে শুরু করে, লোকটার হাত যখন শুধু শিপনকে পেঁচিয়ে ধরে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, হাতটা যখন আরও সক্রিয় হয়ে উঠে আস্তে আস্তে নিচের দিকে নেমে শিপনের প্যান্টের ভেতরে ঢুকে যায়, তখন শিপন ঐ প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যেও তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চেষ্টা করতে থাকে। আর তার নড়াচড়া করা দেখে_ লোকটা কি বদমাশ! আবার নরমস্বরে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, 'নড়ো না খোকা, পড়ে যাবেতো!'
- তুই ছাড়! আমাকে ছাড়! কুত্তা! ছাড়!
মনেমনে গাল দেয় শিপন। আর অবাক হয়ে দেখে লোকটা তার প্যান্টের বোতাম খুলে ফেলে। সে কি চিৎকার করে বাসের লোকদের বলে দেবে? কিন্তু প্যান্টের বোতাম খুলে ফেলা যে বড় লজ্জার, তা সে বাসের লোকদের বলে কেমন করে, লোকটা তার নুনু ধরে নাড়াচাড়া করতে থাকে। আর অন্যদিকে শিপনের বামহাত নিয়ে লোকটা তার নিজের পায়জামার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়, তার হাতে ধরিয়ে দেয় তার শক্ত হয়ে ওঠা পৌরুষ। শিপনের ঘেন্না করে খুব, প্রাণপণে সে মোচড় দিয়ে দিয়ে সরে আসার চেষ্টা করে, আর লোকটা সাথেসাথে শিপনের নুনু ধরে মোচড় দেয়, ব্যথায় শিপনের চোখ দিয়ে দরদর করে জল গড়ায়, অথচ সেই জল লুকানোর জন্য সে নিজেই আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে লোকটা একবার কেমন শিউরে ওঠে, কেমন কেঁপে গিয়ে শিপনের বামহাতে গলগল করে তীব্র গরম আঁষটেগন্ধের বিষাক্ত পৌরুষ ঢেলে দেয়।
ঠিক তখনই জামতলা এসে দাঁড়ায় বাসটা। বাস থেকে নেমে একদৌড়ে স্কুলের গেট দিয়ে ঢোকে শিপন, চোখে কিছু দেখতে পায় না সে, কেবল অন্ধের মতো দৌড়ে স্কুলের মাঠ পার হয়ে পুকুরঘাটের দিকে যেতে চায় সে। মাঠ কি আর শেষ হতে চায়, মাঠতো কিছুতেই শেষ হয় না। একসময় পুকুরঘাটে আসতে পারে শিপন, হাত ধোয়, লালশানের ঘাটে ঘষেঘষে হাতের চামড়া তুলে ফেলে, তবুতো সেই গন্ধ, সেই বিষের মতো উষ্ণতা তার হাত থেকে চলে যায় না।
ঠিক সেদিনই জয়নাল স্যারের তাকে মারা চাই, 'দেরি করে আসলি কেন?' বলে যখন হাত পাততে বলে স্যার; তখন সেই কলঙ্কিত হাত সে কিভাবে স্যারের সামনে ধরে? সে শুধু ঘাড় গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকে, আর স্যারের সে কি রাগ! 'হাত পাতবি না? এতবড় সাহস! দাঁড়া বেতিয়ে তোর পাছার চামড়া আজ তুলে ফেলব। বেয়াদব কাঁহিকা!' মারুক, জয়নাল স্যার মারুক, আজ শিপন মরে যাক, এই পৃথিবীর কারওতো আর শিপনকে দরকার নাই, শিপন তাদের কে?
জানালা দিয়ে শিপন কেবল বাইরে তাকিয়ে থাকে, একসময় জয়নাল স্যারের মার শেষ হয়, একসময় স্কুল শেষ হয়, হেঁটে হেঁটে, নাকি রিক্সায়, নাকি বাসে, নাকি উড়ে উড়ে একসময় বাসায়ও চলে আসে সে। গোসল করে ভাত খেয়ে পড়তে বসলে জ্যামিতি বইয়ের সকল সর্বসাম্য উপপাদ্য মিথ্যা প্রমাণিত করে শিপনের চারপাশ থেকে উঠে আসে উদ্যত সব শিশ্ন। শিপন জ্যামিতি বইয়ের উপর তার হাত মেলে ধরে, হাত দুইটা ঘষেঘষে চামড়া তুলে ফেলেছে সে, লাললাল চাকাচাকা হয়ে আছে শিপনের কোমল হাতের তালু।
- কী হইছে হাতে?
পেছনে মার গলা শুনে মুহূর্তে বুঝতে পারে না শিপন হাত লুকিয়ে ফেলবে কিনা, তবে তার আগেই মা তার হাত ধরে ফেলে।
- একিরে, তোর হাতে কী হইছে?
- পড়ে গেছিলাম।
- পড়লি কেমনে?
- খেলতে গিয়ে ... -
ও তাহলে ছুটির পর বাসায় না ফিরে স্কুলেই খুব খেলা হচ্ছে, না? তাইতো বলি স্কুল থেকে আসতে সাহেবের এত দেরি হয় ক্যানো?
কানটা মুচড়ে দিয়ে আরও সব কী কী বলতে থাকে মা, তা আর শোনা হয় না শিপনের। শিপন বধির হয়ে যায়।
দুপুরে খেয়ে মা ঘুমালে চুপিচুপি বারান্দায় এসে রেলিঙে থুতনি রেখে শিপন নিচতলায় নীতাদের ছেড়ে যাওয়া বাসায় নতুন আসা বাচ্চাদের খেলা দেখে। ওরা কত হৈচৈ করে খেলে, ওদের কারওতো আর শিপনের মতো দুঃখ নাই। ওদের কারও হাততো আর কলঙ্কিত হয়ে যায়নাই। ওদের কারওতো আর এই শিপনের মতো মরে যেতে ইচ্ছা করছে না। ওদেরতো কেউ না কেউ ভালোবাসেই_ কম হোক আর বেশি। শিপন আজকে কী দোষ করেছে, সবাই যে ওকেই ধরে ধরে মারছে, জয়নাল স্যার কিছু না বুঝেই মারল, দেরিতো আজ সে আর ইচ্ছা করে করেনাই, তবে বুঝি হাত না ধুয়েই সে ক্লাসে আসবে? আর মাওতো খুব, এখনতো খুব ঘুমানো হচ্ছে, এই ঘুমানোর আগে ছেলেকে না মারলে তোমার বুঝি ঘুমই আসত না! শিপনের এত দুঃখ কেন_ শিপন কেন জন্মাতে গেল তবে_ না জন্মালে কী এমন ক্ষতি ছিল_ শিপনের গলায় এত ব্যথা কেন? শিপনের সামনে পৃথিবী ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে।
ফাঁকা হয়ে থাকা আকাশে অলসভাবে উড়তে থাকে চিল, চিলের ডানায় রোদ লেগে ঝকমক করে, পুরা আকাশটাই হয়ত ঝকমক করে। অতবড় আকাশের গায়ে আরও বিশাল এক দুপুর ফুটে থাকে বলে তাকে আরও মস্ত দেখায়। এই মস্ত দুপুরবেলা সবাইকে ফাঁকি দিয়ে শিপন তবে মরে যাক, অথবা চুপ করে কোথাও হারিয়ে যাক। সবার তখন খুব আনন্দ হবে তাহলে।
তা এসবকথা আজ রুহির জন্মদিনে শিপনকে কে মনে করতে বলে? হঠাৎ আজ এতবছর পরে কেন এসব ছাইপাশ মনে করা?
আজ শোয়েবের বাসায় পাওয়া বহুকাঙ্ক্ষিত দুইঘণ্টায় শিপন যখন জীবনে প্রথমবার রুহির কাছে তার সমস্ত শৈশব বিসর্জন দিয়ে পুরুষ হয়ে উঠতে যায়, তখনই সেই বাসের ভেতরকার এক অজানা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষাক্ত পৌরুষের স্মৃতি শিপনের সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। শিপনও তবে সেই লোকটির মতো পুরুষ? আর তখন সেদিনকার ছোট্ট শিপনের কথা মনে করে তার এই প্রথম জানা উত্থিত পৌরুষ, তার উদ্যত শিশ্ন সিঁটকে আসে। তাকে নিবৃত্ত হতে হয়।
একটা পরাজিত গলায় সে আস্তে করে রুহিকে ডাকে, রুহি উত্তর দেয় না। রুহি কি রাগ করেছে? নাকি শিপনের ডাক এত ক্ষীণ ছিল যে তা শুনতেই পায়নাই সে। তবে কি শিপন রুহিকে ডাকেনাই? নিঃশব্দ নিশ্বাসের সাথে সাথে রুহির পিঠ আরও নিঃশব্দে ওঠানামা করতে থাকে। রুহির পিঠের মাঝখানে একটা লালচে দাগ, দাগটাতে খুব আদর করে একটা চুমু দিতে ইচ্ছা করে শিপনের, কিন্তু স্থানুর মতো বসে থাকা তার সংবেদহীন শরীর সে ইচ্ছা কার্যকর করে না, অথচ সমস্ত পরাজয় আর অসহায়তা কাটানোর জন্য তার কোনো কথা বলা দরকার কিংবা একটা কিছু করা দরকার, অথচ শিপন কথাবলার মতো কোনো প্রসঙ্গ খুঁজে পায় না।
এইসব ভাবতে ভাবতেই একসময় ঘড়ির দিকে চোখ পড়ে শিপনের, এরই মধ্যে প্রায় দুইটা বেজে গেছে দেখে সে খুব ব্যথিত হলেও আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শোয়েবের মধুবাগের বাসা ছেড়ে দেবার অনিবার্যতা শিপনকে মনেমনে স্বীকার করতেই হয়, আর রুহিকে একথা জানাতে তার খুব দ্বিধা হয়, দ্বিধা হয় তার শৈশবের সবকথা খুলে বলতে।
আর সবার কত রঙিন না হোক, কত উজ্জ্বল শৈশব থাকে, সারাজীবন তারা সে শৈশবকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে মনে করে, সেইসব স্মৃতিময় শৈশব নিয়েই নাকি শেষবয়সে মানুষ বেঁচে থাকে। আর শিপনের বেলা?
ঝিলের জল থেকে পিছলে আসা রোদ আর জানালার শিকের দ্বন্দ্বে তৈরি হওয়া সবুজ আভার জলছবি ছাদ থেকে কখন অদৃশ্য হয়ে গেছে। ভাঙাগলায় আবারও রুহিকে ডাকে শিপন।
- রুহি! ওঠো, যেতে হবে।
রুহি হয়ত শিপনের ডাক এবার শুনতে পায়। রুহি ওঠে। আস্তে আস্তে কাপড় পরতে থাকে সে। রুহির মুখ দেখে কিছু বোঝা যায় না, রুহি শিপনের দিকে তাকায় না, লজ্জায় নাকি রাগ করে, তা বলার সাধ্য কি আর শিপনের আছে? শিপন শুধু শূন্যদৃষ্টিতে রুহির দিকে তাকিয়ে থাকে।
রুহি, তুমিতো সবকিছু জান না, আমার সবকথা তোমাকে একদিন ঠিক বলব, এতদিন বলিনাই, বলব কিনা বুঝতে পারিনাই, আর একি বলার মতো কোনো কথা যে খুব গল্প করতে হবে এসব নিয়ে? যেদিন বলব সেদিন তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে, কেন আমার আজ এরকম হল, তোমার শরীরের এত কাছাকাছি এসে, আমার পুনর্জন্ম হতে হতে কেন আমি মুহূর্তে সব হারিয়ে ফেললাম? এক পরিত্যক্ত শৈশবের কাছে আমার হার স্বীকার করতে হল, আমার মনে হল, তাহলে আমিও ঐ লোকটার মতো খারাপ, এটা কী তবে খারাপ নয়? এটা কী তবে স্বাভাবিক, আমিতো খারাপ নই, মন্দলোকতো আমি নই, মন্দ কি? বল না, তুমিই বল না, তুমিতো আমাকে কতদিন চেন_ এই তোমার চেয়ে আজ আর কে আমাকে ভালো চেনে, সেই ছোটবেলাকার বাসে চড়ে সেদিন এই শিপনের মরে যেতে ইচ্ছা করেছিল, অথচ আজ বাসের সেই বদমাশ লোকটার মতো করে আমারও ..., কিন্তু তবু কোথায় একটা পার্থক্য তার সাথে আমার নিশ্চয়ই আছে, আমি বুঝতে পারি, তুমিও নিশ্চয়ই পারবে।
রুহি অবাক হয়ে দেখে শিপনের চোখ দিয়ে জল গড়ায়, কাপড় পরতে শুরু করার সময় থেকেই রুহি না তাকিয়েও বুঝতে পারে তখন থেকেই শিপন তার দিকে একদৃষ্টে তাকানো। মানুষ এত তীব্র দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতে পারে? রুহি কয়েকবার চোখ সরিয়ে নিয়েছে শিপনের চোখ থেকে, রুহি রাগ করেনাই, মন খারাপ করেছে শুধু। মন খারাপতো করতে পারে রুহি। আজতো তার জন্মদিন, জন্মদিনেতো সে আরেকটু বেশি আশা করতে পারে, পারে না? রুহির মনে হয় পারে। তাছাড়া একি রাগ করার কিছু? আজ হয়নাই, আচ্ছা আরেকদিন হবে, শিপনের অমন তীব্র তাকিয়ে থাকা দেখে এইরকম কথা রুহির মনে হয়। রুহি দেখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শিপনের চোখ দিয়ে জল গড়ায়, শিপন কি কাঁদে? অনেক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে থাকলে যেকারো চোখে জল আসবে, তবু রুহির মনে হয় কাঁদে শিপন। রুহির খুব অনুশোচনা হয়, সে কেন এতক্ষণ মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে থাকল, সে যদি একটু হেসে কথা বলত, গল্প করত, যদি একটু সহযোগিতা করত তাহলে নিশ্চয়ই শিপন তার দিকে মনোযোগ দিতে পারত।
শিপনের তাকিয়ে থাকা আর সহ্য করতে পারে না রুহি, তার খুব কষ্ট হয়, ধীরপায়ে এগিয়ে এসে শিপনকে ধরে সে, আর মুহূর্তে শিপন কী ছেলেমানুষ হয়ে যায়, খাটের ওপর বসে থাকা নগ্ন শিপন আঁকড়ে ধরে রুহিকে, রুহির বুকের ওমের ভেতরে মুখ গুঁজে দিয়ে বিপুল কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিপনের পিঠে, চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে রুহি।
আর একসময় সমস্ত ভুলে গিয়ে, রুহির কাছে তার সকল শৈশব বিসর্জন দিতে দিতে শিপন বড় হয়ে যায়, পুরুষ হয়ে যায়। দুইটার সময় শোয়েব এসে দরজা বন্ধ দেখে, ডাকাডাকি করে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আবার ফিরে গেছে কিনা, তা শিপন কিংবা রুহির আর জানা হয় না_ মেহগনিগাছটার পাতায় পিছলে বা তারও পেছনের ঝিল থেকে প্রতিফলিত হয়ে যে আলো ঘরের ছাদে কলাপাতাসবুজ রঙের এক জলছবি তৈরি করেছিল, সেই আলো তার শেষ অবশেষটুকু পৃথিবীর গায়ে শেষবারের মতো বুলিয়ে দিয়ে নেমে গেছে কিনা তাও তাই তাদের আর জানা হয় না। আর সবদিনের মতো করেই আবার একটা অতি সাধারণ সন্ধ্যা নিঃশব্দে নেমে আসে।
মাথাটা একটু তুলে পাশে উপুর হয়ে শুয়ে থাকা রুহির দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় শিপন, হালকা নিশ্বাসের সাথে সাথে ওর পিঠ ওঠানামা করে। বালিশের উপর রুহির এলোমেলো চুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, দেয়ালের দিকে ফিরে শুয়ে থাকায় ওর মুখ দেখা যায় না, সেখানে এখন কী অভিব্যক্তি তা জানার কৌতুহল হলেও শিপন মুখ এগিয়ে নিয়ে রুহির মুখটা দেখার সাহস করে উঠতে পারে না। আসলে সাহস নয়, শিপন ভাবে, তার দেখার কোনো ইচ্ছা তৈরি হয় না। আসলে ইচ্ছাও নয়, তবে কী? তাও কি ঠিকভাবে নিজেই বুঝে উঠতে পারে শিপন? রুহির চোখ খোলা, না বন্ধ? শিপন যেমন ছাদে সবুজ আলোর খেলা দেখে, রুহি কি তা লক্ষ করে? রুহি হয়ত অন্যকথা ভাবে, অন্য কোনোকথা। রুহি হয়ত শিপনের ওপর খুব বিরক্ত, রুহি তবে ছাদের গায়ে ভেঙে যাওয়া ছবি, ভেঙে যাওয়া জল, ভেঙে যাওয়া গল্প, ভেঙে যাওয়া জলের ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যাওয়া গল্প দেখেনাই, দেখতে পারেনাই। এরকম করে ভেঙে যায় শিপন, সবকিছু ভেঙে যায়।
রুহি বরঞ্চ খুব গোছানো, সবকিছু গুছিয়ে করে, গুছিয়ে কথা বলে, শুনলে মনে হবে সে আগেই ভেবে রেখেছে এই এই শব্দগুলো বেছে বেছে বলবে। রুহি অনেকবার চিন্তা করে করে তারপর একসময় সিদ্ধান্ত নেয়, কোনোকিছু ভুল হলে, সামান্য অন্যরকম হলে খুব আহত হয়। রুহি খুব একমুখী। তা একমুখী কথাটার হয়ত অন্যকোনো অর্থ থেকে থাকতে পারে, তবে রুহির একমুখিতা হল, সে এখন ছাদের গায়ে ভেঙে যাওয়া কলাপাতাসবুজ আলোচিত্র দেখবে না, এখন রুহি বরঞ্চ ভাববে, আজ তার জন্মদিনে তারা হয়ত সদরঘাট থেকে মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত একটা লঞ্চটু্যর দিয়ে আসতে পারত, অথবা ট্রেনে করে চলে যেতে পারত ময়মনসিংহ, অনেককথা বলতে বলতে, অনেক বাদাম খেতে খেতে, আজ রুহির জন্মদিনটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে মুখর, সবচেয়ে স্মরণীয় করে রাখতে পারত তারা, অথচ তারা কেন সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু শুধু মধুবাগের ঝিলের পাশে শোয়েবের খালি বাসায় এসে এখন মন খারাপ করে শুয়ে আছে। শোয়েবকে ঘণ্টাদুয়েকের জন্য বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে তবে তাদের কী লাভ হল?
অথচ এতকিছুর পরও ছাদের গায়ে কলাপাতাসবুজ জলছবি দেখে নিজের অজান্তেই ভুল করে ভুল সময়ে খুশি হয়ে যায় শিপন, আর খুশি হয়ে যায় বুঝতে পেরে তার মন খারাপ লাগে। রুহি কিন্তু এই জলছবি, এই ভেঙে যাওয়া জলের গল্প দেখে না, এসব যে রুহি কখনও দেখে না তাও নয়, তবে অন্য কোনোদিন, অন্য কোনোসময় হলে এইরকম তুচ্ছ কোনো ছবি, বা ছবির গল্প হয়ত রুহিই দেখাত শিপনকে, বাচ্চাদের মতো খুশি হয়ে শিপনকেই হয়ত হঠাৎ অনেকখানি ভালোবেসে ফেলত রুহি। তবু রুহি খুব খুঁতখুঁতে, রুহির খুব জেদ, রুহি খুব যখনকার তা তখনকার হিসাবের, একের সময় অন্যের দিকে তাকানোর মতো মেয়ে রুহি নয়।
এইতো, আজকের মিছিলটাও খুব জরুরি ছিল, বিল ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মিছিল, শুনে রুহি রাগ করে। তার কথা হল, একদিন রুহি কিংবা শিপন মিছিলে না গেলে সাম্রাজ্যবাদের কিছুই হয় না, কিংবা তারা মিছিলে গেলেও ক্লিনটনের সফর রদ হয় না। কিংবা মিছিল হয়ত বাদই দেয়া গেল, এখানে আসার সময়ইতো, মগবাজার বাসস্ট্যান্ডে সোহেলের সাথে দেখা শিপনের, সেই কবে কলেজ ছেড়েছে, তারপর আর দেখা হয়নাই, পাপ্পু বা বিজয়রা এখন কে কোথায় আছে, কী করছে, এসব বিস্তারিত জানার খুব বেশি আগ্রহ যে শিপনের আছে তাও নয়, তবু অতদিন পরে সোহেলের সাথে দেখা হয়ে গেলে কিছু জিজ্ঞেস করতেতো হয়, তাতেও রুহি রাগ করে কেন? রুহির কেন মনে হয় যে সময় নষ্ট করছে শিপন, তা সে কি আর ইচ্ছা করে সময় নষ্ট করতে চায়? তাতো চায় না, সামান্য সৌজন্য না দেখালে সোহেল কী ভাববে? তবু রুহি এরকমই।
অবশ্য রুহির রাগ যে খুব অন্যায্য তাও নয়, রুহির মতো শিপনও জানে শোয়েব দুইটার মধ্যে এসে পড়বে, আর শোয়েব আসার আগ পর্যন্তই কেবল বাসাটা শুধু তাদের দুইজনের। তাছাড়া আসাদগেট বাসস্ট্যান্ডে আসতেওতো শিপনই দেরি করেছে, রুহিতো আর দেরি করেনাই। তা সবমিলিয়ে একটার আগেতো আর তারা মগবাজার আসতে পারেনাই, তাও আসার পথে যদি সোহেলের সাথে কথা বলেই সে সময় কাটায়, আবার সোহেলকে অনর্থক চা খাওয়ানোর জন্য পিড়াপিড়ি করে, তবেতো রাগ রুহি করতেই পারে।
রুহি কি এখন কিছু ভাবছে? নাকি তারও ভাবার সব ফুরিয়ে গেছে। এরকম ফুরিয়ে যায় কিন্তু। একেকসময় মনে হয় চিন্তা করার ব্যাপারটা উইন্ডোজের মতো হলে ভালো হত_ এখন এই বিষয়টা ভাবতে ভালো লাগছে না, তো বন্ধ করে রাখলাম, এখন চিন্তা করা দরকার, তো চালু করে দিলাম। খুব খারাপ কিন্তু হয় না। শিপন তাহলে সেই কবে না কবেকার স্কুলে যাবার সময়কার কথা আজ ভুলে থাকতে পারত, ভুলে থাকা কী, সেকথা আজ মনেই বা আসতে যায় কেন? সেই সেদিন বাসের মধ্যে যা ঘটেছিল, সেই দগদগে ঘা আজ কেন শুধু শুধু সবকিছু কেড়ে নেয় শিপনের কাছ থেকে, এত সাধ করে করা সব আয়োজন কেন সেটা ভেঙে দিয়ে যেতে পারে, আজ কেন শিপনের সেইসব কথা মনে আসতে হবে। সেইদিনইতো মা কত জোরাজুরি করল, তবু সেতো বলেনাই। মা কেন, কাউকেইতো বলেনাই। তবে? আজ কেন?
রুহির সাথে কতদিন কথার অভাবে বসে বসে শুধু তার হাতধরে কতসময় কাটিয়ে দিয়েছে শিপন, মনে হয়েছে, তবে কি সবকথা শেষ? কতকথা বানিয়ে বলতে গিয়ে সে থমকে গেছে, মনেমনে লজ্জাও পেয়েছে, তবে কি কথা সব শেষ? তাহলে সারাজীবন আর তারা কথা বলবে না? খুব হাঁপ ধরে আসে সেসবকথা মনে করতে গেলে। তবু সেসবদিনে কই, এই কথাটাতো কোনোদিন মনে পড়েনাই? হাতধরে বসে থেকে তারা একে অপরকে বুঝেছে, সপর্শ নিয়েছে, তারপরে আবার কোথা থেকে কথা জুটেছে, বিদায় নেবার সময়তো কথা আর শেষই হতে চায় না।
কী সব আবোলতাবোল ভাবে সে। ভাবুক শিপন, আবোলতাবোলই ভাবুক, আর করবে কী তবে সে? আসলে এখন কোনোকিছু আর তার নিয়ন্ত্রণে নাই, যে কোনোরকম একটা শেষের জন্য এখন কেবল অপেক্ষা করা। হয়ত সেই শেষ আজ দুপুর দুইটা পর্যন্ত, তবু অপেক্ষা আর কতক্ষণ করা যায়, রুহি কিছু বলুক অন্তত।
মিন্টুই একদিন প্রথম বলে, 'চল আজ ডিআইটি রোড থেকে বাসে করে স্কুলে যাবো'। বাসে নাকি চারআনা করে নেয়। তাহলে দুইজনে আটআনা, রিক্সায় গেলে একেকজনের লাগত বারোআনা করে, তাহলে বাকি একটাকায় সিরাজ ভাই'র দোকান থেকে একছটাক করে নকূলদানা, কিংবা সক্রেটিস বা প্লাতিনির দুইটা ভিউকার্ড কেনা যায় অনায়াসে। মিন্টুর অনেক সাহস, তা সাহসতো হবেই, মিন্টু একদিন হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরলেও মিন্টুর আব্বা বা আম্মা কিছু বলে না, মরিয়মের মাকে ফাঁকি দিলেও কিছু বলে না। মরিয়মের মা বলে মিন্টু নাকি গোল্লায় যাবে, কিন্তু আমার কাছে মিন্টুর আব্বা আর আম্মাকে অনেক ভালো লাগে, ওর আব্বা আর ও রাতজেগে হৈচৈ করে খেলা দেখে, নীতারা থাকতে মাঝেমধ্যে নীতার আব্বা আর ওদের মিলনমামাও মিন্টুদের বাসায় যেত খেলা দেখতে, খালাম্মা চানাচুর মাখানো মুড়ি খেতে দিত সবাইকে। আর আমাদের বাসায়! রাত নয়টার পর টিভি দেখা বন্ধ, খেলাতো আর নয়টায় হয় না, হয় সেই রাত বারোটায়, একটায়, আড়াইটায়, তা মিন্টুরাতো ঠিকই দেখে। বরঞ্চ ওর আব্বার সাথেই বসে বসে টিভি দেখে। আমার খুব মিন্টুদের বাসার কোনো একজন হতে মন যায়, হয়ত মিন্টুর ভাই হতে ইচ্ছা করে। দুইভাই একসাথে স্কুলে যেতাম, ভাগাভাগি করে ভিউকার্ড কিনতাম, আর সেসব ভিউকার্ড তখন লুকিয়েও রাখতে হত না। মিন্টু কত মজা করে সবাইকে ভিউকার্ড দেখায়, কই ওর আব্বাতো এর জন্য কখনও তার কান মলে দেয় না। ওর আব্বা বরঞ্চ সবাইকে আরও গল্প করে, ওই পুচকে মিলনের কাছে পর্যন্ত মিন্টুর জন্য পেলে'র ভিউকার্ড চায় খালুজান। আর শিপনকে কিনা ভিউকার্ড তোষকের নিচে লুকিয়ে রাখতে হয়, রোদে দেয়ার জন্য সেই তোষক উল্টে ভিউকার্ড পেয়ে মা তার কান মুচড়ে ছিঁড়ে দিতে চায়।
অথচ এসব ভাবতাম বলে, এইরকম আবোলতাবোল ভাবতাম বলে মাঝেমাঝে খুব লজ্জাও লাগত, তা আবোলতাবোলইতো, একবাসার মানুষ কি আর অন্যবাসার কারও ভাই হতে পারে? আমিতো এই বাসার, পচামার্কা একটা বাসার একজন হয়েই গেছি। একবার একবাসার কেউ হয়ে গেলে কি তা আর বদলানো যায়?
উকিলপাড়া থেকে জামতলা, তা পায়ে হেঁটে গেলে পোনে একঘণ্টাতো লাগবেই, কোনো কোনো সময় তার থেকে দশমিনিট বেশিও লাগে। আমরা রিক্সায়ই যেতাম, আমাদের বাসার মরিয়মের মা'র দায়িত্বে আমি, মিন্টু ছাড়াও নীতা, আর নীতার ভাই চিকুর একটা রিক্সায় গাদাগাদি করে যেতাম। নীতারা ময়মনসিংহ চলে যাবার পর আমি আর মিন্টু সেইযে একদিন প্রথমবার বাসে চড়ার এডভেঞ্চার করেছিলাম তা কিন্তু মিন্টুরাও চলে যাবার পর বজায় রেখেছিলাম। বাসায় কখনও বলিনাই, বাসে গিয়ে রিক্সাভাড়া বাঁচিয়ে কতকিছু করা যায়! তা কেন বলতে যাব শুধু শুধু? তাহলেতো মা ঠিক পরদিন থেকে সাথে মরিয়মের মাকে পাঠাত।
সেদিন একা একা উকিলপাড়া থেকে বের হয়ে ডিআইটি রোডের যাত্রীছাউনিটার নিচে এসে দাঁড়ায় শিপন। মরিয়মের মাকে সাথে দিয়ে দেয়ার চেষ্টা অনেক কষ্টে কাটিয়ে দিয়ে এমনকি মরিয়মের মাকে রিক্সা ডেকে দেয়ার দায়িত্ব থেকে পর্যন্ত রেহাই দিয়ে একা একা বের হয় শিপন। একটা করে বাস আসে যায়, কোনোটাতে চড়ার সাহস হয় না, কিজানি লোকে যদি জিজ্ঞেস করে বসে কেন রিক্সায় যাচ্ছে না সে, তার কী জবাব দেবে?
তা, জবাব দেয়া আর কী এমন শক্ত_ বলবে, সেতো বাসেই যায়। রিক্সায় যাবার সামর্থ্য যে তাদের নাই, তারাতো গরিব। তবে মিন্টু থাকতে কিন্তু এতকথা ভাবতে হয়নাই। মনেও আসেনাই। মিন্টুতো হড়বড় করে কথা বলতে বলতে বাসে ওঠে। এমনকি মাঝেমাঝে কন্ট্রাকটারের সাথে ঝগড়াও করে ভাড়া বেশি চাইলে।
কিন্তু কোনো পরিচিত লোকের সাথে যদি দেখা হয়ে যায়? আর শিপনের মনে হয় বাসস্ট্যান্ডের সবলোক শুধু তার দিকেই তাকিয়ে আছে, তারা কেউ যদি আব্বার চেনা হয়, এখন তাকে কিছু না বলে যদি শুধু গোপনে আব্বার কাছে গিয়ে বলে দিয়ে আসে। কত চিন্তা করতে হয় শিপনকে, ঠিক-বেঠিক, প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়, চিন্তা করতে করতেইতো শিপন অবাক হয়ে দেখে, সে কখন তাদের স্কুলের কাছে চলে এসেছে, আর এতক্ষণ এই প্রায় একঘণ্টা ধরে হেঁটে হেঁটে আসার কারণে প্রথম পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে। বাসায় ঠিক নালিশ চলে যাবে। তা আজ যদি বাসে উঠতে সে ভরসা নাই পায় তাহলে রিক্সায় আসল না কেন সে? অন্যদিন, অন্য কোনোদিন সে বাসে আসতে পারত, শিপনের খুব কান্না পায়, সে এরকম কেন? আর সবারতো এত চিন্তা করতে হয় না। আকাশপাতাল চিন্তা করে করে সে সব ভুল করে ফেলে কেন?
তা বাসে ওঠার অভ্যাস সে ঠিকই একদিন তৈরি করে ফেলে, বাসায় ফেরার সময় শুধু রিক্সায় যায়, বাসার গেটের সামনে নেমে ভাড়া দেয়, কেউ কিছু বুঝতে পারে না। কিন্তু এত লুকাছাপা, সামান্য বাসে চড়তে পারার আধঘণ্টার স্বাধীনতা, সেটাও সেদিন মিছমার হয়ে যায়। সেই বাসে চড়তে গিয়েই, হতচ্ছাড়া বাস! কুত্তা বাস! সেই শিউলি পরিবহন!
বাসা থেকে বের হতে শিপনকে একটু তাড়াহুড়া করতে হয় আজকাল, মা সন্দেহ করে, স্কুলে যাবার এত তাড়া কেন, আগেতো কোনোদিন এরকম দেখিনাই, তবু মা হয়ত খুশিই হয়, কারণ শিপন বলে, একটু তাড়াতাড়ি না গেলে প্রায়ই রেলগেটের সিগন্যালে আটকে পড়ে, সেখান থেকে বের হতে অনেক সময় লাগে, আর প্রথম পিরিয়ডে বেশিরভাগ দিনই দেরি হয়ে যায়, আর প্রথম পিরিয়ডের জয়নাল স্যারকেতো চেন না? মেরে হাড্ডি ভেঙে দেয়_ এসব কথা শুনে মা হয়ত খুশিই হয়।
তা আজ সহজেই বাসে চড়তে পারে শিপন, যদিও যাত্রীছাউনিতে এসে দাঁড়ানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই শিউলি পরিবহন নামের যে বাসটা আসে সেটাতে অনেক ভিড় দেখে দমে যায় শিপন, অথচ আজ একটু তাড়াতাড়ি যেতেই হবে, কালও জয়নাল স্যার ধমকে সাবধান করেছে তাকে, বলেছে, 'প্রতিদিন তোরই দেরি করতে হয়? কই, আরতো কারও দেরি হয় না? বাসায় বাজার করে দিয়ে তারপরে আসিস তুই, তাই না? বিয়ে করেছিস'? এইসব খারাপ করে করে কথা বলে জয়নাল স্যার। তা সেজন্য তাড়াহুড়া তাকে আজ করতেই হয়।
- কী যাবা না?
পিঠে কার হাত পড়তে ভীষণ চমকে ওঠে শিপন, এই বুঝি ধরা পড়ে গেল, ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখে, একজন লোক, তার আব্বার চেয়েও বয়সে বড় হবে, তাকেই বলছে, সে যাবে কিনা। তা যাবেতো শিপন, কিন্তু এই ভিড় ঠেলে কি আর সে উঠতে পারে। আশ্চর্য ব্যাপার লোকটা তাকে উঠতে সাহায্য করে, আর সব লোকদের ঠেলে তাকে শিউলি পরিবহনে উঠিয়ে দেয়, নিজেও ওঠে। বাসে উঠেও লোকটা শিপনকে ধরে রাখে, শিপনের পেছনে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একহাতে শিপনকে পেঁচিয়ে ধরে রাখে, শিপনের হাসি পায়, সেকি আর পড়ে যাবে নাকি? লোকটা এত বোকা কেন?
কিছুক্ষণের মধ্যেই শিপন বুঝে ফেলে লোকটা কিন্তু বোকা নয়_ উকিলপাড়া থেকে জামতলা দুইটা মোটে স্টপেজ, জামতলা পর্যন্ত যেতে পনেরমিনিট মতো লাগে, এই পনেরমিনিটের মধ্যেই শিপনের কাছে প্রমাণিত হয়, লোকটাকে যতখানি বোকা আর যতখানি ভালো ভাবা গিয়েছিল, লোকটা তার কিছুই নয়, লোকটা তবে কী, কিজানি, শিপন বলতে পারে না।
বাসের মধ্যে লোকটার জড়িয়ে ধরে থাকা যখন একসময় শিপনের কাছেই অসহ্য হয়ে উঠতে শুরু করে, লোকটার হাত যখন শুধু শিপনকে পেঁচিয়ে ধরে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, হাতটা যখন আরও সক্রিয় হয়ে উঠে আস্তে আস্তে নিচের দিকে নেমে শিপনের প্যান্টের ভেতরে ঢুকে যায়, তখন শিপন ঐ প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যেও তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চেষ্টা করতে থাকে। আর তার নড়াচড়া করা দেখে_ লোকটা কি বদমাশ! আবার নরমস্বরে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, 'নড়ো না খোকা, পড়ে যাবেতো!'
- তুই ছাড়! আমাকে ছাড়! কুত্তা! ছাড়!
মনেমনে গাল দেয় শিপন। আর অবাক হয়ে দেখে লোকটা তার প্যান্টের বোতাম খুলে ফেলে। সে কি চিৎকার করে বাসের লোকদের বলে দেবে? কিন্তু প্যান্টের বোতাম খুলে ফেলা যে বড় লজ্জার, তা সে বাসের লোকদের বলে কেমন করে, লোকটা তার নুনু ধরে নাড়াচাড়া করতে থাকে। আর অন্যদিকে শিপনের বামহাত নিয়ে লোকটা তার নিজের পায়জামার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়, তার হাতে ধরিয়ে দেয় তার শক্ত হয়ে ওঠা পৌরুষ। শিপনের ঘেন্না করে খুব, প্রাণপণে সে মোচড় দিয়ে দিয়ে সরে আসার চেষ্টা করে, আর লোকটা সাথেসাথে শিপনের নুনু ধরে মোচড় দেয়, ব্যথায় শিপনের চোখ দিয়ে দরদর করে জল গড়ায়, অথচ সেই জল লুকানোর জন্য সে নিজেই আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে লোকটা একবার কেমন শিউরে ওঠে, কেমন কেঁপে গিয়ে শিপনের বামহাতে গলগল করে তীব্র গরম আঁষটেগন্ধের বিষাক্ত পৌরুষ ঢেলে দেয়।
ঠিক তখনই জামতলা এসে দাঁড়ায় বাসটা। বাস থেকে নেমে একদৌড়ে স্কুলের গেট দিয়ে ঢোকে শিপন, চোখে কিছু দেখতে পায় না সে, কেবল অন্ধের মতো দৌড়ে স্কুলের মাঠ পার হয়ে পুকুরঘাটের দিকে যেতে চায় সে। মাঠ কি আর শেষ হতে চায়, মাঠতো কিছুতেই শেষ হয় না। একসময় পুকুরঘাটে আসতে পারে শিপন, হাত ধোয়, লালশানের ঘাটে ঘষেঘষে হাতের চামড়া তুলে ফেলে, তবুতো সেই গন্ধ, সেই বিষের মতো উষ্ণতা তার হাত থেকে চলে যায় না।
ঠিক সেদিনই জয়নাল স্যারের তাকে মারা চাই, 'দেরি করে আসলি কেন?' বলে যখন হাত পাততে বলে স্যার; তখন সেই কলঙ্কিত হাত সে কিভাবে স্যারের সামনে ধরে? সে শুধু ঘাড় গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকে, আর স্যারের সে কি রাগ! 'হাত পাতবি না? এতবড় সাহস! দাঁড়া বেতিয়ে তোর পাছার চামড়া আজ তুলে ফেলব। বেয়াদব কাঁহিকা!' মারুক, জয়নাল স্যার মারুক, আজ শিপন মরে যাক, এই পৃথিবীর কারওতো আর শিপনকে দরকার নাই, শিপন তাদের কে?
জানালা দিয়ে শিপন কেবল বাইরে তাকিয়ে থাকে, একসময় জয়নাল স্যারের মার শেষ হয়, একসময় স্কুল শেষ হয়, হেঁটে হেঁটে, নাকি রিক্সায়, নাকি বাসে, নাকি উড়ে উড়ে একসময় বাসায়ও চলে আসে সে। গোসল করে ভাত খেয়ে পড়তে বসলে জ্যামিতি বইয়ের সকল সর্বসাম্য উপপাদ্য মিথ্যা প্রমাণিত করে শিপনের চারপাশ থেকে উঠে আসে উদ্যত সব শিশ্ন। শিপন জ্যামিতি বইয়ের উপর তার হাত মেলে ধরে, হাত দুইটা ঘষেঘষে চামড়া তুলে ফেলেছে সে, লাললাল চাকাচাকা হয়ে আছে শিপনের কোমল হাতের তালু।
- কী হইছে হাতে?
পেছনে মার গলা শুনে মুহূর্তে বুঝতে পারে না শিপন হাত লুকিয়ে ফেলবে কিনা, তবে তার আগেই মা তার হাত ধরে ফেলে।
- একিরে, তোর হাতে কী হইছে?
- পড়ে গেছিলাম।
- পড়লি কেমনে?
- খেলতে গিয়ে ... -
ও তাহলে ছুটির পর বাসায় না ফিরে স্কুলেই খুব খেলা হচ্ছে, না? তাইতো বলি স্কুল থেকে আসতে সাহেবের এত দেরি হয় ক্যানো?
কানটা মুচড়ে দিয়ে আরও সব কী কী বলতে থাকে মা, তা আর শোনা হয় না শিপনের। শিপন বধির হয়ে যায়।
দুপুরে খেয়ে মা ঘুমালে চুপিচুপি বারান্দায় এসে রেলিঙে থুতনি রেখে শিপন নিচতলায় নীতাদের ছেড়ে যাওয়া বাসায় নতুন আসা বাচ্চাদের খেলা দেখে। ওরা কত হৈচৈ করে খেলে, ওদের কারওতো আর শিপনের মতো দুঃখ নাই। ওদের কারও হাততো আর কলঙ্কিত হয়ে যায়নাই। ওদের কারওতো আর এই শিপনের মতো মরে যেতে ইচ্ছা করছে না। ওদেরতো কেউ না কেউ ভালোবাসেই_ কম হোক আর বেশি। শিপন আজকে কী দোষ করেছে, সবাই যে ওকেই ধরে ধরে মারছে, জয়নাল স্যার কিছু না বুঝেই মারল, দেরিতো আজ সে আর ইচ্ছা করে করেনাই, তবে বুঝি হাত না ধুয়েই সে ক্লাসে আসবে? আর মাওতো খুব, এখনতো খুব ঘুমানো হচ্ছে, এই ঘুমানোর আগে ছেলেকে না মারলে তোমার বুঝি ঘুমই আসত না! শিপনের এত দুঃখ কেন_ শিপন কেন জন্মাতে গেল তবে_ না জন্মালে কী এমন ক্ষতি ছিল_ শিপনের গলায় এত ব্যথা কেন? শিপনের সামনে পৃথিবী ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে।
ফাঁকা হয়ে থাকা আকাশে অলসভাবে উড়তে থাকে চিল, চিলের ডানায় রোদ লেগে ঝকমক করে, পুরা আকাশটাই হয়ত ঝকমক করে। অতবড় আকাশের গায়ে আরও বিশাল এক দুপুর ফুটে থাকে বলে তাকে আরও মস্ত দেখায়। এই মস্ত দুপুরবেলা সবাইকে ফাঁকি দিয়ে শিপন তবে মরে যাক, অথবা চুপ করে কোথাও হারিয়ে যাক। সবার তখন খুব আনন্দ হবে তাহলে।
তা এসবকথা আজ রুহির জন্মদিনে শিপনকে কে মনে করতে বলে? হঠাৎ আজ এতবছর পরে কেন এসব ছাইপাশ মনে করা?
আজ শোয়েবের বাসায় পাওয়া বহুকাঙ্ক্ষিত দুইঘণ্টায় শিপন যখন জীবনে প্রথমবার রুহির কাছে তার সমস্ত শৈশব বিসর্জন দিয়ে পুরুষ হয়ে উঠতে যায়, তখনই সেই বাসের ভেতরকার এক অজানা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষাক্ত পৌরুষের স্মৃতি শিপনের সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। শিপনও তবে সেই লোকটির মতো পুরুষ? আর তখন সেদিনকার ছোট্ট শিপনের কথা মনে করে তার এই প্রথম জানা উত্থিত পৌরুষ, তার উদ্যত শিশ্ন সিঁটকে আসে। তাকে নিবৃত্ত হতে হয়।
একটা পরাজিত গলায় সে আস্তে করে রুহিকে ডাকে, রুহি উত্তর দেয় না। রুহি কি রাগ করেছে? নাকি শিপনের ডাক এত ক্ষীণ ছিল যে তা শুনতেই পায়নাই সে। তবে কি শিপন রুহিকে ডাকেনাই? নিঃশব্দ নিশ্বাসের সাথে সাথে রুহির পিঠ আরও নিঃশব্দে ওঠানামা করতে থাকে। রুহির পিঠের মাঝখানে একটা লালচে দাগ, দাগটাতে খুব আদর করে একটা চুমু দিতে ইচ্ছা করে শিপনের, কিন্তু স্থানুর মতো বসে থাকা তার সংবেদহীন শরীর সে ইচ্ছা কার্যকর করে না, অথচ সমস্ত পরাজয় আর অসহায়তা কাটানোর জন্য তার কোনো কথা বলা দরকার কিংবা একটা কিছু করা দরকার, অথচ শিপন কথাবলার মতো কোনো প্রসঙ্গ খুঁজে পায় না।
এইসব ভাবতে ভাবতেই একসময় ঘড়ির দিকে চোখ পড়ে শিপনের, এরই মধ্যে প্রায় দুইটা বেজে গেছে দেখে সে খুব ব্যথিত হলেও আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শোয়েবের মধুবাগের বাসা ছেড়ে দেবার অনিবার্যতা শিপনকে মনেমনে স্বীকার করতেই হয়, আর রুহিকে একথা জানাতে তার খুব দ্বিধা হয়, দ্বিধা হয় তার শৈশবের সবকথা খুলে বলতে।
আর সবার কত রঙিন না হোক, কত উজ্জ্বল শৈশব থাকে, সারাজীবন তারা সে শৈশবকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে মনে করে, সেইসব স্মৃতিময় শৈশব নিয়েই নাকি শেষবয়সে মানুষ বেঁচে থাকে। আর শিপনের বেলা?
ঝিলের জল থেকে পিছলে আসা রোদ আর জানালার শিকের দ্বন্দ্বে তৈরি হওয়া সবুজ আভার জলছবি ছাদ থেকে কখন অদৃশ্য হয়ে গেছে। ভাঙাগলায় আবারও রুহিকে ডাকে শিপন।
- রুহি! ওঠো, যেতে হবে।
রুহি হয়ত শিপনের ডাক এবার শুনতে পায়। রুহি ওঠে। আস্তে আস্তে কাপড় পরতে থাকে সে। রুহির মুখ দেখে কিছু বোঝা যায় না, রুহি শিপনের দিকে তাকায় না, লজ্জায় নাকি রাগ করে, তা বলার সাধ্য কি আর শিপনের আছে? শিপন শুধু শূন্যদৃষ্টিতে রুহির দিকে তাকিয়ে থাকে।
রুহি, তুমিতো সবকিছু জান না, আমার সবকথা তোমাকে একদিন ঠিক বলব, এতদিন বলিনাই, বলব কিনা বুঝতে পারিনাই, আর একি বলার মতো কোনো কথা যে খুব গল্প করতে হবে এসব নিয়ে? যেদিন বলব সেদিন তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে, কেন আমার আজ এরকম হল, তোমার শরীরের এত কাছাকাছি এসে, আমার পুনর্জন্ম হতে হতে কেন আমি মুহূর্তে সব হারিয়ে ফেললাম? এক পরিত্যক্ত শৈশবের কাছে আমার হার স্বীকার করতে হল, আমার মনে হল, তাহলে আমিও ঐ লোকটার মতো খারাপ, এটা কী তবে খারাপ নয়? এটা কী তবে স্বাভাবিক, আমিতো খারাপ নই, মন্দলোকতো আমি নই, মন্দ কি? বল না, তুমিই বল না, তুমিতো আমাকে কতদিন চেন_ এই তোমার চেয়ে আজ আর কে আমাকে ভালো চেনে, সেই ছোটবেলাকার বাসে চড়ে সেদিন এই শিপনের মরে যেতে ইচ্ছা করেছিল, অথচ আজ বাসের সেই বদমাশ লোকটার মতো করে আমারও ..., কিন্তু তবু কোথায় একটা পার্থক্য তার সাথে আমার নিশ্চয়ই আছে, আমি বুঝতে পারি, তুমিও নিশ্চয়ই পারবে।
রুহি অবাক হয়ে দেখে শিপনের চোখ দিয়ে জল গড়ায়, কাপড় পরতে শুরু করার সময় থেকেই রুহি না তাকিয়েও বুঝতে পারে তখন থেকেই শিপন তার দিকে একদৃষ্টে তাকানো। মানুষ এত তীব্র দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতে পারে? রুহি কয়েকবার চোখ সরিয়ে নিয়েছে শিপনের চোখ থেকে, রুহি রাগ করেনাই, মন খারাপ করেছে শুধু। মন খারাপতো করতে পারে রুহি। আজতো তার জন্মদিন, জন্মদিনেতো সে আরেকটু বেশি আশা করতে পারে, পারে না? রুহির মনে হয় পারে। তাছাড়া একি রাগ করার কিছু? আজ হয়নাই, আচ্ছা আরেকদিন হবে, শিপনের অমন তীব্র তাকিয়ে থাকা দেখে এইরকম কথা রুহির মনে হয়। রুহি দেখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শিপনের চোখ দিয়ে জল গড়ায়, শিপন কি কাঁদে? অনেক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে থাকলে যেকারো চোখে জল আসবে, তবু রুহির মনে হয় কাঁদে শিপন। রুহির খুব অনুশোচনা হয়, সে কেন এতক্ষণ মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে থাকল, সে যদি একটু হেসে কথা বলত, গল্প করত, যদি একটু সহযোগিতা করত তাহলে নিশ্চয়ই শিপন তার দিকে মনোযোগ দিতে পারত।
শিপনের তাকিয়ে থাকা আর সহ্য করতে পারে না রুহি, তার খুব কষ্ট হয়, ধীরপায়ে এগিয়ে এসে শিপনকে ধরে সে, আর মুহূর্তে শিপন কী ছেলেমানুষ হয়ে যায়, খাটের ওপর বসে থাকা নগ্ন শিপন আঁকড়ে ধরে রুহিকে, রুহির বুকের ওমের ভেতরে মুখ গুঁজে দিয়ে বিপুল কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিপনের পিঠে, চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে রুহি।
আর একসময় সমস্ত ভুলে গিয়ে, রুহির কাছে তার সকল শৈশব বিসর্জন দিতে দিতে শিপন বড় হয়ে যায়, পুরুষ হয়ে যায়। দুইটার সময় শোয়েব এসে দরজা বন্ধ দেখে, ডাকাডাকি করে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আবার ফিরে গেছে কিনা, তা শিপন কিংবা রুহির আর জানা হয় না_ মেহগনিগাছটার পাতায় পিছলে বা তারও পেছনের ঝিল থেকে প্রতিফলিত হয়ে যে আলো ঘরের ছাদে কলাপাতাসবুজ রঙের এক জলছবি তৈরি করেছিল, সেই আলো তার শেষ অবশেষটুকু পৃথিবীর গায়ে শেষবারের মতো বুলিয়ে দিয়ে নেমে গেছে কিনা তাও তাই তাদের আর জানা হয় না। আর সবদিনের মতো করেই আবার একটা অতি সাধারণ সন্ধ্যা নিঃশব্দে নেমে আসে।
প্রাপক
প্রাপক
ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠক্ করে একমনে চিঠির খামগুলোতে সিল মারার ভীষণরকম একঘেয়ে কাজটা করার সময় প্রতিদিন এত এত চিঠি কোথায় যায় কার কাছে যায় তা ভাবার কথা রিয়াজউদ্দীনের কখনও মনে আসেনাই বলে সেগুলোর উপরে কী ঠিকানা লেখা আছে তা দেখার বা চিঠির গতিগন্তব্য সম্পর্কে ভাবার অবকাশ বা আগ্রহ কখনও তৈরি হয়নাই তার। তাছাড়া একটা চিঠিতে সিল মারার কাজটা এত অল্প সময়ের মধ্যে সারতে হয় যে ঠিকানা দেখার সময়ও তার কখনও করা হয়নাই, সময় করা কী, কখনও সে ধরনের ইচ্ছাও তৈরি হয়নাই। কাজের মাঝে অবকাশ তার থাকে না_ তাও ঠিক না, অবকাশ থাকে, মাঝেমাঝে একটু বেশিই অবকাশ থাকে।
রিয়াজউদ্দীনের সামনে তারের জাল লাগানো জানালা যার একেবারে নিচে টিকেট বা খাম কিনতে আসা কিংবা মনিঅর্ডার করতে আসা লোকেদের হাত ঢোকানোর জন্য একটা গোল ছিদ্র আর তার একটু উপরে কথা বলার জন্য আরেকটা চারকোণা ছিদ্র, সে জানালার তারের জালের ভেতর দিয়ে তাকালে সামনে একটু বামদিকে লালরঙের পুরানো পোস্টবক্স আর তাকে ছাড়িয়ে ডানদিকে লেকের ওপারে ঘনগাছে ছাওয়া রাস্তা আর তাকেও ছাড়িয়ে গাছপাতার ফাঁকেফাঁকে দূরে লাল সিরামিক ইটে বানানো ভাসানী হলের এককোণা আর সাদা চুনকাম করা কামালউদ্দীন হলের আরেককোণা দেখা যায়। টিকেট বা খাম কিনতে আসা কিংবা মনিঅর্ডার করতে আসা লোকেদের ভিড় কম থাকলে বিশেষকরে দুপুরের খাবার সময় পাওয়া লম্বা অবকাশে রিয়াজউদ্দীন বরং পোস্টবক্স ছাড়িয়ে সামনের রাস্তায় ছেলেমেয়েদের দলবেঁধে গল্প করতে করতে, হাসাহাসি করতে করতে বা দুষ্টামি করতে করতে হলের দিকে কিংবা ডিপার্টমেন্টের দিকে যাওয়া বা আসার দৃশ্য কিংবা রাস্তার পাশে লেকের পানির সামনে বসে আড্ডা বা গান করতে থাকার দৃশ্য দেখতে খুব পছন্দ করে। আর প্রতিদিনের মতো আজকের লাঞ্চ আওয়ারটা পার হয়ে গেলেই বিকাল চারটার ডাক ধরানোর জন্য রিয়াজউদ্দীন যখন একমনে ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠক্ করে সিল মারায় ব্যস্ত হয়ে যায় এবং একের পর এক সিলমারা চিঠিগুলোকে বামহাত দিয়ে টেনে নিয়ে নিয়ে অটোমেটিক যন্ত্রের মতো করে বামদিকে স্তুপ করতে থাকে তখনই একটা চিঠির উপর ঠক্ করে সিলটা পরার আগে তার ডানহাতটা উপরে থাকতেই থেমে যায় এবং এই ছন্দপতন নিছক হাত থেমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তারও অনেক পরে বিকাল চারটার ডাক চলে যাওয়া এবং ডাক চলে যাবার পরও রিয়াজউদ্দীনের পুরা সন্ধ্যা ও সারাটারাত এলোমেলো করে ফেলে। তার সাতবছরের চাকরি জীবনে এই একই টেবিলে বসে একই তারের জাল দিয়ে আটকানো দুই ছিদ্রওয়ালা জানালার উপরের ছিদ্র দিয়ে একই ধরনের কয়েকটা শব্দ দিয়ে বিন্যস্ত কথা বলে যাওয়া আর নিচের ছিদ্র দিয়ে একই টিকেট আর খাম বিক্রি করা বা মনিঅর্ডার গ্রহণ করা এবং বিকাল চারটার ডাক ধরানোর আগে পর্যন্ত সেই একইভঙ্গিতে ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠক্ করে সিলমেরেযাওয়া জীবনে হাজার চিঠির মধ্যে এই একটি চিঠি তাকে, তার পুরা বিকাল, সন্ধ্যা আর সারারাত এলোমেলো করে দিল, দিতে পারল, কারণ ওতে কোনো ঠিকানা লেখা ছিল না। খামের উপর কিছুই লেখা ছিল না।
প্রত্যেকদিন সন্ধ্যার আগে আগে রিয়াজউদ্দীনদের দুইতিনবাড়ি পর হিরু ব্যাপারির মা আর বৌয়ের অত্যন্ত উঁচু আর তীক্ষ্ন গলার ঝগড়া শোনার ফাঁকে গেটের বাইরে খোলা জায়গাটার ঘনসবুজ ঘাসের মাঝখানে ইংরেজি 'এস' অক্ষরের মতো জেগে ওঠা লালমাটির রাস্তাটায় পাকারাস্তা থেকে নামা রিয়াজউদ্দীনের সাইকেলের মৃদূ অথচ নৈমিত্তিক এবং অনিবার্য একটি শব্দ শুনতে পায় রোকেয়া। ঘরের সমস্ত কাজ ঠিকমতো করতে করতেই অনেকখানি কৌতুহল নিয়ে হিরু ব্যাপারির মা আর বৌয়ের ঝগড়ার আকর্ষণীয় শানানো শানানো কথাগুলি শুনতে থাকলেও রোকেয়ার কান ঘড়িধরা একটা সময়ে রিয়াজউদ্দীনের সাইকেলের মাডগার্ডের সাথে চেইনের বাড়ি খাওয়ার শব্দটা ঠিকই শুনতে পায়।
ঘনসবুজ ঘাসের মাঝখানে কালে কালে গেরুয়া গ্রামের প্রায় প্রত্যেকটা পুরুষের, নারীর, শিশুর আর কখনও কখনও তাদের সাথে সাথে চলতে থাকা গরু, মহিষ, ছাগল বা মোরগ-মুরগীর পা পড়ার ইতিহাস নিয়ে জেগে ওঠা লালমাটির রাস্তাটা পাকারাস্তা থেকে ইঞ্চি তিনচারেক নিচু হওয়ায় রিয়াজউদ্দীন যখন সন্ধ্যার ঠিক আগে হিরু ব্যাপারির মা আর বৌয়ের ঝগড়া করতে থাকার সময় সাইকেলে চড়েই সেখান থেকে গেরুয়ার লাল কিন্তু চিকন 'এস' আকৃতির রাস্তাটায় নামে তখন অনিবার্যভাবেই সাইকেলের চেইনটা ঝাঁকি লেগে মাডগার্ডের সাথে বাড়ি খায়। রিয়াজউদ্দীনের সাথে বিয়ে হবার পর কিংবা তার দুইবছর পর তার শাশুড়ি মারা যাবার পর কিংবা তারও তিনবছর পর অনেক তাবিজ আর পড়াপানির ফসল হিসেবে রোকেয়ার কোল আলো করে আসা বিজুর জন্মের পর বা বিজুর বয়স আজ নিয়ে একবছর আটমাস হবার পর আজই প্রথম রোকেয়া খেয়াল করে হিরু ব্যাপারির মা আর বৌয়ের ঝগড়া থেমে গিয়ে আবার তারা দুইজন প্রতিদিনকার মতো সব মিটিয়ে একসাথে রান্না করতে বসে গেলেও সেই মৃদূ অথচ অনিবার্য ঘড়িধরা সময়মাফিক সাইকেলে চেইনের সাথে মাডগার্ডের বাড়ি খাওয়ার পরিচিত শব্দটি তার কানে পেঁৗছেনাই। আর রোকেয়া বিকালের সবকাজ শেষে বিজুর ঘুম থেকে ওঠার সময় হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত বিজুর কাথাকাপড় ধুতে ধুতে সাইকেলের শব্দ শুনবে বলে কলপাড়ে অনেক সময় নিয়ে বসে আছে মনে হবার পর একইসাথে সন্ধ্যার অন্ধকার নামা ঘরে একলা থাকা বিজু আর ঘরের বাইরে থাকা বিজুর বাপের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে সে চারপাশে তাকিয়ে দেখে সন্ধ্যা আর সন্ধ্যা নাই, রাতও হয়ে গেছে অনেক্ষণ হয়।
বিজু কি এখনও ঘুমে? বিজু যদি ভয় পায় ভেবে তার খারাপ লাগলেও বিজুর বদলে তার চোখের সামনে সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকারে আরও গাঢ় সবুজের মাঝখানে লালমাটির একটা বিলম্বিত আর নিঃশব্দ এস আকৃতির রাস্তা জেগে ওঠে। সাইকেলের এই সামান্য মৃদূ ধাতব শব্দটি প্রতিদিন রোকেয়াকে কতখানি নিশ্চয়তা এনে দেয় তা রিয়াজউদ্দীনের ঘরে আসার সাতবছর পর এই প্রথম রোকেয়া বুঝতে পারে। ভাবতে না চাইলেও প্রথমবারের মতো রোকেয়ার মনে হয় রিয়াজউদ্দীনের কিছু একটা হয়ে গেলে বিজুকে নিয়ে তার যাবার কোনো জায়গা নাই। বিজুর ভেজা কাথাকাপড় কলপাড়েই ফেলে রেখে ঘরে এসে রোকেয়া দেখতে পায় বিজু বিছানায় বসে ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে চারদিকে তাকানোর চেষ্টা করছে আর বিজুর এই বসে থাকার অসহায় ভঙ্গি দেখে রোকেয়ার সমস্ত অস্তিত্ব কেঁপে উঠলে রোকেয়া দৌড়ে গিয়ে বিজুকে চেপে ধরে উদ্বিগ্ন গলায় 'বাপ আমার সোনা আমার' বলে বিছানায় বসলে অন্ধকারে একলা ফেলে রাখার অভিমানেই হয়ত কিংবা সদ্য ঘুম ভেঙে কোনোকিছু বুঝতে না পেরে কিংবা মায়ের অযাচিত কিন্তু গভীর আদর পেয়ে বিজু আল্লাদি ভঙ্গিতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। আর রোকেয়ার দুইচোখও কেমন ঝাপসা হয়ে আসে, বিজুর কান্নার শব্দ ছাপিয়ে পাকারাস্তা থেকে নামা রিয়াজউদ্দীনের সাইকেলের শব্দের জন্য মনেমনে কান পেতে বিজুকে অাঁকড়ে ধরে অন্ধকারে বসে থাকে সে।
বারান্দায় হাতমুখ ধুতে বসে বাইরের অন্ধকারকে আজ অন্য কোনোদিনের চেয়েও অনেক বেশি অন্ধকার আর ভারী মনে হয়, আর মনে হয়, এখানে, বারান্দায় একটা আলোর ব্যবস্থা করার কথা রোকেয়া অনেকদিন মনে করিয়ে দেবার পরও একটা বাল্ব, খানিকটা তার আর একটা হোল্ডার কিনে আনার কথা তার একদিনও মনে থাকে না। রোকেয়া তাকে মাঝেমধ্যে 'সংসারের দিকে তোমার একদম মন নাই' বলে লজ্জা দেবার চেষ্টা করে করে ব্যর্থ হয়ে এখন কিছু বলা বাদ দিলেও অফিস থেকে নিয়মের ব্যতিক্রম করে সন্ধ্যার অনেকপরে ঘরে ফিরে বারান্দায় বসে টিউবওয়েল থেকে সদ্যতোলা ঠাণ্ডাপানি দিয়ে হাতমুখ ধুতে ধুতে বারান্দায় একটা আলোর প্রয়োজনীয়তা রিয়াজউদ্দীন অনেকদিন পর নতুন করে আজ অনুভব করে। অন্ধকারে তার দম আটকে আসতে থাকে, আর তা কেবল অন্ধকারের জন্য নয়, দেরি করে আসার বিশ্বাসযোগ্য কোনো কারণ খুঁজে না পাওয়ার জন্যও তার দমবন্ধ লাগে। অন্যসব দিন চারটার ডাক যায় একদিক দিয়ে আর টেবিল গুছিয়ে রিয়াজউদ্দীন বের হয় আরেকদিক দিয়ে; অথচ আজ কী যে হল! চারটার ডাক বিদায় হবার ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় পর অফিস থেকে বেরুবার তাড়া অনুভব করলেও বারবারই তার দেরি হয়ে যাচ্ছিল। ঠিকানাবিহীন চিঠিটা চোরের মতো পকেটে পুরে সন্তর্পণে বের হয়ে আসার সময় তার একবার মনে হয়েছিল কালামসাহেব নিশ্চয়ই তারই দিকে তাকিয়ে আছে_ সে পেছন ফিরে নিশ্চিত হয়নাই তবে তার মনে হয়েছে, আর এজন্যই সে তখনই চলে আসতে পারেনাই। তার বের হওয়া আবার কালাম সাহেব খেয়াল করছে বলে সে তো আর সাথে সাথেই মত পাল্টে চিঠি রেখে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। তাই অযথাই বাইরে এসে কিছুক্ষণ সময় ব্যয় করে তারপর একসময় অন্যকোনো কাজের ছুতা করে ভেতরে গিয়ে চিঠিটা সবার অগোচরে ড্রয়ারে রেখে চলে আসার সময় পোস্টমাস্টার কালামসাহেব সত্যিই তার দিকে তাকিয়ে আছে কিনা দেখার জন্য সাহস করে পেছন ফিরে তাকালে রিয়াজউদ্দীন দেখতে পায় কালামসাহেব এতক্ষণ তার দিকেই তাকিয়ে ছিল আর এখন তাকে ঘুরে তাকাতে দেখে অল্প করে হাসে। ব্যাপারটা কাকতালীয় বলে অনেকবার করে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেও তার বারবার মনে হতে থাকে কালামসাহেব মনে হয় এখন হাসিহাসি মুখ করে বলেই বসবেন_
- 'আপনেই লেখে দিলেন নাকি, ঠিকানাডা? কই, দেহি? কী ঠিকানা লেখলেন?'
কালামসাহেবের কাছে নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করার জন্যই হয়ত রিয়াজউদ্দীন অনর্থক দেরি করতে থাকে। তারপরও সে আর কতটুকু দেরি, তারপরইতো সাইকেল নিয়ে বের হল সে, তারপর সোজা এই বাসায়। তবে? কোথা দিয়ে তবে সন্ধ্যা পার হয়ে গেল? ইউনিভার্সিটি থেকে বের হয়ে বিশমাইল আসামাত্র নবীনগরফেরত ম্যাটিনি শো ভাঙা লোকেদের ভিড়ের মধ্যে রিয়াজউদ্দীনের সাথে দেখা হয় সাবরেজিস্ট্রার স্যারের। রিয়াজউদ্দীন সিনেমা দেখে বের হল মনে করে রিক্সা থেকেই ব্যাজারমুখে মাথা নাড়লেন স্যার আর তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে পাশকাটিয়ে চলেও গেলেন। রিয়াজউদ্দীনের কেবলই মনে হতে থাকে এখন রাস্তার সবলোক ভাবছে সে তবে এতক্ষণ সিনেমা দেখছিল। সিনেমা দেখায় দোষের কিছু আছে বলে রিয়াজউদ্দীন মনে করে না, বরং তার একেকসময় মনে হয় রোকেয়াকে নিয়ে একদিন আসবে, কিন্তু দেড়বছরের বিজুতো আর ঘণ্টাতিনেক অন্ধকারে বসে থাকতে পারবে না, তাকে তখন কার কাছে রেখে যাবে তাই কখনও ঠিক করে উঠতে পারেনাই বলেইতো কখনই রোকেয়াকে নিয়ে সিনেমা দেখতে আসা হয়নাই, এমনকি রোকেয়াকে কখনও আল্লাদ করেও বলা হয়নাই, 'চলো, সিনেমা দেখে আসি'; তবে সে যাই হোক, সেতো এখন সিনেমা দেখছিল না, নাহয় দেখছিলই, তাতে কার কী, কিন্তু তবু বিনাদোষে দোষী হওয়ার অভিমানে আর সেটা কাউকে বলতে না পারার আকুতিতে তার মনটা খচখচ করতে থাকে।
সে এখন কী করে প্রমাণ করে যে সে সিনেমা দেখে নয়, অফিস থেকে ফিরছে? সে কি সাইকেলে চড়ে দ্রুত চলে যাবে, নাকি শান্তভঙ্গিতে সাইকেল ঠেলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরবে, যেন তার কোনো তাড়া নাই? পরিচিত, অর্ধপরিচিত লোকদের দেখলে সে কি মুখ হাসিহাসি করে দুইএক কথা বলার জন্য দাঁড়াবে, নাকি কোনোদিকে না তাকিয়ে গম্ভীরমুখে সোজা বাড়ির পথ ধরবে? আর সে প্রমাণ করবেই বা কার কাছে? কেন করবে? কোন কাজটা করা উচিত হয় তার? রিয়াজউদ্দীনের সত্যিই জানা নাই। তা পুরা বিকাল আর সমস্ত সন্ধ্যাটা সে তবে কোথায় পার করে এল তাও সেজন্য তার জানা নাই। সে কি সাইকেলে চড়েই ফিরল নাকি হেঁটে হেঁটে সাইকেল ঠেলে নিয়ে ফিরল তা তার জানা থাকুক বা না থাকুক, একথা তার জানা নাই যে পাকারাস্তা থেকে নামার সময় তার সাইকেলের মাডগার্ডের সাথে চেইনের বাড়ি খাওয়ার শব্দ শোনার জন্য রোকেয়া কান পেতে ছিল কিনা বা সেশব্দ শেষমেষ সে শুনতে পেয়েছিল কিনা।
নুদাইমাছের লালটকটকে ঝোল দিয়ে খাওয়া শেষ করে রিয়াজউদ্দীন পাতে ডাল তুলে নিয়ে একগ্রাস ভাত মুখে দেবার পর অনেকখানি আনমনা হয়ে পড়লে চিন্তিত রোকেয়া খানিকটা ডাল হাতের তালুতে নিয়ে চকিত চুমুক দেয়, ডালে লবণের অনুপস্থিতি তাকে খুব লজ্জায় ফেলে দেয়। এরকম তার কখনও হয় না।
মাছ দিয়ে ভাত খাওয়া শেষ হবার পর পাতলা মসুরের ডাল দিয়ে আরও খানিকটা ভাত খেতে পছন্দ করে রিয়াজউদ্দীন, মাছের তরকারিতে আলু থাকলে সেই আলু ডালের মধ্যে নিয়ে চটকে সালুন একটু ঘন করে খায় সে। শীতের শুরুতে কচিমুলা উঠলে ডাল দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় কাঁচা খাবার জন্য সে কচিমুলা বাজার থেকে কিনে আনে। অন্যদিনে পছন্দ করে শশা বা খিরাই। ডাল দিয়ে ভাত খাবার সময় কাঁচামুলা বা শশা বা খিরাই মুখে দিলে যে কচকচ শব্দ হয় সেটাই পছন্দ রিয়াজউদ্দীনের। কী যে সব ছেলেমানুষী কারবার! পরশু রাতেইতো, বিজুও বসে গেল বাপের পাশে, খালি একটা থালা সামনে টেনে নিয়ে বলল, 'ছছা কাবো'। রিয়াজউদ্দীন তাই দেখে হাসতে গিয়ে গলায় ঠেকে কেশে টেশে একাকার। হাসে রোকেয়াও। বাপছেলেকে পাশাপাশি বসা দেখে কী এক ভালোলাগায় রোকেয়ার গলাব্যথা হয়ে আসে, বুকদুমড়ে কান্না আসতে চায়। পরশু রাতের সেই ছবি এখনও রোকেয়ার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে।
রিয়াজউদ্দীন যদিও কখনও কোনো বিষয়ে অভিযোগ করে না, তবুও তার আনমনা, অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে যাওয়া মুখ আর মুখ পর্যন্ত না উঠে মাঝপথে থেমে যাওয়া ডালদিয়ে মাখা ভাতভর্তি হাত রোকেয়াকে খুব অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আবার রোকেয়া কথা ঠেলে তাকে কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারে না।
অন্ধকার মাঝরাতে রোকেয়ার ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেলে সে দেখতে পায় রিয়াজউদ্দীন বিছানায় নাই, না থাকতেই পারে, কিন্তু তবু রোকেয়া কী যেন আঁচ করে আস্তে আস্তে উঠে বারান্দায় এসে দেখতে পায়, অন্ধকার বারান্দায় একলা বসে আরও অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে রিয়াজউদ্দীন। রোকেয়া খুব আস্তে করে জিজ্ঞেস করে,
- তোমার কী হইছে?
রিয়াজউদ্দীন যেন রোকেয়ার জন্যই অপেক্ষা করছিল, যেন সে জানত রোকেয়া এখন উঠে আসবে। সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়েই খুব স্বাভাবিক গলায় বলে,
- মানুষ এতবড় ভুল কেমনে করে?
রোকেয়ার মাঝরাতে ঘুমভেঙে উঠে আসা তাকে একটুও অবাক করে না_ রোকেয়া এটা খেয়াল করলেও তার বদলে সে ভাবতে চেষ্টা করে যে এমন কোনোকিছু সে করতে ভুলে গেছে কিনা যা রিয়াজউদ্দীন খুব আল্লাদ করে তাকে করতে বলেছিল বা কোনোকিছু সে রোকেয়ার কাছে চেয়েছিল কিনা। রোকেয়া মনে করতে পারে না, শুধু রাতে খেতে বসা রিয়াজউদ্দীনের আনমনা মুখটা তার মনে পড়ে। আর মনে পড়ে, প্রথমদিন প্রথমবার রোকেয়াকে চাইতে গিয়ে কতরকম ভণিতা করতে হয়েছিল রিয়াজউদ্দীনকে। খামাখা রোকেয়াকে হাসানোর চেষ্টায় সস্তা রসিকতা আর টেনশনে কিছুক্ষণ পরপর উঠে গিয়ে পানি খেতে থাকা রিয়াজউদ্দীনের হাসিহাসি মুখের মধ্যেই অতি অসহায় অসামান্য দুঃখী চোখদুইটি দেখে কী অসম্ভব মায়া লেগেছিল রোকেয়ার, অথচ রোকেয়াই কি আর ডেকে নিতে পারে তাকে? তাই কি কখনও নেয়া উচিত? রোকেয়ার আরও মনে পড়ে সেই পানি খাওয়াই কাল হয়েছিল রিয়াজউদ্দীনের। অতিরিক্ত পানি খেয়ে বমি করে সমস্তঘর ভাসিয়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে কিংবা হয়ত অভিমান করে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল সে আর তার মাথার কাছে সারারাত জেগে, অদ্ভুত কষ্ট, অজানা অভিমান আর রিয়াজউদ্দীনের জন্য বুকব্যথা করা মায়ায় চোখভিজিয়ে বসে রইল রোকেয়া। কিন্তু সেসব কথা আজ মনে আসার দরকার কী?
- কিছু চাইছিলা তুমি?
খুব সংকোচে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে অন্ধকার থেকে মুখ ফিরিয়ে রোকেয়া দেখে রিয়াজউদ্দীন কখন উঠে ঘরে চলে গেছে। ভালো। কোথায় কী? কার জন্য সে কী ভাবছে?
অফিসে এসে ড্রয়ার থেকে সন্তর্পণে চিঠিটা আবার বের করে রিয়াজউদ্দীন উল্টেপাল্টে দেখে। চিঠিটা খোলার একটা ইচ্ছা তার হলেও শেষপর্যন্ত সে তা খোলে না, খুলতে পারে না। কী লেখা আছে এতে, খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু? চিঠিটা না পেঁৗছলে ক্ষতি হয়ে যাবে? খুব বেশি ক্ষতি? কে পোস্ট করতে এসেছিল চিঠিটা? গতমাসে একবার একটা মনিঅর্ডার করতে এসে ভুল করে রুমনাম্বার না লিখে পোস্ট করে চলে গিয়েছিল এক বুড়া ভদ্রলোক, তার ঠিকই মনে ছিল, লোকটা আসামাত্র আটশো টাকার মনিঅর্ডারটা তাই সে তখনই বের করে দিতে পেরেছিল। কৃতজ্ঞতায় বুড়া লোকটা গল্প করেছিল খানিক্ষণ, টাকাটা যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজে তার ছোটমেয়ের কাছে। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে টাকা পাঠাতে, তার উপর আবার ভুলভাল নাম্বারে টাকা চলে যাওয়া; টাকা খোয়াবার ক্ষতি নাহয় মেনে নেয়া যাবে, কিন্তু দেরিতে টাকা গেলে মেয়েটা কষ্টে পড়বে_ এইসব গল্প। এরকম অনেক গল্প থাকে। অনেক সমস্যা, টাকা আসতে দেরি হলে ফরমফিলাপ কিংবা ভর্তিবাতিল, কিংবা চিঠির বিলম্বে সম্পর্ক নষ্ট, হাজারটা ভাবনা রিয়াজউদ্দীনকে অস্থির করে তোলে, কতকিছুই থাকতে পারে একটা চিঠিতে। তার ফুপাতোবোনের ভাশুরের বড়মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেল শুধু চিঠিটা এসেছিল ঠিকই কিন্তু দুইদিন দেরি করে।
এইসব এলোমেলো ভাবনার জন্য নিজেকে রিয়াজউদ্দীনের খুব অচেনা লাগে, এলোমেলোইতো, চিঠিতে লোকেদের নানা সমস্যার কথা থাকে জানলেও প্রতিদিন অনেকচিঠিই যে ঠিকমতো পেঁৗছয় না একথাও জানে সে, কিন্তু সেজন্যতো কখনও তার খারাপ লাগেনাই, তাহলে এখন এসব ভাবনার অর্থ কী? পেছনে পোস্টমাস্টার কালামসাহেবের গলার আওয়াজ পেয়ে চট করে চিঠিটা লুকিয়ে ফেলে রিয়াজউদ্দীন এবং সাথেসাথেই এ কাজটার জন্য নিজের উপরই খুব বিরক্ত হয় সে। কার না কার চিঠি, এভাবে তা লুকাতে যায় কেন সে? আর লুকানোর আছেটাই বা কী? সে কি কোনো অন্যায় করছে_ একজন একটা চিঠিতে ঠিকানা লেখেনাই, তাই দেখছে।
একটা ক্লান্তিকর ও বিলম্বিত অপেক্ষার পরও যখন কেউ এসে বলল না, 'আচ্ছা ভাই শোনেন, গতকাল একটা চিঠি ...' তখন রিয়াজউদ্দীনের ভেতর কোথায় একটা হতাশার মতো জন্ম নেয়। অনেকরকম উত্তর সে সাজিয়ে রেখেছিল, 'কি মনভোলা মানুষ ভাই আপনে?'
- আর বইলেন না ভাই, খুব টেনশনে আছি, এই টাকা চাইয়া বাড়িতে লেখছিলাম আরকি ...
- তাইলে? আপনেই বলেন, আমি যদি খেয়াল করে তুলে না রাখতাম তাইলে কী বিপদে পড়তেন আপনে, বলেন?
এইসব কতকথা ভেবে বসে আছে রিয়াজউদ্দীন আর বোকা মনভোলা লোকটা কিনা আসলোই না। লোকটা? নাকি ছেলেটা, নাকি মেয়েটা? হলে থাকা ছেলেমেয়েগুলোর বেশিরভাগেরই বাড়ি থেকে টাকা আসে মনিঅর্ডারে। তাদের যে কেউ হতে পারে। ইউনিভার্সিটির এ সাবপোস্টঅফিসে বসে এ সাতবছরে কত ছেলেমেয়েকে সে খুশি করেছে বাড়ি থেকে আসা টাকা হাতে তুলে দিয়ে, ব্যাপারটা সে খুব উপভোগ করে, তাদের খুশিতে সেও খুশি হয়।
হঠাৎ কোথায় একটু কূল পায় রিয়াজউদ্দীন। কালসকালে মাত্র অফিস খোলা হয়েছে এমনসময় একটা মেয়ে এসেছিল, নীল একটা জামা পরা, আনমনা ভঙ্গিতে সে একটা চিঠি ফেলেছিল ডাকবাক্সে, এখানথেকে দেখেছিল রিয়াজউদ্দীন, ধীরপায়ে হেঁটে চলে গেল মেয়েটা তারপর। অবশ্য তারপরে কম করে হলেও পঞ্চাশ কি একশ কিংবা দেড়শ লোক, ছাত্রছাত্রী, অফিসার, বুড়া, চাষা, কামলা, কর্মচারী চিঠি পোস্ট করে গেছে, তবু কেন কে জানে মেয়েটার কথাই তার মনে পড়ে। দুইদিন হল বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হয়ে গেছে, হলগুলো সব খালি না হলেও, ছেলেদের সবগুলো হল মিলে হয়ত জনাবিশেক ছেলে পাওয়া যাবে, কিন্তু মেয়েদের হলেতো কারও থাকার কথা না। খুব চেষ্টা করেও মেয়েটার মুখ মনে করতে পারে না সে। ইস! আরেকটু ভালো করে যদি দেখে রাখত! আশ্চর্য! সে কি আর আগে থেকে জানত নাকি?
কী লেখা আছে ঐ চিঠিতে? কালামসাহেবের দিকে একবার তাকিয়ে সে সাবধানে আবার বের করে চিঠিটা। চিঠিটা আসলে খুলতেই হবে। চিঠির শেষে প্রেরকের নাম থাকারই কথা। সংক্ষিপ্ত হলেও একটা ঠিকানা থাকতে পারে। থাক, কালামসাহেব চলে গেলে খুলব। অফিস শেষ হবার জন্য, পাঁচটা বাজার জন্য তাই অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে সে। আর ক্লান্তিকর দীর্ঘ অপেক্ষার পর অফিস একসময় শেষ হয়।
অফিস থেকে বের হয়ে লেকের পারে এসে সাইকেলটা কাত করে মাটিতে নামিয়ে রেখে অনেক দ্বিধার পর, অনেকবার খুলব কি খুলব না করে শেষমেষ খুলেই ফেলে রিয়াজউদ্দীন। কোনোদিন সে কোনো চিঠি পেয়েছিল কিনা, কিংবা জীবনে আর কোনো চিঠি এতটা অধীর হয়ে সে খুলেছিল কিনা তা এই অসময়েও একবার মনে আসে তার। কিন্তু কোনো চিঠির কথা তার মনে পড়ে না। রোকেয়া তাকে কোনোদিন চিঠি লেখেনাই, কারণ রোকেয়াকে বাড়িতে রেখে চিঠি লেখার মতো দূরত্বে সে কোনোদিন যায়নাই। সেও কোনোদিন কাউকে চিঠি লেখেনাই। রিয়াজউদ্দীন খুবই আশ্চর্য হয়ে যায়। তার জীবনে তবে কোনো চিঠি নাই? এটাই তার প্রথম চিঠি? এক অজানা কষ্টে রিয়াজউদ্দীনের মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়।
চিঠির ভেতর সে আসলে কিছুই পড়বে না, শুধু শেষে নাম বা নামের শেষে সংক্ষিপ্ত একটা ঠিকানা থাকলে, থাকারই কথা, সেটাই পড়বে, সে অনুযায়ী চিঠির প্রেরককে খুঁজে বের করা যাবে_ এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে চিঠি খোলে রিয়াজউদ্দীন। কিন্তু চিঠিটা খোলার পর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় সে, চিঠি না পড়ে তার আর কোনো উপায় থাকে না, চিঠির শেষে প্রত্যাশা অনুযায়ী কোনো নাম বা ঠিকানা না থাকায়ই আসলে পুরা চিঠি পড়ে একটা কিছু খোঁজার চেষ্টা করতে হয় তাকে।
মাবু,
কেমন আছো, বাবু আমার? কিভাবে তোমাকে জানাবো বুঝতে পারছিনা। তুমি বাড়িতে যাবার ক'দিন পরই নিশ্চিত হয়েছি। আসলে নিশ্চিত না হওয়ার কোন উপায়ও নাই। আমি তো তোমাকে সেদিন বলেছিলাম যে কিছু একটা হয়েছেই, তা না হলে কখনো আমার এরকম হয়না। একদিনও এদিক সেদিক হয়না। তুমি বলেছিলে দুচারদিন একটু দেরি হতেই পারে। কিন্তু তুমি বাড়ি চলে যাবার পরও যখন হলোনা, মাবু, আজ ১৫ দিন পার হয়ে গেছে, তুমি বুঝতে পারছো? আমি কি করবো মাবু?
আমি ওকে ফেলতে চাইনা। আবার রাখবো সে সাহসও পাইনা। অনেক ভেবে দেখলাম, বাসা ছেড়ে চলে আসার মতো শক্তি সাহস হয়তো আমার নাই। তুমি তো জানো, বাসার সবাই আমাকে কতো ভালোবাসে। আবার আমার সন্তান, ওকেও আমি ভীষণ ভালবাসি, ওকে আমি ফেলি কি করে? আমার প্রথম সন্তান, আমাদের সন্তান। ওর কি দোষ?
মনে আছে মাবু, কতোদিন হাঁটতে হাঁটতে আমার পেট একটু ভারী দেখাতো বলে কিরকম ছেলেমানুষী করতাম, আবার শাড়ি পড়লে তো সেদিন আরো বেশি করে তোমাকে পেটটা দেখাতাম আর বলতাম, বাবু! আমার পেটে বাবু।
মাবু, আমার কেন এমন হলো? আমার বাবুর জন্য আমার অনেক মায়া। জানো, আমি প্রতিদিনই একটু একটু করে বুঝতে পারছি ও বড়ো হচ্ছে। কি এমন বড়ো? আমি তো জানি আসলে এ সময় কিছুই বুঝা যায়না, তারপরেও জানো মাবু, কিরকম যে লাগে, মনে হচ্ছে আমার পেট অনেক বড়ো হয়ে গেছে। শরীর যেন অনেক ভারী হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিদিন আমি ওকে স্বপ্ন দেখি, এতো বাবু ও, আমাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝেনা। মাবু, এমন কেন হলো যে আমার সন্তানকে আমি রাখতে পারবোনা? তবে ও এলো কেন? আমার খুব ভয় করে মাবু, ও যদি অভিশাপ দেয়? যদি কখনো আর আমার বাচ্চা না হয়? তুমি তাড়াতাড়ি আসো মাবু। তুমি আমাকে দেখবেনা? তুমি আমাকে কিছু করতে বলোনা, প্লিজ, আমি আমার প্রথম সন্তানকে বড়ো হতে দিতে চাই।
জানো মাবু, সারাদিনই পেটের দিকে তাকিয়ে থাকি, দেখি ও কতোটুকু বড়ো হল। আমি তো ওকে হাত দিয়ে আদর করতে পারিনা, তাই সারাদিনই বলতে গেলে পেটে হাত বুলাই। খাওয়া-দাওয়াও করছি, তা না হলে ওর কষ্ট হবেনা? আমিতো ওর মা। তুমি তাড়াতাড়ি দেখতে আসো, কেমন যত্ন করছি তোমার বাবুকে। চিঠি পাওয়ামাত্র চলে আসো।
নিচে একটা সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর, আর তা থেকে কোনো নাম উদ্ধার করতে পারে না রিয়াজউদ্দীন।
পুন: ঈদের ছুটি অলরেডি দিয়ে দিয়েছে। কাল মেজোভাই এসেছিলো নিতে। এসাইনমেন্টের কথা বলে আরো দুদিন রয়ে গেলাম। হল প্রায় খালি হয়ে গেছে। মাবু, তুমি চিঠি পেয়েই চলে আসো। হল খালি হলেও সুপার আপাকে বলে হয়তো সোমবার পর্যন্ত থাকতে পারবো। তুমি রবিবারের মধ্যেই আসতে চেষ্টা করো। মাবু, তোমার রাস্তার দিকে সারাক্ষণ চেয়ে থাকবো।
সীমু আপার কথা মনে আছে তোমার, মাবু? ঐ যে ছাঁট কাগজের মলাট-এ কবিতা দিতো। সীমু আপা এখনো ঐ ক্লিনিকে বসে। কাল গিয়েছিলাম সীমু আপার কাছে। সোমবার রিপোর্ট দিবে বলেছে। সীমু আপা তোমাকে দেখা করতে বলেছে। তুমি প্লিজ আসো।
রিয়াজউদ্দীনের হাতপা কেমন ঠাণ্ডা আসতে থাকে। মাথায় একটা দুর্মর কাজের ভার চেপে বসে। চারপাশ অন্ধকার করে নামা সন্ধ্যা রিয়াজউদ্দীনের চারপাশে যে অপারগতা তৈরি করে তা থেকে বের হবার কোনো সম্ভাবনা সে দেখতে পায় না।
খুব ক্ষীণ, খুব সামান্য একটা সূত্র, আর কিছু নাই, ঐটুকু সম্বল করে আগাতে ভয় লাগে রিয়াজউদ্দীনের। 'সীমুআপা এখনও বসে'_ কোন ক্লিনিকে? উনি কি ডাক্তার? খুব সম্ভবত। চিঠি পড়ে তাই মনে হল। আবার চিঠিটা পড়ে সে। সাভার বাজারের সেই ছোট্ট ক্লিনিকের কথা মনে আসে তার, কী যেন নাম? বিজু হবার সময় পাশেরবাড়ির হিরু ব্যাপারির মা চিনিয়ে দিয়েছিল। রিয়াজউদ্দীন একবার বলেছিল ঢাকা মেডিকেলে নেবে কিনা, কিন্তু সেই ক্লিনিকের, দূরছাই, এখন কি আর কোনোকিছু ঠিকমতো মনে আসতে আছে? দূর! নামে কাজ নাই, ক্লিনিকটাতো চেনে সে। তা সেই ছোটখাটো ফর্সামতো মেয়েটা, প্রথমেতো ডাক্তার বলে মনেই হয়নাই, অথচ ছোটখাটো হলেও কেমন বুবু-বুবু চেহারা, অবশ্য সেটা পরেরদিন রোকেয়া বলে দেবার পর রিয়াজউদ্দীন খেয়াল করতে পেরেছিল, সেই ডাক্তার মেয়েটা, মুখে কি মায়া! বিজু হবার পর ঐ তুলতুলে লাল মাংসপিণ্ডের মতো শিশুটিকে অনেক আল্লাদ করে নিজেই রিয়াজউদ্দীনকে দেখাতে নিয়ে এসেছিল। সন্তানের সেইমুখ আজ এখন এই ঘনায়মান অন্ধকারে রিয়াজউদ্দীনের মনে পড়ে না, সেই ডাক্তারের মুখ তার চোখভরে ভাসতে থাকে। দাদা বলে সেদিন রিয়াজউদ্দীনকে ডেকেছিল মেয়েটা, সৎমার মেয়ে হলেও তার একমাত্র ছোটবোন সাবিহাটা অমন হুট করে মরে না গেলে দাদা'র ছেলে হওয়া দেখে নিশ্চয়ই ঠিক অমনই খুশি হত। সেই ডাক্তার মেয়েটা সেদিন খুব ধমকে দিয়েছিল তাকে,
- আরে! কান্নাকাটি কেন? হঁ্যা? আজান দেন, আজান দেন! কী মানুষ আপনি?
রিয়াজউদ্দীন সেদিন না পারছিল কান্না থামাতে, না পারছিল আজান দিতে। আর কেন সে কেঁদেছিল তাও যদি সে একটু বলতে পারত ডাক্তার মেয়েটার কাছে, যদি সাবিহার কথা সে একটু বলতে পারত। আশ্চর্য মানুষ সে, কোথায় একটু রোকেয়ার কথা তার ভাবা উচিত, কোথায় একটু সদ্যজন্মানো বিজুর কথা সে ভাববে, তা না, সেই কবে মরে যাওয়া তাও সৎমার মেয়ে, তার বৈমাত্রেয় সাবিহার কথা ভাবতে বসে সে, তা একটু ভাবলে দোষ কোথায়, সবদিনতো আর ঘটা করে তার কথা ভাবা হয় না, সাবিহার কথা বললে নিশ্চয়ই ডাক্তার মেয়েটার অনেক মায়া হত, সাবিহার জন্য কষ্ট পেত সে, দুঃখ পেত, নিশ্চয়ই পেত। তবে, একদিন বলবে সে, সেই ডাক্তার মেয়েটাকে একদিন সাবিহার কথা বলবেই সে। সেদিন এইসবই ভেবেছিল রিয়াজউদ্দীন।
আচ্ছা, এই ডাক্তার মেয়েটাই সীমুআপা হতে পারে না? কি এমন অসুবিধা যদি উনি চিঠির 'সীমুআপা' হন? চিঠির পুনশ্চতে, ছোট্ট একটিমাত্র লাইনের মধ্যে সীমুআপাকে যতটুকু খুঁজে পাওয়া যায়, রিয়াজউদ্দীনের খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে যে উনিই সেই 'সীমুআপা'। 'সীমুআপা' বললে কি সেই ক্লিনিকের লোকজন ডাক্তার মেয়েটাকে চিনতে পারবে?
আচমকাই রিয়াজউদ্দীনের মনে হয়, আচ্ছা! একটা 'ছাঁট কাগজের মলাট' না কি যেন নাম পড়লাম, পত্রিকাইতো মনে হল, সেটা একটা কিনলেওতো মাবুকে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আবারও সেই একই সমস্যা, 'মাবু' নাম কি আর সেখানে থাকবে? যদি না থাকে? তাহলে কোন নামটাকে সে মাবু বলে সনাক্ত করবে? তবু সাইকেল ঘুরায় সে। সাভারের মডার্ন বইঘরে এরকম সাহিত্যপত্রিকা ঝুলতে দেখেছে সে। অচেনা এক বিজয়ের আনন্দ রিয়াজউদ্দীনের সাইকেলের প্যাডেলে গতিসঞ্চার করে। এই গতিতে গেলে হয়ত সাত কি আট মিনিটেই ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ধরে সে পেঁৗছে যেতে পারত মডার্ন বইঘরে, কিন্তু, সত্যিইতো, আজ সোমবার পার হয়ে গেল, কথাটা মনে হতেই সমস্ত সাধআল্লাদ কোথায় নিমেষে উবে যায় তার, হল খালি হয়ে গেছে আরও আগে, এখন সন্ধ্যা, বিকালের আগেই খালি হয়ে যাবার কথা। আজ নিশ্চয়ই ঐ মেয়েটাও চলে গেছে। তুরন্ত গতিতে চলতে থাকা সাইকেলে প্যাডেল দাবানোর কোনো শক্তি, সাহস আর ইচ্ছা আর অবশিষ্ট থাকে না রিয়াজউদ্দীনের। তবু তার সাইকেলের নিচ দিয়ে অন্ধকারে ক্রমাগত কালো হতে থাকা কালো পিচরাস্তা কেবলই পেছনদিকে সরে যেতে থাকে। আর এই গতিগন্তব্য শেষ হওয়ার জন্য প্রাপকহীন, ঠিকানাহীন চিঠিটা পকেটে করে উড়তে থাকা সাইকেলের উপর বসে অপেক্ষা করতে থাকে সে।
আবছা অন্ধকারে আচ্ছন্নতার ভেতর তার বিজুর কথা মনে পড়ে, রোকেয়ার কথা মনে পড়ে। রোকেয়াকে নাহোক, অন্তত বিজুকে একবার বুকের সাথে আঁকড়ে ধরার জন্য তার ভেতরে কোথাও আকুলিবিকুলি করতে থাকে।
ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠক্ করে একমনে চিঠির খামগুলোতে সিল মারার ভীষণরকম একঘেয়ে কাজটা করার সময় প্রতিদিন এত এত চিঠি কোথায় যায় কার কাছে যায় তা ভাবার কথা রিয়াজউদ্দীনের কখনও মনে আসেনাই বলে সেগুলোর উপরে কী ঠিকানা লেখা আছে তা দেখার বা চিঠির গতিগন্তব্য সম্পর্কে ভাবার অবকাশ বা আগ্রহ কখনও তৈরি হয়নাই তার। তাছাড়া একটা চিঠিতে সিল মারার কাজটা এত অল্প সময়ের মধ্যে সারতে হয় যে ঠিকানা দেখার সময়ও তার কখনও করা হয়নাই, সময় করা কী, কখনও সে ধরনের ইচ্ছাও তৈরি হয়নাই। কাজের মাঝে অবকাশ তার থাকে না_ তাও ঠিক না, অবকাশ থাকে, মাঝেমাঝে একটু বেশিই অবকাশ থাকে।
রিয়াজউদ্দীনের সামনে তারের জাল লাগানো জানালা যার একেবারে নিচে টিকেট বা খাম কিনতে আসা কিংবা মনিঅর্ডার করতে আসা লোকেদের হাত ঢোকানোর জন্য একটা গোল ছিদ্র আর তার একটু উপরে কথা বলার জন্য আরেকটা চারকোণা ছিদ্র, সে জানালার তারের জালের ভেতর দিয়ে তাকালে সামনে একটু বামদিকে লালরঙের পুরানো পোস্টবক্স আর তাকে ছাড়িয়ে ডানদিকে লেকের ওপারে ঘনগাছে ছাওয়া রাস্তা আর তাকেও ছাড়িয়ে গাছপাতার ফাঁকেফাঁকে দূরে লাল সিরামিক ইটে বানানো ভাসানী হলের এককোণা আর সাদা চুনকাম করা কামালউদ্দীন হলের আরেককোণা দেখা যায়। টিকেট বা খাম কিনতে আসা কিংবা মনিঅর্ডার করতে আসা লোকেদের ভিড় কম থাকলে বিশেষকরে দুপুরের খাবার সময় পাওয়া লম্বা অবকাশে রিয়াজউদ্দীন বরং পোস্টবক্স ছাড়িয়ে সামনের রাস্তায় ছেলেমেয়েদের দলবেঁধে গল্প করতে করতে, হাসাহাসি করতে করতে বা দুষ্টামি করতে করতে হলের দিকে কিংবা ডিপার্টমেন্টের দিকে যাওয়া বা আসার দৃশ্য কিংবা রাস্তার পাশে লেকের পানির সামনে বসে আড্ডা বা গান করতে থাকার দৃশ্য দেখতে খুব পছন্দ করে। আর প্রতিদিনের মতো আজকের লাঞ্চ আওয়ারটা পার হয়ে গেলেই বিকাল চারটার ডাক ধরানোর জন্য রিয়াজউদ্দীন যখন একমনে ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠক্ করে সিল মারায় ব্যস্ত হয়ে যায় এবং একের পর এক সিলমারা চিঠিগুলোকে বামহাত দিয়ে টেনে নিয়ে নিয়ে অটোমেটিক যন্ত্রের মতো করে বামদিকে স্তুপ করতে থাকে তখনই একটা চিঠির উপর ঠক্ করে সিলটা পরার আগে তার ডানহাতটা উপরে থাকতেই থেমে যায় এবং এই ছন্দপতন নিছক হাত থেমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তারও অনেক পরে বিকাল চারটার ডাক চলে যাওয়া এবং ডাক চলে যাবার পরও রিয়াজউদ্দীনের পুরা সন্ধ্যা ও সারাটারাত এলোমেলো করে ফেলে। তার সাতবছরের চাকরি জীবনে এই একই টেবিলে বসে একই তারের জাল দিয়ে আটকানো দুই ছিদ্রওয়ালা জানালার উপরের ছিদ্র দিয়ে একই ধরনের কয়েকটা শব্দ দিয়ে বিন্যস্ত কথা বলে যাওয়া আর নিচের ছিদ্র দিয়ে একই টিকেট আর খাম বিক্রি করা বা মনিঅর্ডার গ্রহণ করা এবং বিকাল চারটার ডাক ধরানোর আগে পর্যন্ত সেই একইভঙ্গিতে ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠক্ করে সিলমেরেযাওয়া জীবনে হাজার চিঠির মধ্যে এই একটি চিঠি তাকে, তার পুরা বিকাল, সন্ধ্যা আর সারারাত এলোমেলো করে দিল, দিতে পারল, কারণ ওতে কোনো ঠিকানা লেখা ছিল না। খামের উপর কিছুই লেখা ছিল না।
প্রত্যেকদিন সন্ধ্যার আগে আগে রিয়াজউদ্দীনদের দুইতিনবাড়ি পর হিরু ব্যাপারির মা আর বৌয়ের অত্যন্ত উঁচু আর তীক্ষ্ন গলার ঝগড়া শোনার ফাঁকে গেটের বাইরে খোলা জায়গাটার ঘনসবুজ ঘাসের মাঝখানে ইংরেজি 'এস' অক্ষরের মতো জেগে ওঠা লালমাটির রাস্তাটায় পাকারাস্তা থেকে নামা রিয়াজউদ্দীনের সাইকেলের মৃদূ অথচ নৈমিত্তিক এবং অনিবার্য একটি শব্দ শুনতে পায় রোকেয়া। ঘরের সমস্ত কাজ ঠিকমতো করতে করতেই অনেকখানি কৌতুহল নিয়ে হিরু ব্যাপারির মা আর বৌয়ের ঝগড়ার আকর্ষণীয় শানানো শানানো কথাগুলি শুনতে থাকলেও রোকেয়ার কান ঘড়িধরা একটা সময়ে রিয়াজউদ্দীনের সাইকেলের মাডগার্ডের সাথে চেইনের বাড়ি খাওয়ার শব্দটা ঠিকই শুনতে পায়।
ঘনসবুজ ঘাসের মাঝখানে কালে কালে গেরুয়া গ্রামের প্রায় প্রত্যেকটা পুরুষের, নারীর, শিশুর আর কখনও কখনও তাদের সাথে সাথে চলতে থাকা গরু, মহিষ, ছাগল বা মোরগ-মুরগীর পা পড়ার ইতিহাস নিয়ে জেগে ওঠা লালমাটির রাস্তাটা পাকারাস্তা থেকে ইঞ্চি তিনচারেক নিচু হওয়ায় রিয়াজউদ্দীন যখন সন্ধ্যার ঠিক আগে হিরু ব্যাপারির মা আর বৌয়ের ঝগড়া করতে থাকার সময় সাইকেলে চড়েই সেখান থেকে গেরুয়ার লাল কিন্তু চিকন 'এস' আকৃতির রাস্তাটায় নামে তখন অনিবার্যভাবেই সাইকেলের চেইনটা ঝাঁকি লেগে মাডগার্ডের সাথে বাড়ি খায়। রিয়াজউদ্দীনের সাথে বিয়ে হবার পর কিংবা তার দুইবছর পর তার শাশুড়ি মারা যাবার পর কিংবা তারও তিনবছর পর অনেক তাবিজ আর পড়াপানির ফসল হিসেবে রোকেয়ার কোল আলো করে আসা বিজুর জন্মের পর বা বিজুর বয়স আজ নিয়ে একবছর আটমাস হবার পর আজই প্রথম রোকেয়া খেয়াল করে হিরু ব্যাপারির মা আর বৌয়ের ঝগড়া থেমে গিয়ে আবার তারা দুইজন প্রতিদিনকার মতো সব মিটিয়ে একসাথে রান্না করতে বসে গেলেও সেই মৃদূ অথচ অনিবার্য ঘড়িধরা সময়মাফিক সাইকেলে চেইনের সাথে মাডগার্ডের বাড়ি খাওয়ার পরিচিত শব্দটি তার কানে পেঁৗছেনাই। আর রোকেয়া বিকালের সবকাজ শেষে বিজুর ঘুম থেকে ওঠার সময় হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত বিজুর কাথাকাপড় ধুতে ধুতে সাইকেলের শব্দ শুনবে বলে কলপাড়ে অনেক সময় নিয়ে বসে আছে মনে হবার পর একইসাথে সন্ধ্যার অন্ধকার নামা ঘরে একলা থাকা বিজু আর ঘরের বাইরে থাকা বিজুর বাপের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে সে চারপাশে তাকিয়ে দেখে সন্ধ্যা আর সন্ধ্যা নাই, রাতও হয়ে গেছে অনেক্ষণ হয়।
বিজু কি এখনও ঘুমে? বিজু যদি ভয় পায় ভেবে তার খারাপ লাগলেও বিজুর বদলে তার চোখের সামনে সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকারে আরও গাঢ় সবুজের মাঝখানে লালমাটির একটা বিলম্বিত আর নিঃশব্দ এস আকৃতির রাস্তা জেগে ওঠে। সাইকেলের এই সামান্য মৃদূ ধাতব শব্দটি প্রতিদিন রোকেয়াকে কতখানি নিশ্চয়তা এনে দেয় তা রিয়াজউদ্দীনের ঘরে আসার সাতবছর পর এই প্রথম রোকেয়া বুঝতে পারে। ভাবতে না চাইলেও প্রথমবারের মতো রোকেয়ার মনে হয় রিয়াজউদ্দীনের কিছু একটা হয়ে গেলে বিজুকে নিয়ে তার যাবার কোনো জায়গা নাই। বিজুর ভেজা কাথাকাপড় কলপাড়েই ফেলে রেখে ঘরে এসে রোকেয়া দেখতে পায় বিজু বিছানায় বসে ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে চারদিকে তাকানোর চেষ্টা করছে আর বিজুর এই বসে থাকার অসহায় ভঙ্গি দেখে রোকেয়ার সমস্ত অস্তিত্ব কেঁপে উঠলে রোকেয়া দৌড়ে গিয়ে বিজুকে চেপে ধরে উদ্বিগ্ন গলায় 'বাপ আমার সোনা আমার' বলে বিছানায় বসলে অন্ধকারে একলা ফেলে রাখার অভিমানেই হয়ত কিংবা সদ্য ঘুম ভেঙে কোনোকিছু বুঝতে না পেরে কিংবা মায়ের অযাচিত কিন্তু গভীর আদর পেয়ে বিজু আল্লাদি ভঙ্গিতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। আর রোকেয়ার দুইচোখও কেমন ঝাপসা হয়ে আসে, বিজুর কান্নার শব্দ ছাপিয়ে পাকারাস্তা থেকে নামা রিয়াজউদ্দীনের সাইকেলের শব্দের জন্য মনেমনে কান পেতে বিজুকে অাঁকড়ে ধরে অন্ধকারে বসে থাকে সে।
বারান্দায় হাতমুখ ধুতে বসে বাইরের অন্ধকারকে আজ অন্য কোনোদিনের চেয়েও অনেক বেশি অন্ধকার আর ভারী মনে হয়, আর মনে হয়, এখানে, বারান্দায় একটা আলোর ব্যবস্থা করার কথা রোকেয়া অনেকদিন মনে করিয়ে দেবার পরও একটা বাল্ব, খানিকটা তার আর একটা হোল্ডার কিনে আনার কথা তার একদিনও মনে থাকে না। রোকেয়া তাকে মাঝেমধ্যে 'সংসারের দিকে তোমার একদম মন নাই' বলে লজ্জা দেবার চেষ্টা করে করে ব্যর্থ হয়ে এখন কিছু বলা বাদ দিলেও অফিস থেকে নিয়মের ব্যতিক্রম করে সন্ধ্যার অনেকপরে ঘরে ফিরে বারান্দায় বসে টিউবওয়েল থেকে সদ্যতোলা ঠাণ্ডাপানি দিয়ে হাতমুখ ধুতে ধুতে বারান্দায় একটা আলোর প্রয়োজনীয়তা রিয়াজউদ্দীন অনেকদিন পর নতুন করে আজ অনুভব করে। অন্ধকারে তার দম আটকে আসতে থাকে, আর তা কেবল অন্ধকারের জন্য নয়, দেরি করে আসার বিশ্বাসযোগ্য কোনো কারণ খুঁজে না পাওয়ার জন্যও তার দমবন্ধ লাগে। অন্যসব দিন চারটার ডাক যায় একদিক দিয়ে আর টেবিল গুছিয়ে রিয়াজউদ্দীন বের হয় আরেকদিক দিয়ে; অথচ আজ কী যে হল! চারটার ডাক বিদায় হবার ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় পর অফিস থেকে বেরুবার তাড়া অনুভব করলেও বারবারই তার দেরি হয়ে যাচ্ছিল। ঠিকানাবিহীন চিঠিটা চোরের মতো পকেটে পুরে সন্তর্পণে বের হয়ে আসার সময় তার একবার মনে হয়েছিল কালামসাহেব নিশ্চয়ই তারই দিকে তাকিয়ে আছে_ সে পেছন ফিরে নিশ্চিত হয়নাই তবে তার মনে হয়েছে, আর এজন্যই সে তখনই চলে আসতে পারেনাই। তার বের হওয়া আবার কালাম সাহেব খেয়াল করছে বলে সে তো আর সাথে সাথেই মত পাল্টে চিঠি রেখে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। তাই অযথাই বাইরে এসে কিছুক্ষণ সময় ব্যয় করে তারপর একসময় অন্যকোনো কাজের ছুতা করে ভেতরে গিয়ে চিঠিটা সবার অগোচরে ড্রয়ারে রেখে চলে আসার সময় পোস্টমাস্টার কালামসাহেব সত্যিই তার দিকে তাকিয়ে আছে কিনা দেখার জন্য সাহস করে পেছন ফিরে তাকালে রিয়াজউদ্দীন দেখতে পায় কালামসাহেব এতক্ষণ তার দিকেই তাকিয়ে ছিল আর এখন তাকে ঘুরে তাকাতে দেখে অল্প করে হাসে। ব্যাপারটা কাকতালীয় বলে অনেকবার করে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেও তার বারবার মনে হতে থাকে কালামসাহেব মনে হয় এখন হাসিহাসি মুখ করে বলেই বসবেন_
- 'আপনেই লেখে দিলেন নাকি, ঠিকানাডা? কই, দেহি? কী ঠিকানা লেখলেন?'
কালামসাহেবের কাছে নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করার জন্যই হয়ত রিয়াজউদ্দীন অনর্থক দেরি করতে থাকে। তারপরও সে আর কতটুকু দেরি, তারপরইতো সাইকেল নিয়ে বের হল সে, তারপর সোজা এই বাসায়। তবে? কোথা দিয়ে তবে সন্ধ্যা পার হয়ে গেল? ইউনিভার্সিটি থেকে বের হয়ে বিশমাইল আসামাত্র নবীনগরফেরত ম্যাটিনি শো ভাঙা লোকেদের ভিড়ের মধ্যে রিয়াজউদ্দীনের সাথে দেখা হয় সাবরেজিস্ট্রার স্যারের। রিয়াজউদ্দীন সিনেমা দেখে বের হল মনে করে রিক্সা থেকেই ব্যাজারমুখে মাথা নাড়লেন স্যার আর তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে পাশকাটিয়ে চলেও গেলেন। রিয়াজউদ্দীনের কেবলই মনে হতে থাকে এখন রাস্তার সবলোক ভাবছে সে তবে এতক্ষণ সিনেমা দেখছিল। সিনেমা দেখায় দোষের কিছু আছে বলে রিয়াজউদ্দীন মনে করে না, বরং তার একেকসময় মনে হয় রোকেয়াকে নিয়ে একদিন আসবে, কিন্তু দেড়বছরের বিজুতো আর ঘণ্টাতিনেক অন্ধকারে বসে থাকতে পারবে না, তাকে তখন কার কাছে রেখে যাবে তাই কখনও ঠিক করে উঠতে পারেনাই বলেইতো কখনই রোকেয়াকে নিয়ে সিনেমা দেখতে আসা হয়নাই, এমনকি রোকেয়াকে কখনও আল্লাদ করেও বলা হয়নাই, 'চলো, সিনেমা দেখে আসি'; তবে সে যাই হোক, সেতো এখন সিনেমা দেখছিল না, নাহয় দেখছিলই, তাতে কার কী, কিন্তু তবু বিনাদোষে দোষী হওয়ার অভিমানে আর সেটা কাউকে বলতে না পারার আকুতিতে তার মনটা খচখচ করতে থাকে।
সে এখন কী করে প্রমাণ করে যে সে সিনেমা দেখে নয়, অফিস থেকে ফিরছে? সে কি সাইকেলে চড়ে দ্রুত চলে যাবে, নাকি শান্তভঙ্গিতে সাইকেল ঠেলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরবে, যেন তার কোনো তাড়া নাই? পরিচিত, অর্ধপরিচিত লোকদের দেখলে সে কি মুখ হাসিহাসি করে দুইএক কথা বলার জন্য দাঁড়াবে, নাকি কোনোদিকে না তাকিয়ে গম্ভীরমুখে সোজা বাড়ির পথ ধরবে? আর সে প্রমাণ করবেই বা কার কাছে? কেন করবে? কোন কাজটা করা উচিত হয় তার? রিয়াজউদ্দীনের সত্যিই জানা নাই। তা পুরা বিকাল আর সমস্ত সন্ধ্যাটা সে তবে কোথায় পার করে এল তাও সেজন্য তার জানা নাই। সে কি সাইকেলে চড়েই ফিরল নাকি হেঁটে হেঁটে সাইকেল ঠেলে নিয়ে ফিরল তা তার জানা থাকুক বা না থাকুক, একথা তার জানা নাই যে পাকারাস্তা থেকে নামার সময় তার সাইকেলের মাডগার্ডের সাথে চেইনের বাড়ি খাওয়ার শব্দ শোনার জন্য রোকেয়া কান পেতে ছিল কিনা বা সেশব্দ শেষমেষ সে শুনতে পেয়েছিল কিনা।
নুদাইমাছের লালটকটকে ঝোল দিয়ে খাওয়া শেষ করে রিয়াজউদ্দীন পাতে ডাল তুলে নিয়ে একগ্রাস ভাত মুখে দেবার পর অনেকখানি আনমনা হয়ে পড়লে চিন্তিত রোকেয়া খানিকটা ডাল হাতের তালুতে নিয়ে চকিত চুমুক দেয়, ডালে লবণের অনুপস্থিতি তাকে খুব লজ্জায় ফেলে দেয়। এরকম তার কখনও হয় না।
মাছ দিয়ে ভাত খাওয়া শেষ হবার পর পাতলা মসুরের ডাল দিয়ে আরও খানিকটা ভাত খেতে পছন্দ করে রিয়াজউদ্দীন, মাছের তরকারিতে আলু থাকলে সেই আলু ডালের মধ্যে নিয়ে চটকে সালুন একটু ঘন করে খায় সে। শীতের শুরুতে কচিমুলা উঠলে ডাল দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় কাঁচা খাবার জন্য সে কচিমুলা বাজার থেকে কিনে আনে। অন্যদিনে পছন্দ করে শশা বা খিরাই। ডাল দিয়ে ভাত খাবার সময় কাঁচামুলা বা শশা বা খিরাই মুখে দিলে যে কচকচ শব্দ হয় সেটাই পছন্দ রিয়াজউদ্দীনের। কী যে সব ছেলেমানুষী কারবার! পরশু রাতেইতো, বিজুও বসে গেল বাপের পাশে, খালি একটা থালা সামনে টেনে নিয়ে বলল, 'ছছা কাবো'। রিয়াজউদ্দীন তাই দেখে হাসতে গিয়ে গলায় ঠেকে কেশে টেশে একাকার। হাসে রোকেয়াও। বাপছেলেকে পাশাপাশি বসা দেখে কী এক ভালোলাগায় রোকেয়ার গলাব্যথা হয়ে আসে, বুকদুমড়ে কান্না আসতে চায়। পরশু রাতের সেই ছবি এখনও রোকেয়ার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে।
রিয়াজউদ্দীন যদিও কখনও কোনো বিষয়ে অভিযোগ করে না, তবুও তার আনমনা, অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে যাওয়া মুখ আর মুখ পর্যন্ত না উঠে মাঝপথে থেমে যাওয়া ডালদিয়ে মাখা ভাতভর্তি হাত রোকেয়াকে খুব অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আবার রোকেয়া কথা ঠেলে তাকে কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারে না।
অন্ধকার মাঝরাতে রোকেয়ার ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেলে সে দেখতে পায় রিয়াজউদ্দীন বিছানায় নাই, না থাকতেই পারে, কিন্তু তবু রোকেয়া কী যেন আঁচ করে আস্তে আস্তে উঠে বারান্দায় এসে দেখতে পায়, অন্ধকার বারান্দায় একলা বসে আরও অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে রিয়াজউদ্দীন। রোকেয়া খুব আস্তে করে জিজ্ঞেস করে,
- তোমার কী হইছে?
রিয়াজউদ্দীন যেন রোকেয়ার জন্যই অপেক্ষা করছিল, যেন সে জানত রোকেয়া এখন উঠে আসবে। সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়েই খুব স্বাভাবিক গলায় বলে,
- মানুষ এতবড় ভুল কেমনে করে?
রোকেয়ার মাঝরাতে ঘুমভেঙে উঠে আসা তাকে একটুও অবাক করে না_ রোকেয়া এটা খেয়াল করলেও তার বদলে সে ভাবতে চেষ্টা করে যে এমন কোনোকিছু সে করতে ভুলে গেছে কিনা যা রিয়াজউদ্দীন খুব আল্লাদ করে তাকে করতে বলেছিল বা কোনোকিছু সে রোকেয়ার কাছে চেয়েছিল কিনা। রোকেয়া মনে করতে পারে না, শুধু রাতে খেতে বসা রিয়াজউদ্দীনের আনমনা মুখটা তার মনে পড়ে। আর মনে পড়ে, প্রথমদিন প্রথমবার রোকেয়াকে চাইতে গিয়ে কতরকম ভণিতা করতে হয়েছিল রিয়াজউদ্দীনকে। খামাখা রোকেয়াকে হাসানোর চেষ্টায় সস্তা রসিকতা আর টেনশনে কিছুক্ষণ পরপর উঠে গিয়ে পানি খেতে থাকা রিয়াজউদ্দীনের হাসিহাসি মুখের মধ্যেই অতি অসহায় অসামান্য দুঃখী চোখদুইটি দেখে কী অসম্ভব মায়া লেগেছিল রোকেয়ার, অথচ রোকেয়াই কি আর ডেকে নিতে পারে তাকে? তাই কি কখনও নেয়া উচিত? রোকেয়ার আরও মনে পড়ে সেই পানি খাওয়াই কাল হয়েছিল রিয়াজউদ্দীনের। অতিরিক্ত পানি খেয়ে বমি করে সমস্তঘর ভাসিয়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে কিংবা হয়ত অভিমান করে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল সে আর তার মাথার কাছে সারারাত জেগে, অদ্ভুত কষ্ট, অজানা অভিমান আর রিয়াজউদ্দীনের জন্য বুকব্যথা করা মায়ায় চোখভিজিয়ে বসে রইল রোকেয়া। কিন্তু সেসব কথা আজ মনে আসার দরকার কী?
- কিছু চাইছিলা তুমি?
খুব সংকোচে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে অন্ধকার থেকে মুখ ফিরিয়ে রোকেয়া দেখে রিয়াজউদ্দীন কখন উঠে ঘরে চলে গেছে। ভালো। কোথায় কী? কার জন্য সে কী ভাবছে?
অফিসে এসে ড্রয়ার থেকে সন্তর্পণে চিঠিটা আবার বের করে রিয়াজউদ্দীন উল্টেপাল্টে দেখে। চিঠিটা খোলার একটা ইচ্ছা তার হলেও শেষপর্যন্ত সে তা খোলে না, খুলতে পারে না। কী লেখা আছে এতে, খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু? চিঠিটা না পেঁৗছলে ক্ষতি হয়ে যাবে? খুব বেশি ক্ষতি? কে পোস্ট করতে এসেছিল চিঠিটা? গতমাসে একবার একটা মনিঅর্ডার করতে এসে ভুল করে রুমনাম্বার না লিখে পোস্ট করে চলে গিয়েছিল এক বুড়া ভদ্রলোক, তার ঠিকই মনে ছিল, লোকটা আসামাত্র আটশো টাকার মনিঅর্ডারটা তাই সে তখনই বের করে দিতে পেরেছিল। কৃতজ্ঞতায় বুড়া লোকটা গল্প করেছিল খানিক্ষণ, টাকাটা যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজে তার ছোটমেয়ের কাছে। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে টাকা পাঠাতে, তার উপর আবার ভুলভাল নাম্বারে টাকা চলে যাওয়া; টাকা খোয়াবার ক্ষতি নাহয় মেনে নেয়া যাবে, কিন্তু দেরিতে টাকা গেলে মেয়েটা কষ্টে পড়বে_ এইসব গল্প। এরকম অনেক গল্প থাকে। অনেক সমস্যা, টাকা আসতে দেরি হলে ফরমফিলাপ কিংবা ভর্তিবাতিল, কিংবা চিঠির বিলম্বে সম্পর্ক নষ্ট, হাজারটা ভাবনা রিয়াজউদ্দীনকে অস্থির করে তোলে, কতকিছুই থাকতে পারে একটা চিঠিতে। তার ফুপাতোবোনের ভাশুরের বড়মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেল শুধু চিঠিটা এসেছিল ঠিকই কিন্তু দুইদিন দেরি করে।
এইসব এলোমেলো ভাবনার জন্য নিজেকে রিয়াজউদ্দীনের খুব অচেনা লাগে, এলোমেলোইতো, চিঠিতে লোকেদের নানা সমস্যার কথা থাকে জানলেও প্রতিদিন অনেকচিঠিই যে ঠিকমতো পেঁৗছয় না একথাও জানে সে, কিন্তু সেজন্যতো কখনও তার খারাপ লাগেনাই, তাহলে এখন এসব ভাবনার অর্থ কী? পেছনে পোস্টমাস্টার কালামসাহেবের গলার আওয়াজ পেয়ে চট করে চিঠিটা লুকিয়ে ফেলে রিয়াজউদ্দীন এবং সাথেসাথেই এ কাজটার জন্য নিজের উপরই খুব বিরক্ত হয় সে। কার না কার চিঠি, এভাবে তা লুকাতে যায় কেন সে? আর লুকানোর আছেটাই বা কী? সে কি কোনো অন্যায় করছে_ একজন একটা চিঠিতে ঠিকানা লেখেনাই, তাই দেখছে।
একটা ক্লান্তিকর ও বিলম্বিত অপেক্ষার পরও যখন কেউ এসে বলল না, 'আচ্ছা ভাই শোনেন, গতকাল একটা চিঠি ...' তখন রিয়াজউদ্দীনের ভেতর কোথায় একটা হতাশার মতো জন্ম নেয়। অনেকরকম উত্তর সে সাজিয়ে রেখেছিল, 'কি মনভোলা মানুষ ভাই আপনে?'
- আর বইলেন না ভাই, খুব টেনশনে আছি, এই টাকা চাইয়া বাড়িতে লেখছিলাম আরকি ...
- তাইলে? আপনেই বলেন, আমি যদি খেয়াল করে তুলে না রাখতাম তাইলে কী বিপদে পড়তেন আপনে, বলেন?
এইসব কতকথা ভেবে বসে আছে রিয়াজউদ্দীন আর বোকা মনভোলা লোকটা কিনা আসলোই না। লোকটা? নাকি ছেলেটা, নাকি মেয়েটা? হলে থাকা ছেলেমেয়েগুলোর বেশিরভাগেরই বাড়ি থেকে টাকা আসে মনিঅর্ডারে। তাদের যে কেউ হতে পারে। ইউনিভার্সিটির এ সাবপোস্টঅফিসে বসে এ সাতবছরে কত ছেলেমেয়েকে সে খুশি করেছে বাড়ি থেকে আসা টাকা হাতে তুলে দিয়ে, ব্যাপারটা সে খুব উপভোগ করে, তাদের খুশিতে সেও খুশি হয়।
হঠাৎ কোথায় একটু কূল পায় রিয়াজউদ্দীন। কালসকালে মাত্র অফিস খোলা হয়েছে এমনসময় একটা মেয়ে এসেছিল, নীল একটা জামা পরা, আনমনা ভঙ্গিতে সে একটা চিঠি ফেলেছিল ডাকবাক্সে, এখানথেকে দেখেছিল রিয়াজউদ্দীন, ধীরপায়ে হেঁটে চলে গেল মেয়েটা তারপর। অবশ্য তারপরে কম করে হলেও পঞ্চাশ কি একশ কিংবা দেড়শ লোক, ছাত্রছাত্রী, অফিসার, বুড়া, চাষা, কামলা, কর্মচারী চিঠি পোস্ট করে গেছে, তবু কেন কে জানে মেয়েটার কথাই তার মনে পড়ে। দুইদিন হল বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হয়ে গেছে, হলগুলো সব খালি না হলেও, ছেলেদের সবগুলো হল মিলে হয়ত জনাবিশেক ছেলে পাওয়া যাবে, কিন্তু মেয়েদের হলেতো কারও থাকার কথা না। খুব চেষ্টা করেও মেয়েটার মুখ মনে করতে পারে না সে। ইস! আরেকটু ভালো করে যদি দেখে রাখত! আশ্চর্য! সে কি আর আগে থেকে জানত নাকি?
কী লেখা আছে ঐ চিঠিতে? কালামসাহেবের দিকে একবার তাকিয়ে সে সাবধানে আবার বের করে চিঠিটা। চিঠিটা আসলে খুলতেই হবে। চিঠির শেষে প্রেরকের নাম থাকারই কথা। সংক্ষিপ্ত হলেও একটা ঠিকানা থাকতে পারে। থাক, কালামসাহেব চলে গেলে খুলব। অফিস শেষ হবার জন্য, পাঁচটা বাজার জন্য তাই অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে সে। আর ক্লান্তিকর দীর্ঘ অপেক্ষার পর অফিস একসময় শেষ হয়।
অফিস থেকে বের হয়ে লেকের পারে এসে সাইকেলটা কাত করে মাটিতে নামিয়ে রেখে অনেক দ্বিধার পর, অনেকবার খুলব কি খুলব না করে শেষমেষ খুলেই ফেলে রিয়াজউদ্দীন। কোনোদিন সে কোনো চিঠি পেয়েছিল কিনা, কিংবা জীবনে আর কোনো চিঠি এতটা অধীর হয়ে সে খুলেছিল কিনা তা এই অসময়েও একবার মনে আসে তার। কিন্তু কোনো চিঠির কথা তার মনে পড়ে না। রোকেয়া তাকে কোনোদিন চিঠি লেখেনাই, কারণ রোকেয়াকে বাড়িতে রেখে চিঠি লেখার মতো দূরত্বে সে কোনোদিন যায়নাই। সেও কোনোদিন কাউকে চিঠি লেখেনাই। রিয়াজউদ্দীন খুবই আশ্চর্য হয়ে যায়। তার জীবনে তবে কোনো চিঠি নাই? এটাই তার প্রথম চিঠি? এক অজানা কষ্টে রিয়াজউদ্দীনের মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়।
চিঠির ভেতর সে আসলে কিছুই পড়বে না, শুধু শেষে নাম বা নামের শেষে সংক্ষিপ্ত একটা ঠিকানা থাকলে, থাকারই কথা, সেটাই পড়বে, সে অনুযায়ী চিঠির প্রেরককে খুঁজে বের করা যাবে_ এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে চিঠি খোলে রিয়াজউদ্দীন। কিন্তু চিঠিটা খোলার পর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় সে, চিঠি না পড়ে তার আর কোনো উপায় থাকে না, চিঠির শেষে প্রত্যাশা অনুযায়ী কোনো নাম বা ঠিকানা না থাকায়ই আসলে পুরা চিঠি পড়ে একটা কিছু খোঁজার চেষ্টা করতে হয় তাকে।
মাবু,
কেমন আছো, বাবু আমার? কিভাবে তোমাকে জানাবো বুঝতে পারছিনা। তুমি বাড়িতে যাবার ক'দিন পরই নিশ্চিত হয়েছি। আসলে নিশ্চিত না হওয়ার কোন উপায়ও নাই। আমি তো তোমাকে সেদিন বলেছিলাম যে কিছু একটা হয়েছেই, তা না হলে কখনো আমার এরকম হয়না। একদিনও এদিক সেদিক হয়না। তুমি বলেছিলে দুচারদিন একটু দেরি হতেই পারে। কিন্তু তুমি বাড়ি চলে যাবার পরও যখন হলোনা, মাবু, আজ ১৫ দিন পার হয়ে গেছে, তুমি বুঝতে পারছো? আমি কি করবো মাবু?
আমি ওকে ফেলতে চাইনা। আবার রাখবো সে সাহসও পাইনা। অনেক ভেবে দেখলাম, বাসা ছেড়ে চলে আসার মতো শক্তি সাহস হয়তো আমার নাই। তুমি তো জানো, বাসার সবাই আমাকে কতো ভালোবাসে। আবার আমার সন্তান, ওকেও আমি ভীষণ ভালবাসি, ওকে আমি ফেলি কি করে? আমার প্রথম সন্তান, আমাদের সন্তান। ওর কি দোষ?
মনে আছে মাবু, কতোদিন হাঁটতে হাঁটতে আমার পেট একটু ভারী দেখাতো বলে কিরকম ছেলেমানুষী করতাম, আবার শাড়ি পড়লে তো সেদিন আরো বেশি করে তোমাকে পেটটা দেখাতাম আর বলতাম, বাবু! আমার পেটে বাবু।
মাবু, আমার কেন এমন হলো? আমার বাবুর জন্য আমার অনেক মায়া। জানো, আমি প্রতিদিনই একটু একটু করে বুঝতে পারছি ও বড়ো হচ্ছে। কি এমন বড়ো? আমি তো জানি আসলে এ সময় কিছুই বুঝা যায়না, তারপরেও জানো মাবু, কিরকম যে লাগে, মনে হচ্ছে আমার পেট অনেক বড়ো হয়ে গেছে। শরীর যেন অনেক ভারী হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিদিন আমি ওকে স্বপ্ন দেখি, এতো বাবু ও, আমাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝেনা। মাবু, এমন কেন হলো যে আমার সন্তানকে আমি রাখতে পারবোনা? তবে ও এলো কেন? আমার খুব ভয় করে মাবু, ও যদি অভিশাপ দেয়? যদি কখনো আর আমার বাচ্চা না হয়? তুমি তাড়াতাড়ি আসো মাবু। তুমি আমাকে দেখবেনা? তুমি আমাকে কিছু করতে বলোনা, প্লিজ, আমি আমার প্রথম সন্তানকে বড়ো হতে দিতে চাই।
জানো মাবু, সারাদিনই পেটের দিকে তাকিয়ে থাকি, দেখি ও কতোটুকু বড়ো হল। আমি তো ওকে হাত দিয়ে আদর করতে পারিনা, তাই সারাদিনই বলতে গেলে পেটে হাত বুলাই। খাওয়া-দাওয়াও করছি, তা না হলে ওর কষ্ট হবেনা? আমিতো ওর মা। তুমি তাড়াতাড়ি দেখতে আসো, কেমন যত্ন করছি তোমার বাবুকে। চিঠি পাওয়ামাত্র চলে আসো।
নিচে একটা সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর, আর তা থেকে কোনো নাম উদ্ধার করতে পারে না রিয়াজউদ্দীন।
পুন: ঈদের ছুটি অলরেডি দিয়ে দিয়েছে। কাল মেজোভাই এসেছিলো নিতে। এসাইনমেন্টের কথা বলে আরো দুদিন রয়ে গেলাম। হল প্রায় খালি হয়ে গেছে। মাবু, তুমি চিঠি পেয়েই চলে আসো। হল খালি হলেও সুপার আপাকে বলে হয়তো সোমবার পর্যন্ত থাকতে পারবো। তুমি রবিবারের মধ্যেই আসতে চেষ্টা করো। মাবু, তোমার রাস্তার দিকে সারাক্ষণ চেয়ে থাকবো।
সীমু আপার কথা মনে আছে তোমার, মাবু? ঐ যে ছাঁট কাগজের মলাট-এ কবিতা দিতো। সীমু আপা এখনো ঐ ক্লিনিকে বসে। কাল গিয়েছিলাম সীমু আপার কাছে। সোমবার রিপোর্ট দিবে বলেছে। সীমু আপা তোমাকে দেখা করতে বলেছে। তুমি প্লিজ আসো।
রিয়াজউদ্দীনের হাতপা কেমন ঠাণ্ডা আসতে থাকে। মাথায় একটা দুর্মর কাজের ভার চেপে বসে। চারপাশ অন্ধকার করে নামা সন্ধ্যা রিয়াজউদ্দীনের চারপাশে যে অপারগতা তৈরি করে তা থেকে বের হবার কোনো সম্ভাবনা সে দেখতে পায় না।
খুব ক্ষীণ, খুব সামান্য একটা সূত্র, আর কিছু নাই, ঐটুকু সম্বল করে আগাতে ভয় লাগে রিয়াজউদ্দীনের। 'সীমুআপা এখনও বসে'_ কোন ক্লিনিকে? উনি কি ডাক্তার? খুব সম্ভবত। চিঠি পড়ে তাই মনে হল। আবার চিঠিটা পড়ে সে। সাভার বাজারের সেই ছোট্ট ক্লিনিকের কথা মনে আসে তার, কী যেন নাম? বিজু হবার সময় পাশেরবাড়ির হিরু ব্যাপারির মা চিনিয়ে দিয়েছিল। রিয়াজউদ্দীন একবার বলেছিল ঢাকা মেডিকেলে নেবে কিনা, কিন্তু সেই ক্লিনিকের, দূরছাই, এখন কি আর কোনোকিছু ঠিকমতো মনে আসতে আছে? দূর! নামে কাজ নাই, ক্লিনিকটাতো চেনে সে। তা সেই ছোটখাটো ফর্সামতো মেয়েটা, প্রথমেতো ডাক্তার বলে মনেই হয়নাই, অথচ ছোটখাটো হলেও কেমন বুবু-বুবু চেহারা, অবশ্য সেটা পরেরদিন রোকেয়া বলে দেবার পর রিয়াজউদ্দীন খেয়াল করতে পেরেছিল, সেই ডাক্তার মেয়েটা, মুখে কি মায়া! বিজু হবার পর ঐ তুলতুলে লাল মাংসপিণ্ডের মতো শিশুটিকে অনেক আল্লাদ করে নিজেই রিয়াজউদ্দীনকে দেখাতে নিয়ে এসেছিল। সন্তানের সেইমুখ আজ এখন এই ঘনায়মান অন্ধকারে রিয়াজউদ্দীনের মনে পড়ে না, সেই ডাক্তারের মুখ তার চোখভরে ভাসতে থাকে। দাদা বলে সেদিন রিয়াজউদ্দীনকে ডেকেছিল মেয়েটা, সৎমার মেয়ে হলেও তার একমাত্র ছোটবোন সাবিহাটা অমন হুট করে মরে না গেলে দাদা'র ছেলে হওয়া দেখে নিশ্চয়ই ঠিক অমনই খুশি হত। সেই ডাক্তার মেয়েটা সেদিন খুব ধমকে দিয়েছিল তাকে,
- আরে! কান্নাকাটি কেন? হঁ্যা? আজান দেন, আজান দেন! কী মানুষ আপনি?
রিয়াজউদ্দীন সেদিন না পারছিল কান্না থামাতে, না পারছিল আজান দিতে। আর কেন সে কেঁদেছিল তাও যদি সে একটু বলতে পারত ডাক্তার মেয়েটার কাছে, যদি সাবিহার কথা সে একটু বলতে পারত। আশ্চর্য মানুষ সে, কোথায় একটু রোকেয়ার কথা তার ভাবা উচিত, কোথায় একটু সদ্যজন্মানো বিজুর কথা সে ভাববে, তা না, সেই কবে মরে যাওয়া তাও সৎমার মেয়ে, তার বৈমাত্রেয় সাবিহার কথা ভাবতে বসে সে, তা একটু ভাবলে দোষ কোথায়, সবদিনতো আর ঘটা করে তার কথা ভাবা হয় না, সাবিহার কথা বললে নিশ্চয়ই ডাক্তার মেয়েটার অনেক মায়া হত, সাবিহার জন্য কষ্ট পেত সে, দুঃখ পেত, নিশ্চয়ই পেত। তবে, একদিন বলবে সে, সেই ডাক্তার মেয়েটাকে একদিন সাবিহার কথা বলবেই সে। সেদিন এইসবই ভেবেছিল রিয়াজউদ্দীন।
আচ্ছা, এই ডাক্তার মেয়েটাই সীমুআপা হতে পারে না? কি এমন অসুবিধা যদি উনি চিঠির 'সীমুআপা' হন? চিঠির পুনশ্চতে, ছোট্ট একটিমাত্র লাইনের মধ্যে সীমুআপাকে যতটুকু খুঁজে পাওয়া যায়, রিয়াজউদ্দীনের খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে যে উনিই সেই 'সীমুআপা'। 'সীমুআপা' বললে কি সেই ক্লিনিকের লোকজন ডাক্তার মেয়েটাকে চিনতে পারবে?
আচমকাই রিয়াজউদ্দীনের মনে হয়, আচ্ছা! একটা 'ছাঁট কাগজের মলাট' না কি যেন নাম পড়লাম, পত্রিকাইতো মনে হল, সেটা একটা কিনলেওতো মাবুকে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আবারও সেই একই সমস্যা, 'মাবু' নাম কি আর সেখানে থাকবে? যদি না থাকে? তাহলে কোন নামটাকে সে মাবু বলে সনাক্ত করবে? তবু সাইকেল ঘুরায় সে। সাভারের মডার্ন বইঘরে এরকম সাহিত্যপত্রিকা ঝুলতে দেখেছে সে। অচেনা এক বিজয়ের আনন্দ রিয়াজউদ্দীনের সাইকেলের প্যাডেলে গতিসঞ্চার করে। এই গতিতে গেলে হয়ত সাত কি আট মিনিটেই ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ধরে সে পেঁৗছে যেতে পারত মডার্ন বইঘরে, কিন্তু, সত্যিইতো, আজ সোমবার পার হয়ে গেল, কথাটা মনে হতেই সমস্ত সাধআল্লাদ কোথায় নিমেষে উবে যায় তার, হল খালি হয়ে গেছে আরও আগে, এখন সন্ধ্যা, বিকালের আগেই খালি হয়ে যাবার কথা। আজ নিশ্চয়ই ঐ মেয়েটাও চলে গেছে। তুরন্ত গতিতে চলতে থাকা সাইকেলে প্যাডেল দাবানোর কোনো শক্তি, সাহস আর ইচ্ছা আর অবশিষ্ট থাকে না রিয়াজউদ্দীনের। তবু তার সাইকেলের নিচ দিয়ে অন্ধকারে ক্রমাগত কালো হতে থাকা কালো পিচরাস্তা কেবলই পেছনদিকে সরে যেতে থাকে। আর এই গতিগন্তব্য শেষ হওয়ার জন্য প্রাপকহীন, ঠিকানাহীন চিঠিটা পকেটে করে উড়তে থাকা সাইকেলের উপর বসে অপেক্ষা করতে থাকে সে।
আবছা অন্ধকারে আচ্ছন্নতার ভেতর তার বিজুর কথা মনে পড়ে, রোকেয়ার কথা মনে পড়ে। রোকেয়াকে নাহোক, অন্তত বিজুকে একবার বুকের সাথে আঁকড়ে ধরার জন্য তার ভেতরে কোথাও আকুলিবিকুলি করতে থাকে।
Subscribe to:
Posts (Atom)
